ব্রেকিং নিউজ
Home » জাতীয় » আমাদের নেতা শেখ মুজিব
আমাদের নেতা শেখ মুজিব
--ফাইল ছবি

আমাদের নেতা শেখ মুজিব

অনলাইন ডেস্ক:

‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ বিশ্বকবির এই ঐকান্তিক ইচ্ছার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে পাই একটি জীবনে। যাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালির জাতির পিতা; আমাদের মুক্তির মহানায়ক। বাংলাদেশের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অতি আপনজন মুজিব ভাই। হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে নক্ষত্রের অক্ষরে রচিত একটি নাম, যা আপন আলোয় ভাস্বর হয়ে থাকবে। তাই তো স্বাধীনতার অপর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। মিছিলের স্লোগানের মতোই ধ্বনিত হয় ‘মুজিব আমার চেতনা, মুজিব আমার বিশ্বাস’।

kalerkanthoবঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে এসেছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট। স্বাধীন দেশের যুদ্ধজয়ী বীর শেখ মুজিবের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ফ্রস্ট। মুজিব তখন বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের নেতা; একটি ব্র্যান্ড। বিশ্বনেতা মুজিবের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় ফ্রস্টের প্রথম প্রশ্নই ছিল, ২৫শে মার্চ আপনি কেন গ্রেপ্তার হলেন? উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মরি, তবু আমার দেশবাসী রক্ষা পাবে। আমি নেতা, প্রয়োজনে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব কিন্তু পালিয়ে যাব কেন?’ ডেভিড ফ্রস্টের অনেক প্রশ্নের উত্তরে ঘুরেফিরেই ছিল বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর গভীর মমত্ববোধের কথা। ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালিকে ভালোবাসি।’ বড় অযোগ্যতা কোনটা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালিকে বেশি ভালোবাসি। জনতার প্রতিই আমার প্রথম ভালোবাসা। আমি তো জানি, আমি অমর নই।’

বঙ্গবন্ধুর মতো বাঙালিকে এতটা ভালোবাসতে পেরেছে কে? বাঙালির সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পৃক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা। যে ভালোবাসার জন্য তিনি জীবনের মায়া ত্যাগ করে জেল খেটেছেন। হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনোই আপস করেননি। বাংলাদেশের সব প্রান্তে জনসাধারণের হৃদয়ে সর্বদা ধ্বনিত হয়—আমরা তোমার, তুমি আমাদের।

হঠাৎ ক্ষমতার পালাবদলে বাঙালির নেতা হননি শেখ মুজিব। শোষিত বাঙালির মুক্তির ভরসাস্থল হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। সংগ্রাম থেকে স্বাধীনতার প্রতিটি সোপানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আত্মত্যাগ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। এ কারণে তিনি ৭ই মার্চ রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না, আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নামের গণমানুষের দলের নেতা হয়েছিলেন। বাঙালির একক নেতা হিসেবে আমাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সাড়ে সাত কোটি বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর আস্থা ছিল বলেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পেরেছিলেন। আমরা মুক্তিকামী বাঙালি নেতা শেখ মুজিবকে বিশ্বাস করতাম।

রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি মহল্লায় সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আমাদের যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। এ কারণে প্রিয় নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ মেনে ফার্মগেট এলাকায় আমরা প্রতিরোধের ব্যারিকেড তৈরি করেছিলাম। ২৫শে মার্চ আমরা স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের নির্দেশে ফার্মগেটে কড়ইগাছ কেটে, পুরনো ভাঙা গাড়ি, ইট-সুরকি দিয়ে বড় ব্যারিকেড তৈরি করেছিলাম।

ভয়াল সেই কালরাতে নিরস্ত্র বাঙালিদের হত্যা করতেই অপারেশন সার্চলাইটের নীলনকশা চূড়ান্ত হয়। এই অপারেশনের প্রধান টার্গেট ছিল আন্দোলনরত আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করতে বল প্রয়োগ করা। অস্ত্রের ভাষায় পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিল। এ কারণে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হওয়া অসংখ্য সাঁজোয়া যানের গন্তব্য ছিল রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধুর বাসভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তর। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফার্মগেটের সামনে এসে বাঙালির ব্যারিকেডের মুখে পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিরোধের প্রথম ব্যারিকেড গুঁড়িয়ে দিয়ে আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঘাতকরা সামনের দিকে চলে যায়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনেই আমরা ফার্মগেটে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ তৈরি করতে পেরেছিলাম। সে রাতে রচিত হয়েছিল পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা।

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের প্রেরণার শক্তির উৎস ছিলেন আমাদের নেতা শেখ মুজিব। তাঁর নেতৃত্বেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। শেখ মুজিবের রাজনীতির গোড়াপত্তন হয়েছে বঞ্চিত বাংলার সুদূর গ্রামাঞ্চলে, নীরব-নিভৃত পল্লীতে। যে ক্ষমতার উৎস জনগণের সমবেত ইচ্ছায়, সহযোগিতায় ও সমর্থনে নিহিত, সে সুপ্ত ক্ষমতার পুনর্জাগরণই মুজিব রাজনীতির মূলমন্ত্র। আবেদন-নিবেদনে অবিচার, শোষণ-বঞ্চনার অবসান কখনো হয় না। সে জন্য প্রয়োজন জনশক্তির। অকৃত্রিম ভালোবাসার জাগরণী মন্ত্রে এই জনশক্তিকে জাগিয়ে তোলাই ছিল মুজিব রাজনীতির মুখ্য উদ্দেশ্য। জনতার শক্তিকে বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন। সেই শক্তিকে বিশ্বাস করেই বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগণের কল্যাণে রাজনীতি করছেন। গ্রাম কিংবা শহরের প্রত্যেক মানুষের মনের কথা বুঝে পথচলার শক্তি নিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন করছেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির অপর নাম জনগণকে ভালোবাসা। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অমৃতধারায় সঞ্জীবিত এক প্রাণশক্তি। যিনি ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও বলতে দ্বিধা করেননি, ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। একবার মরে, দুইবার মরে না। আমি বলেছিলাম, তোমরা আমাকে মেরে ফেললেও আমার আপত্তি নাই। শুধু মৃত্যুর পর আমার লাশটা আমার বাঙালির কাছে ফিরিয়ে দিয়ো।’

রাজনীতির মহাকবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। গোপালগঞ্জে বাইগার নদীর তীরঘেঁষে ছবির মতো সাজানো গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। বাবা শেখ লুত্ফর রহমান এবং মা সায়েরা খাতুনের আদরের তৃতীয় সন্তান ‘খোকা’। গিমাডাঙ্গা-টুঙ্গিপাড়া স্কুলে হাতেখড়ি। কিশোর বয়সে খোকা হয়ে ওঠেন প্রতিবাদী কিশোর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসী। একবার বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ সফরে যান এবং মিশনারি স্কুল পরিদর্শন করেন। সেই সময় সাহসী কিশোর মুজিব তাঁদের কাছে স্কুলঘরে বর্ষার পানি পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে মেরামত করিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার আদায় করেন। তখন সবার নজরে আসেন খোকা। সবাই বলতে শুরু করে—এই ছেলে একদিন অনেক বিখ্যাত হবে। পরবর্তীকালে এই খোকাই হয়ে ওঠেন বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহানায়ক জাতির পিতা, যাঁর নেতৃত্বে আমরা পেয়েছি বহুকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

এন্ট্রান্স পাসের পর শেখ মুজিব কলকাতায় ভর্তি হন ইসলামিয়া কলেজে। সেখানেও ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। প্রথমে মুসলিম লীগের কাউন্সিলর এবং পরবর্তীকালে কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তরুণ শেখ মুজিব। দেশভাগের আগের বছরে কলকাতায় দাঙ্গা প্রতিরোধেও তিনি ছিলেন অগ্রণী যোদ্ধা। মানবতার জন্য লড়াই করেছেন। কৈশোর থেকে যৌবনে জোর গতিতেই গড়ে উঠছিল আগামীর বজ্রধ্বনি শেখ মুজিব।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেখ মুজিব বুঝতে পারলেন, বাঙালি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। সংকল্প করলেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার। প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। প্রথম প্রতিবাদ করেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রশ্নে। যখন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াকু ছাত্রনেতা শেখ মুজিবসহ উপস্থিত ছাত্ররা ‘নো’ ‘নো’ বলে স্লোগান দেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হলেন শেখ মুজিব। কিন্তু কয়েক দিন পর পাকিস্তান সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ে মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারান শেখ মুজিব। তাঁকে আবারও জেলে নেওয়া হয়। কিন্তু তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি।

জেলে থাকতেই বাঙালির অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। জেল থেকে বের হয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে গোটা পূর্ব পাকিস্তান চষে বেড়িয়েছেন, মানুষের সঙ্গে মিশেছেন।

বাঙালির মনোভাব বোঝার চেষ্টা করেছেন। নেতাকর্মীদের খোঁজ রাখা, কর্মী সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সরকারবিরোধী সংগঠন আওয়ামী লীগকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠিত করেছিলেন। প্রচণ্ড ধীশক্তির অধিকারী নেতা শেখ মুজিব কর্মীদের নাম মনে রাখতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেছেন।

তরুণ রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবকে সব সময় গোয়েন্দারা নজরদারির মধ্যে রাখত। কারণ তাঁর মধ্যে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার নেতৃত্বগুণ ছিল। মানুষ তাঁর কথা বিশ্বাস করত এবং তিনি ছিলেন আপসহীন। এ কারণে ১৯৫০ সালের শুরুতে আবার গ্রেপ্তার হলেন মুজিব। টানা আড়াই বছর বন্দি করে রাখা হলো তাঁকে। ছোট্ট হাসিনা মায়ের সঙ্গে জেলগেটে বাবাকে দেখতে যেত। বাবাকে রেখে শেখ হাসিনা আসতেই চাইত না। দীর্ঘ ২৭ মাস পর জেলখানা থেকে মুক্তির পর বাড়িতে যান শেখ মুজিব। অনেক দিন পর বাবাকে পেয়ে শেখ হাসিনা খুবই আনন্দিত হয়। কিন্তু ছোট্ট শেখ কামাল বাবাকে চিনতে পারে না। কারণ কামালের জন্মের পর থেকেই বাবা শেখ মুজিব জেলখানায়। দীর্ঘদিন জেলে থাকলে নিজের সন্তানও বাবাকে চিনতে পারে না। কিন্তু আমাদের নেতা শেখ মুজিব শুধু বাঙালির অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে ৩০৫৩ দিন জেল খেটেছেন।

জনগণের কাছে বন্ধু, জাতির কাছে পিতা আর পরিবারের কাছে? ঘরের থেকে যিনি বেশি থাকেন জেলখানায়, পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার তাঁর সুযোগ মিলেছে কম; এমনকি বড় মেয়ের বিয়েটাও নিজে উপস্থিত থেকে দিতে পারেননি বাবা হয়ে। যদিও তাঁর হয়ে নীরবে কিন্তু শক্ত হাতে সংসার সামলেছেন যোগ্য সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। যাঁর ওপর ন্যস্ত ছিল পরিবারের সবাইকে দেখে রাখার দায়িত্ব; এমনকি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে বিপদের আশ্রয়স্থল ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তিনি সংসার চালানোর পাশাপাশি কারাবন্দি স্বামীর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গোপনে নেতাকর্মীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। সংসারের খরচের টাকা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হাতে দিতে অভ্যস্ত ছিলেন বেগম মুজিব। বাসার ফ্রিজ বিক্রি করে দিয়েও সংসারের খরচ চালিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নানাভাবে আওয়ামী লীগ পরিচালনায় বঙ্গমাতা অবদান রাখতেন।

রেণু থেকে বঙ্গমাতা হয়ে ওঠা সহজ ছিল না। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সাহস জোগাতে বারবার ছুটে যেতেন জেলখানায়, আবার তাঁকে লেখা লম্বা চিঠিতে লুকাতেন এক হাতে সংসার সামলানোর যাতনা। এই বঙ্গমাতাকে পাশে পেয়েছিলেন বলেই ‘বঙ্গবন্ধু’ হতে পেরেছেন বাংলার অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠ পুরুষ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে যাওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে দলীয় নেতারা অনেক পরামর্শ দিয়েছিলেন। শুধু ব্যতিক্রম ছিলেন বেগম মুজিব। তিনি বঙ্গবন্ধুকে কারো পরামর্শ না শুনে নিজের মনের কথাই পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ভাষণে বলার অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু এত দিন যে স্বপ্ন দেখেছেন, সেই হৃদয়ের কথাগুলো শুনতে বাঙালি ব্যাকুল হয়ে আছে—বঙ্গমাতার কয়েকটি সহজ কথা মেনেই বঙ্গবন্ধু দিতে পেরেছিলেন স্বাধীনতার ঘোষণা। রচিত হয়েছিল ইতিহাস।

কাজ থেকে ফুরসত কম মিললেও পরিবারের কারো প্রয়োজনের কথা বেখেয়াল হতেন না বঙ্গবন্ধু। আর নাতি-নাতনিদের সঙ্গ পেলে তো কথাই নেই। ভালোবাসতেন পরিবারের সঙ্গে একত্রে খাবার টেবিলে বসতে, হাসি-আনন্দে মশগুল হতে। এমনই সুখী একটি পরিবারের কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, একটা কালরাত তাঁদের সব সুখস্মৃতি চিরতরে ম্লান করে দেবে।

একজন বড় মাপের মানবতাবাদী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক। একটি অসহযোগ আন্দোলন তিনি পরিচালনা করেছেন। সামরিক জান্তার উসকানি, হত্যা, রক্তপাত এবং অবাঙালিদের দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি সত্ত্বেও তিনি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন থেকে সরে আসেননি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই সামরিক বাহিনীর সশস্ত্র অবস্থানের মধ্যে বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় সেনা প্রত্যাহার করা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুরই দূরদর্শী ও সাহসী নেতৃত্বের কল্যাণে। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও দক্ষতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী যুদ্ধজয়ের তিন মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে সব ভারতীয় সেনা নিজ দেশে ফিরিয়ে নেন।

স্মরণীয় যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৫০ বছর পরও জার্মানির মাটিতে মার্কিন, সোভিয়েত, ব্রিটিশ ও ফরাসি সেনাবাহিনীর অবস্থান ছিল। কোরিয়া যুদ্ধের ৫০ বছর পরও দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা আর জাপানে অদ্যাবধি মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টে যখন ভোর হচ্ছিল, বাঙালি তখনো বোঝেনি, কী ভয়ংকর অমানিশায় নিপতিত হচ্ছে গোটা জাতি। নিজ বাসভবনে সেনাবাহিনীর একদল পথভ্রষ্ট উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে নিহত হয়েছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তাঁর বিদায়ে মুখ থুবড়ে পড়ে বাংলার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। প্রশাসন থেকে রাজনীতিতে। নিজের রক্তে, স্বজন-বান্ধবের রক্তে রাঙা যে বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধু পরের প্রজন্মের জন্য গড়ছিলেন, তা কলুষিত হলো ষড়যন্ত্র, ক্যু আর বিভ্রান্ত রাজনীতিতে। যাঁরা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সৈনিক, যাঁরা বিশ্বাস করতেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে, তাঁদের জন্যও শুরু হয় অন্ধকার সময়। আর সদম্ভে ঘুরতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী অপশক্তিরা।

তবে আদর্শ কখনো মরে না। শোকাতুর বাঙালির হৃদয়ে অনেক রক্তক্ষরণের পর জাতির পিতার আদর্শের প্রাচুর্যেই আবারও জেগে ওঠে বাংলাদেশ। পিতার দেখানো পথে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর পিতার মতোই গ্রাম-গঞ্জ-শহর এবং পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। মানুষের কষ্ট-দুঃখের কথা শুনেছেন। বাংলার মানুষ তখন মুজিবকন্যাকে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। পঁচাত্তর-পরবর্তী ভঙ্গুর আওয়ামী লীগের তৃণমূল সুসংগঠিত করেছেন। পিতা মুজিবের মতোই কন্যা হাসিনা বাঙালিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তাই এ দেশের মানুষ দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ। এরপর আবার শুরু হয় ষড়যন্ত্র। বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনের পর ওয়ান-ইলেভেনের সামরিক শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা এবং আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁকে যোগ্য সাহচর্য দিয়ে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা।

বঙ্গবন্ধু একটি জাতির রূপকার। স্বাধীন বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু—এই দুটি নাম তাই অভিন্ন। আমরা সৌভাগ্যবান এ কারণে যে শেখ মুজিবের কর্মী ছিলাম। আরো সৌভাগ্যবান; কারণ আমরা বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে মানুষের সমস্যা উপলব্ধি ও খোঁজখবর নেওয়ার জন্য উপদেশ দিয়েছিলেন। আমি সেই উপদেশ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।

বাঙালি জাতি এখনো বিশ্বাস করে, বঙ্গবন্ধু অমর। আমরা বঙ্গবন্ধুকে বেশি দিন দেশ শাসনের সুযোগ দিইনি। এ কারণে দীর্ঘ সময় পিছিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তাঁর সাড়ে তিন বছরের রাষ্ট্রক্ষমতায় তিনি আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে তার পরিকল্পনা করেছিলেন। যার সফল বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত এক যুগে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নের সব সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা করোনাভাইরাসের মহামারির সময় নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। মাথাপিছু আয় এবং জিডিপিতে আমরা ভারত-পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছি। স্বপ্নের পদ্মা সেতু এখন বাস্তবতা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন হবেই ইনশাআল্লাহ।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং সিনিয়র সহসভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*