ব্রেকিং নিউজ
Home » জাতীয় » ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়
ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়

ইতিহাসের একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়

অনলাইন ডেস্ক:

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। তাঁর অবদানের কারণে তিনি জাতির ইতিহাসে নিজের অবস্থানকে সুদৃঢ় করেছেন। বঙ্গবন্ধুর পরিণত ও নির্ভীক নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিল। দেশের স্বাধীনতায় তাঁর অসামান্য অবদানের কারণে যত দিন বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র থাকবে, তত দিন বাংলাদেশের জনগণ তাঁকে স্মরণ করবে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ দিয়েছিলেন, যা বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিল, যা পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের নিষ্পেষণ থেকে দেশকে মুক্ত হতে সাহায্য করেছিল। তার বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়ে হাজার হাজার মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মাহুতি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল।

তাঁর মতো নেতারা যেকোনো রাজনৈতিক অবস্থার গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন। তাই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্পষ্ট ও সোজাসাপ্টাভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা না করে তিনি কূটনৈতিকভাবে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ’ পাকিস্তানি জান্তা সরকার সেদিন তাঁকে ঠিকমতো চিনতে পারেনি। যদিও তারা তাঁকে একজন বিছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। তাঁর দিকনির্দেশনার কারণে আমরা মাত্র ৯ মাসের মধ্যে নিজেদের মুক্ত করতে পেরেছিলাম।

স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতিকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তিনি অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে পারতেন। দুর্ভাগ্যবশত আমরা জাতির জন্য তাঁর আজীবন সেবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সবচেয়ে ভয়াবহ রাতে আওয়ামী লীগের বিশ্বাসঘাতকদের একটি দল এবং সেনাবাহিনীর একদল সদস্য তাঁকে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের সঙ্গে হত্যা করে। সেই রাতের ঘটনাটি ছিল বাঙালি জাতির জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক অধ্যায়। আমি এখনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না, কেন সেদিন ঘাতকের দল শিশু রাসেলকে হত্যা করেছিল, যার রাজনীতির কোনো সম্পৃক্ততাই ছিল না। সম্ভবত ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে তারা তাঁর কোনো সন্তানকে জীবিত রেখে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চায়নি।

বিশ্বাসঘাতকরা তাদের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তাই ১৯৭৫-পরবর্তী সরকার বিশ্বাসঘাতক ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের পরিবর্তে পুরস্কার ও দায়মুক্তি দিয়েছিল। একটি স্বাধীন দেশে জাতির পিতাকে হত্যার পর হত্যাকারীরা দায়মুক্তি পায়—এটা ভাবলেও শরীরে শিহরণ জাগে। বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে উপকৃত হওয়া কয়েকজন ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে তাঁর অবদানকে মুছে ফেলা। ষড়যন্ত্রকারীদের ধারণা ছিল না যে বঙ্গবন্ধুকন্যা ভবিষ্যতে কোনো একসময়ে ক্ষমতায় এসে তাদের সব অপরাধের বিচার করবে। আর এই কারণেই ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কোনো সরকারই ১৫ই আগস্টে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানায়নি।

১৯৮১ সালে সামরিক কর্তৃপক্ষ যখন আওয়ামী লীগে ভাঙন তৈরি করেছিল, তখন খুনিদের ধারণা ছিল না যে বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা সেই দলের নেতৃত্ব দিতে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন। দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনা শুধু দলকে সংগঠিতই করেননি, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচারের আইনি প্রক্রিয়াও শুরু করেছিলেন, যাদের ২১ বছর ধরে রাষ্ট্র দায়মুক্তি দিয়ে রক্ষা করেছিল। শেখ হাসিনা সরকার বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে জঘন্য সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে দেখে আনন্দ অনুভব করি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে তাঁর পিতার অবদানকে ইতিহাসে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাস পুনর্লিখন করেন, যা পূর্ববর্তী সরকারগুলো দ্বারা বিকৃত করা হয়েছিল।

১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করা যায়নি। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসতে ব্যর্থ হলে পরবর্তী পাঁচ বছর বিচার কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরে এসে সেই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের খুনিদের বিচারের কার্যক্রম আবার শুরু করেন। আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বেশ কয়েকজন খুনির মৃত্যুদণ্ড এরই মধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। তবে প্রত্যেক ষড়যন্ত্রকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, কারণ বেশ কয়েকজন অন্য দেশে পালিয়ে গেছে এবং এখনো পলাতক রয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য সরকারের উচিত পলাতক ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা। এ লক্ষ্য সম্পূর্ণভাবে অর্জনের পর জাতি হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে পারব।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৫ই আগস্টকে একটি ‘কালো রাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করে সেই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলেছিল? বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবৃদ্ধির অগ্রগতি বিপরীতমুখী হয়ে গিয়েছিল। আমরা সবাই জানি যে আমাদের দেশে জাতি দুই ভাগে বিভক্ত। মানুষের মধ্যে ব্যক্তিগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কিছু নির্দিষ্ট ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ এই ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে ১৫ই আগস্টের বর্বরতা দেশের ইতিহাসে খুবই ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা। তাই রাজনৈতিক আনুগত্য নির্বিশেষে সবার উচিত ১৫ই আগস্টে জাতীয় শোক দিবসে সেই কালো রাতের ঘটনার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করা এবং সেই দিনে বঙ্গবন্ধুসহ সব নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা।

আমাদের মধ্যে কারো কারো রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু আমাদের সবার একমত হওয়া উচিত এই মর্মে যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো জঘন্য ঘটনা আমাদের দেশে কখনোই ঘটা উচিত ছিল না। আমরা অনেকেই এখনো বুঝতে পারি না যে বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে হত্যা করে আমরা কী হারিয়েছি। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে আজ বাংলাদেশের অবস্থা অন্য রকম হতো। এই কারণে প্রতিবছর ১৫ই আগস্ট দল-মত-নির্বিশেষে আমাদের সবার উচিত সেই কালো রাতের ভয়াবহতায় যাঁদের হত্যা করা হয়েছিল তাঁদের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করা এবং সংঘটিত অপরাধের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা। জাতীয় শোক দিবসে ১৫ই আগস্টের বর্বরতার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করার দায়িত্ব শুধু আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের নয়। যেহেতু এটি দেশের জন্য একটি দুঃখজনক ঘটনা, তাই সবার উচিত জাতীয় শোক দিবস পালন করা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাতটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার রাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এই দিনে আমাদের সবার প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত একটি স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে স্বাধীনতার চেতনা চিরস্থায়ী হবে এবং জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে প্রত্যেকের জন্য আইনের সমান সুযোগ থাকবে। আর এই রকম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে পারি। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাঁর পিতার আজন্ম লালিত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ১৫ই আগস্টের নৃশংসতা থেকে আমরা শিখেছি যে একজন নেতাকে হত্যা করে জাতির ইতিহাস থেকে তাঁর অবদান মুছে ফেলা যায় না। যত দিন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থান করবে, তত দিন বঙ্গবন্ধুর অবদান, বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বাংলাদেশের জনগণ হূদয়ে ধারণ করবে।

 লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com