দেশের অর্থনীতি বছরজুড়েই মন্দা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব বৃদ্ধি, রপ্তানিতে স্থবিরতা এবং বিনিয়োগে নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধি ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। তবে এ চ্যালেঞ্জের মাঝেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ি বছরে বৈধ পথে আসা প্রবাসী আয়ের পরিমাণ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ।
তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে বাংলাদেশি ও মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে। অনেক কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়ে কাজ পাননি, ফলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। সরকারকে দ্রুত মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।’ সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবকাঠামো খাত বন্ধ থাকায় কর্মী নিয়োগ কমে গেছে। এ ছাড়া সৌদি আরবে গত বছর ৬ লাখ কর্মী যাওয়ায় (এ বছর) চাহিদা কমে গেছে বলে জানান এই গবেষক।
গুটিকয়েক দেশনির্ভর শ্রমবাজার দেশে অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। এর মধ্যে কোনো একটি দেশ অভিবাসন নীতি পরিবর্তন করলে বা বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রেমিট্যান্সে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮৬৯ জন কর্মী কাজের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৯ লাখ ৬৬২ জনই গেছেন সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কাতার, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই)। যা গত বছর মোট জনশক্তি রপ্তানির ৮৯ শতাংশ। অর্থাৎ জনশক্তি রপ্তানি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে এই পাঁচ দেশের ওপর। প্রধান শ্রমবাজারগুলোতেও কর্মী রপ্তানি কমতে শুরু করেছে। নির্মাণ খাতের প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ায় এরই মধ্যে ইউএই-তে কর্মী নিয়োগ কমে গেছে। প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবেও শ্রমিকের চাহিদা কমেছে। গত কয়েক বছরে সৌদি আরবে কর্মীদের বড় একটি অংশ গেছেন ফ্রি ভিসায়। তাঁদের কাজের কোনো চুক্তি নেই, কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তাও নেই। কাজ জোগাড় করে নিতে হয়। বেশি কর্মী যাওয়ায় দেশটিতে কাজের সুযোগ কমেছে। ফ্রি ভিসায় যাওয়া কর্মীদের অনেকে সপ্তাহে এক-দুই দিন কাজ করতে পারেন। আবার যাঁরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চুক্তিতে কাজ করছেন, তাঁরাও প্রত্যাশা অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। বিগত বছরগুলোয় সৌদি আরব বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়ায় বর্তমানে অন্যান্য দেশের কর্মীদের নিয়োগ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তান ও ভারতের শ্রমিকদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। কারণ, দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা থাকলেও বাংলাদেশ থেকে মূলত অদক্ষ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমিক পাঠানো হয়। কাতার ২০২২ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিয়েছিল, যার একটি বড় অংশ ছিল বাংলাদেশি। কিন্তু বিশ্বকাপ-পরবর্তী চাকরির সংকটে এই শ্রমবাজারও বর্তমানে সংকুচিত হচ্ছে। কাতারে ২০২২ সালে ২৪ হাজার ৪৪৭ জন, ২০২৩ সালে ৫৬ হাজার ১৪৮ এবং ২০২৪ সালে ৭৪ হাজার ৪২২ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন। তবে চলতি বছর কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। সিঙ্গাপুর দক্ষ শ্রমিক নিতে চায়, যা বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ। অনেক শ্রমিক সিঙ্গাপুরে যেতে আগ্রহী হলেও সুযোগ সীমিত। এর পরও সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশি কর্মী যাচ্ছেন। দেশটিতে ২০২২ সালে ৬৪ হাজার ৩৮৩ জন, ২০২৩ সালে ৫৩ হাজার ২৬৫ এবং ২০২৪ সালে ৫৬ হাজার ৮৭৮ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।
ইউএই-তে ২০২২ ও ২০২৩ সালে গেছেন যথাক্রমে ১ লাখ ১ হাজার ৭৭৫ ও ৯৮ হাজার ৪২২ জন বাংলাদেশি কর্মী। তবে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ১৬৬ জনে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে গেছেন মাত্র ১ হাজার ১৫০ জন। নির্মাণ খাতে স্থবিরতা দেখা দেওয়ায় ইউএই-তে নিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে বিশ্ব শ্রমবাজারে এই ধসের প্রধান কারণ হলো দুর্নীতি। জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি এখন হুমকির মুখে। বেশির ভাগ রিক্রুটিং এজেন্সি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অভিবাসন ব্যয় বাড়িয়েছে। বাড়তি টাকা দিয়ে বিদেশে যাওয়ার পর কর্মীরা তাদের খরচের টাকা উঠাতে গিয়ে নানা অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক জনশক্তি রপ্তানিতে। জনশক্তি রপ্তানি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মীর চেয়ে অদক্ষ জনবলের দিকে মনোযোগ বেশি। কারণ তাদের সঙ্গে সহজেই প্রতারণা করা যায়। অদক্ষর জন্য তারা বেশি টাকা দিয়ে যে কোনো মূল্যে বিদেশে কাজ করতে যেতে আগ্রহী হয়। রিক্রুটিং এজেন্টরা তাদের সহজেই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নিতে পারে। দেখা গেছে ভুয়া নিয়োগপত্র, সার্টিফিকেট নিয়ে যারা বিদেশে যাচ্ছে তাদের অধিকাংশই অদক্ষ। এভাবেই এক দুষ্ট চক্রের ফাঁদে পড়েছে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি।
২০২৪ সালে নারী অভিবাসীর সংখ্যা নেমে আসে ৬০ হাজারের কিছু বেশি। সর্বশেষ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গেছেন ৫৬ হাজার ২৯২ জন নারী, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ কম। এই প্রবণতা বদলাতে বা নিরাপদ ও দক্ষ নারী কর্মী পাঠাতে এখনো কোনো সুস্পষ্ট কৌশল দেখা যাচ্ছে না।
প্রবাসী কল্যাণ খাতে বাজেট বরাদ্দও কমেছে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ১ হাজার ২১৭ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৮৫৫ কোটি টাকায়। গত পাঁচ বছরে জাতীয় বাজেটের গড়ে মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এই খাতে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, ‘এই বরাদ্দ কমে যাওয়াই স্পষ্ট করে দেয় যে প্রবাসী কল্যাণকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হয়নি।’
তার মতে, প্রবাসী লাউঞ্জ, বিদেশে পোস্টাল ব্যালটে ভোটাধিকার কিংবা সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তির মতো সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগগুলো কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি।
তিনি বলেন, ‘ভোটের উদ্যোগ প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই খাতের দরকার ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। তার বদলে মন্ত্রণালয় দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে সীমাবদ্ধ থেকেছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থাপনা নতুন করে সাজানোর ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া করেছে।’ আগের সরকার পতনের পর বিশেষজ্ঞরা দক্ষতা উন্নয়ন, কল্যাণ, নিয়োগ সংস্কার ও শ্রম কূটনীতি নিয়ে একটি ‘ন্যাশনাল মাইগ্রেশন ডিকেড’ ঘোষণার কথা বললেও বাস্তবে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
