বল বীর, বল চিরউন্নত মম শীর। এই বীর আয়াতুল্লাহ খামেনিকে সমস্ত পৃথিবীর মানুষ শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট মানুষ হত্যাকারীকে সবাই নিন্দা জানাচ্ছে। শুধু ইরানের নাগরিক নয়, পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক সচেতন মানুষের হৃদয়ে আয়াতুল্লাহ খামেনি অমর।
এ ছাড়া ইরাক-ইরানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জেনারেল কাসেম সোলেইমানি এবং অন্যান্য প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাদের লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শত্রু হিসেবে দেখত, কারণ তিনি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্যকে সীমিত করার শক্তিশালী নীতি অনুসরণ করতেন। খামেনি শুধু ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ছিলেন না, তিনি দেশের পারমাণবিক ও সামরিক নীতি নির্ধারণ করতেন এবং আঞ্চলিক শক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্বাধীন নীতি চালু রাখতেন।
মৃত্যুর মাত্র ১১ দিন আগে আয়াতুল্লাহ খামেনি জনসম্মুখে সর্বশেষ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেশের প্রতিরোধক অস্ত্রের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জোর দিয়ে বলেন, “আমাদের প্রতিরোধক অস্ত্র থাকতে হবে; যদি কোনো দেশের কাছে তা না থাকে, তবে তাদের শত্রুরা তাদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে।” জেনেভায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরোক্ষ আলোচনার সময় এই বক্তৃতা দেন তিনি।
খামেনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমেরিকানরা কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের দেশে নাক গলাচ্ছে। তারা বলে তোমার মিসাইলের রেঞ্জ এতটুকু হবে, বেশি নয়! এর মানে কী? এই ব্যাপার তো ইরানি জাতির নিজস্ব বিষয়।”
তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী হলেও কখনো কখনো শক্তিশালী থাপ্পড় খেতে হয়, এতটাই শক্তিশালী যে, এরপর আর তারা উঠে দাঁড়াতে পারে না।”
বিশ্ব ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়— ইরানি বিপ্লব। ১৯৭৯ সালে এই বিপ্লব ইরানকে পাশ্চাত্যপন্থি রাজতন্ত্র থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে। বহু ইতিহাসবিদের মতে, ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর এটিই আধুনিক যুগের তৃতীয় বৃহৎ বিপ্লব।
বিপ্লবের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনী। দীর্ঘ নির্বাসনের পরে তিনি স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন, যখন ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র রূপ নিয়েছিল। নির্বাসনের সময় খোমেনি ফ্রান্সের শান্ত গ্রাম নফলে-ল্য-শাতো থেকে আন্দোলনের দিকনির্দেশনা দিতেন। আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে তার বক্তব্য দ্রুত দেশ ও বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ত।
ইরানের রাজতান্ত্রিক যুগের শেষ অধ্যায়ের নাম— মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। পারস্যের সম্রাট মহান কুরুশ প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্য প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেই দীর্ঘ ধারার শেষ সম্রাটই ছিলেন রেজা শাহ পাহলভী। ১৯৫৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেক ক্ষমতাচ্যুত হন এবং শাহ পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।
১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারিতে শাহ দেশত্যাগ করলে খোমেনির প্রত্যাবর্তনের পথ সুগম হয়। প্যারিস থেকে তেহরান যাওয়ার ঐতিহাসিক যাত্রায় সহযাত্রীরা আবেগে উচ্ছ্বসিত হন, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, তারা ইতিহাসের অংশ হতে চলেছেন। তেহরানে অবতরণের সঙ্গে সঙ্গে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিপ্লব শুধু ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো পরিবর্তন করেনি, মুসলিম বিশ্বে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে এবং পশ্চিমা শক্তি ব্যবস্থার সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে।
তিন দশকেরও বেশি সময় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলী খামেনেয়ী। তাঁর মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ইরানের রাজনৈতিক কাঠামো বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় ভিন্ন। দেশটিতে প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হলেও রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে জন্মগ্রহণ করেন আলী (খামেনেয়ী) খোমেনী। শৈশব থেকেই ধর্মীয় শিক্ষায় দীক্ষিত হয়ে তিনি পরে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র কোম-এ উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
১৯৬০-এর দশকে তিনি শাহবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে তিনি একাধিকবার গ্রেফতারও হন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর তিনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন, পরে উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৮১ সালে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই বছর রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাই নিহত হলে খামেনেয়ী ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং আট বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) তাকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। সে সময় সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে তার নেতৃত্ব গ্রহণের পথ সুগম করা হয়।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনেয়ী ছিলেন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, বৈদেশিক নীতি, সামরিক কৌশল এবং রাষ্ট্রের প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্তে তার অনুমোদন অপরিহার্য ছিল। তার নেতৃত্বকালে বিভিন্ন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন—যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:মোহাম্মদ খাতামি, সংস্কারপন্থী নীতির প্রবক্তা। মাহমুদ আহমাদিনেজাদ, রক্ষণশীল অবস্থানের নেতা। হাসান রুহানি, পরমাণু চুক্তির স্থপতি। ইব্রাহিম রাইসি, কট্টরপন্থী নেতৃত্ব। মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংস্কারপন্থী ধারা।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর দেশব্যাপী আন্দোলন দমনে তাঁর ভূমিকা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। ২০১৩ সালে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি সম্পাদনেও তাঁর সম্মতি ছিল, যদিও পরে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হলে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়।
২০২০ সালে ইরাকে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হলে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
একই বছর ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স-এর একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনায় সরকার ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে কোভিড-১৯ মহামারিও রাষ্ট্রকে নতুন সংকটে ফেলে।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে বিশেষজ্ঞ পরিষদ। এই পরিষদের সদস্যরা প্রতি আট বছরে নির্বাচিত হন, তবে প্রার্থিতা অনুমোদন করে গার্ডিয়ান কাউন্সিল— যার ওপর সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব উল্লেখযোগ্য।
আইন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা আজীবন দায়িত্বে থাকতে পারেন। সাধারণত এই পদে একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতাকে নির্বাচিত করার বিধান থাকলেও ১৯৮৯ সালে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে খামেনির নির্বাচনের পথ সুগম করা হয়েছিল।
আধুনিক ইরানের ইতিহাসে আলী খোমেনীর ভূমিকা শুধু একজন রাষ্ট্রনেতার সীমায় আবদ্ধ নয়; তিনি একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা, একটি মতাদর্শিক রাষ্ট্র এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করেছেন।
তার নেতৃত্বের অবসান বা পরিবর্তন—যে প্রেক্ষাপটেই ঘটুক না কেন—ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির সমীকরণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে—এ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা চলছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, নেতৃত্বে ক্ষয়ক্ষতি হলেও রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার নীতি ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আলী রেজা আরফির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতি, বিচার বিভাগের প্রধান এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিল-এর একজন সদস্য অংশ নিতে পারেন— যা সংবিধানসম্মত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষ বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts) দ্রুত বৈঠক আহ্বান করে নতুন সর্বোচ্চ নেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে চলমান সংঘাত, অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রভাবশালী সামরিক শক্তি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর সম্ভাব্য ভূমিকা ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, সামরিক প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য— তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হিসেবে সামনে এসেছে।
খোমেনীর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র— যা শুধু ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই বদলে দেয়নি, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলোর মধ্যে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয় এবং বহু দেশে নতুন আদর্শিক ইরানী বিপ্লবের ঢেউ প্রসারিত হচ্ছে। খোমেনীর দেখানো পথেই একদিন গোটা মধ্যপ্রাচ্য চলবে, বিশ্বমানবতার শত্রুরা পরাজিত হবে, আর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ ধ্বংস হবে—এটাই হবে খোমেনীর সত্যিকারের বিজয়। জয়তু খোমেনী। রেড স্যালুট আপনাকে।
লেখক : গবেষক ও রাজনৈতিক কলাম লেখক
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
