অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৩৮ শিশুর। প্রতিদিন হামের লক্ষণ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি রোগী হাজার ছাড়িয়েছে। হাম আক্রান্ত রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে শিশুদের হামসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা না দেওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া গতকাল রাজধানীর গুলশানে এক আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের হাম প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করলেই হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ জানা যাবে বলে মন্তব্য করেছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের হাম প্রতিরোধের সার্বিক প্রস্তুতি পর্যালোচনা করলেই বের হয়ে আসবে হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ। ৪৯ দিনে দেশে হাম ছড়িয়ে যায়নি। ইউনূস সাহেব যাকে যেখানে বসিয়েছিলেন তারা ঠিকভাবে কাজ করেননি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ২৮২ জন, মারা গেছেন পাঁচজন। গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮ হাজার ৫৩৪ জন, মারা গেছেন ১৩৮ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম শনাক্ত হয়েছে ১৮০ জনের। এ পর্যন্ত হাম শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৯৯ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় দুজনের মৃত্যু হামের কারণে বলে নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
৯ দিন ধরে হামে আক্রান্ত দুই বছরের মেয়ে সিফাতকে নিয়ে মহাখালীর ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালে আছেন টঙ্গীর হানুফা বেগম। তিনি বলেন, সিফাতের শরীরে লাল র্যাশ দেখা দেয় এবং জ্বর আসে। টঙ্গীর এক ক্লিনিকে ডাক্তার হামের উপসর্গ জানিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে বলেন। নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে অন্য আরেক হাসপাতাল ঘুরে এখানে এসেছি। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে মেয়েকে। জ্বর কিছুটা কমতে শুরু করেছে।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রাজধানীর মহাখালীর ডিএনসিসি হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করেছে। গতকাল ওয়ার্ডে গিয়ে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা অন্তত চারটি হাসপাতাল ঘুরে শয্যা না পেয়ে এখানে এসেছেন। রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রোগী। রোগীর চাপ সামলাতে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আলাদা হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও রোগীতে পরিপূর্ণ। সংক্রামক ব্যাধি হাম ছড়িয়ে পড়েছে দেশের ৫৬ জেলায়। শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে অভিভাবকদের। হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনতে গত রবিবার থেকে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ডা. তানজিনা জাহান বলেন, ‘শিশুদের ক্ষেত্রে হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়া ও তীব্র শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক শিশুর মধ্যে পুষ্টির অভাব লক্ষ্য করা গেছে। আমাদের চিকিৎসকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন।’ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে বিশেষায়িত হাম ওয়ার্ডে শয্যা আছে ৪৪টি। এই ওয়ার্ডের ভেতরেই আছে ১৬ শয্যার একটি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)। মোট ৬০টি শয্যা হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য। কোনো শয্যা খালি নেই। গতকাল ৭১ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল এ হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১২ জন। ডিএনসিসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বেশির ভাগ রোগী আইসিইউ ও এনআইসিইউ না পেয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে এই হাসপাতালে আসছে চিকিৎসার জন্য। রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিশেষায়িত আইসিইউ ও শয্যার সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। এখানে একটি শয্যা খালি হলে অন্য একটি শিশুকে ভর্তি করা হচ্ছে।
হাম রোগে আরো তিন শিশুর মৃত্যু : হাম রোগে ২৪ ঘণ্টায় আরো তিন শিশু মারা গেছে এবং হাসপাতালে নতুন করে আরো রোগী ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
রাজশাহী : রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম রোগের উপসর্গ নিয়ে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালটিতে এখন হামের উপসর্গ নিয়ে ১৩৮ শিশু চিকিৎসাধীন। গতকাল দুপুরে হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, রবিবার দুপুর থেকে আজ (সোমবার) দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে এ দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ২০ শিশু ভর্তি হয়েছে। আর সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে পাঁচ শিশু। হাসপাতালটিতে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৪১১ শিশু। আর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪২ শিশু।
সিলেট : সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গতকাল দুপুরে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই মাস বয়সি এক শিশু মারা গেছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, দুই দিন আগে হাম ও হৃদযন্ত্রের জটিলতা নিয়ে ওই শিশুটিকে ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া গতকাল সকাল পর্যন্ত সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি ছিল ১০১ জন। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গতকাল থেকে ওসমানী হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়েছে। এর আগে ২৬ মার্চ শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১০০ শয্যার আইসোলেশন চালু করা হয়।
রংপুর : রংপুর বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ থাকা ৩৩ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং ১৪ জন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রংপুর বিভাগের দিনাজপুরে ১৬, গাইবান্ধায় ৩ রোগী শনাক্তসহ রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২ ও দিনাজপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২ রোগী ভর্তি হয়েছে।
রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. গাউসুল আজম বলেন, ‘সারা দেশের হামের নমুনা পরীক্ষা ঢাকায় হয়। এজন্য ফলাফল আসতে একটু সময় লাগছে। এ অবস্থায় সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভাগীয় শহরগুলোতে হাম পরীক্ষার ল্যাব স্থাপন করলে ভুক্তভোগীদের উপকার হতে পারে।’
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
