ব্রেকিং নিউজ
Home » প্রচ্ছদ » এইডস : বাঁচতে হলে জানতে হবে
এইডস : বাঁচতে হলে জানতে হবে

এইডস : বাঁচতে হলে জানতে হবে

এইডস : বাঁচতে হলে জানতে হবে

 

পৃথিবীতে যে কয়েকটি ভাইরাস মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ, তার একটি হলো এইচআইভি। এই ভাইরাসের মাধ্যমেই মরণব্যাধি “এইডস” বাসা বাঁধে মানব শরীরে। যে রোগে আক্রান্ত হলেই নিশ্চিত মৃত্যু। যা রোগীর শরীরে সকল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করে রোগীকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর পথে ঠেলে দেয়। এই মরণাপন্ন রোগ সম্পর্কে পৃথিবীবাসীকে সচেতন করতে প্রতিবছর ১ ডিসেম্বর “বিশ্ব এইডস দিবস” পালন করা হয়। আজ আমরা মানব শত্রু “এইডস” সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবো।

 

এইডস কী

এইডস এর পুরো নাম হল ‘অ্যাকুয়ার্ড‌ ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম’ এবং  এইচআইভি-পজিটিভকেই বলা “এইডস।” এটা একাধারে সংক্রামক এবং মরণব্যাধির একটি রোগ। যা বর্তমান বিশ্বে খুবই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

 

এইডসএর পূর্ণাঙ্গ রূপ

এ : অ্যাকুয়ার্ড- যা অর্জিত হয়েছে, বংশানুক্রমে বা উত্তরাধিকারসূত্রে সংক্রামিত হয়নি

আই : ইমিউন- মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

ডি : ডেফিশিয়েন্সি- কম, যথেষ্ট নয়, কমে যায়

এস : সিনড্রোম- বিভিন্ন জটিলতা ও একটি বিশেষ অসুখের লক্ষণ।

 

এই রোগের ভাইরাস “এইচআইভি”  কারো শরীরে প্রবেশ করলে তার শরীরের রোগপ্রতিরোধক কোষ যেমন- ম্যাক্রফেজ, মনোসাইট, ডেনড্রাইটিক সেল, হেলপারটি সেল, চর্মের ল্যাঙ্গারহেন্স, মস্তিষ্ক ও গোয়াল সেল ইত্যাদিকে আক্রমণ করে এবং ধীরে ধীরে  সেগুলোর কর্মক্ষমতাকে ধ্বংস করে দিয়ে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়। এতে যেকোনো সংক্রামক জীবাণু সহজেই এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আক্রমণ করে অসুস্থ করে দেয়। যারফলে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের রোগের সৃষ্টি হয়। যা ধীরে ধীরে তাকে মৃত্যু দিকে নিয়ে যায়।

 

এইচআইভির  বাসস্থান

এই ভাইরাস শরীরের বিভিন্ন জলীয় অংশে বাস করে। যেমন- রক্ত, পুরুষের বীর্য, মেয়েদের যৌন রস, বুকের দুধ, মুখের লালা, ঘাম ও চোখের পানিতে। তবে মুখের লালা, ঘাম ও চোখের পানিতে এই ভাইরাস খুবই  কম থাকে যে কারণে সেটা দিয়ে নতুন করে কেউ সংক্রমিত হতে পারে না।

 

এইডস সংক্রমিতের ধাপ

এইচআইভি’র সংক্রমণ তিনটি পর্যায়ক্রমিক ধাপে হয়ে থাকে।

এই ধাপগুলো হলো

 

অ্যাকিউট এইচআইভি ইনফেকশান (প্রথম ধাপ): এইচআইভি ভাইরাস সংক্রমিত হলে প্রথমেই রোগীর শরীরের মারাত্মক কোনো প্রভাব পড়ে না। তবে ভাইরাস সংক্রমিত ব্যক্তি ঘনঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে। শারীরিক এই অবস্থাকে বলা হয় রেট্রোভাইরাল সিনড্রম বা প্রাথমিক এইচআইভি সংক্রমণ। এইডসের প্রথম ধাপে ফ্লুর মতো জ্বর হয়, যা দুই এক সপ্তাহ পরে সেরে যায়। এছাড়া এ ধাপে এইডস এর আরো বেশ কিছু উপসর্গ দেখা যেতে পারে; যেমন- পেটের প্রদাহ, মাথাঘোরা, বমিভাব, ক্লান্তি, পেশীর ব্যথা, গলা ব্যথা, গাঁট ফুলে যাওয়া, শরীরের ঊর্ধ্বাংশ বা টরসোতে লাল লাল গোটা গোটা দাগ, তীব্র জ্বর ইত্যাদি।

 

ক্রনিক এইচআইভি ইনফেকশান (দ্বিতীয় ধাপ) : এইচআইভি সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপকে বলা হয়  অ্যাসিম্পটোম্যাটিক বা ক্লিনিক্যালি লেটেন্ট পিরিয়ড। এ সময় এইডসের এর লক্ষণ বোঝা যায় না। রোগী বুঝতেই পারে না তার শরীরে কত মারাত্মক ভাইরাস বাসা বেঁধে আছে। ফলে নিজের অজান্তেই রক্তদান বা অন্য কোনো উপায়ে এইচআইভি ভাইরাস অন্যের শরীরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। ক্রনিক এইচআইভি ইনফেকশানের এই ধাপ  দশ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

 

এ সময় ভাইরাসটি রোগীর রক্তের সি-ডি-ফোর-টি কোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। ইমিউনিটি সিস্টেম নষ্ট হওয়ার কারণে রোগীর রক্তে এই কোষের সংখ্যা ক্রমশ কমতে থাকে। এবং দ্রুত রোগী অসুস্থ হয়ে পড়ে।

 

এইডস (তৃতীয় বা অ্যাডভান্স ধাপ): যখন রোগীর রক্তে প্রতি মাইক্রো লিটারে সি-ডি-ফোর-টি কোষ ২০০’র নিচে নেমে যায়, তখন ধরে নিতে হবে এটি সংক্রমণের অ্যাডভান্সড স্টেজ বা শেষ ধাপ। আবার যাদের কাপোসি’স সারকোমা বা ত্বকের ক্যানসার এবং নিউমোসাইটিস নিউমোনিয়া থাকে, তাদের এইডস হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। এসময় রোগীর শরীর ক্লান্ত দেখায়। সেইসাথে গলা ও পেট ও থাইয়ের মাঝ বরাবর অংশে ফোলাভাব, দীর্ঘদিন যাবৎ  জ্বর, রাত্রে ঘাম হওয়া, হঠাৎ করে ওজন কমে যাওয়া, চামড়ার উপর বেগুনি রঙের দাগ, হাঁপানি, নিয়মিত ডায়রিয়া হওয়া, মুখ, গলা ও ভ্যাজাইনাতে ছত্রাক সংক্রমণ, হঠাৎ করে রক্তক্ষরণ বা চোট পাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পেতে থাকে।

 

এইডসের লক্ষণসমূহ

এই রোগের আলাদা স্পেশাল কোনো লক্ষণ নেই। যা প্রাথমিক পর্যায়ে নিরুপণ করা যায়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের ধরণ বোঝা যায় না এবং চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়ে যায়। তাই সবারই এর লক্ষণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

 

ক্লান্তি : এই রোগে রোগী প্রথমেই অনুভব করেন ক্লান্তি। তাই কেউ যদি নিয়মিত ক্লান্তি অনুভব করে তাহলে তাকে এটিকে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া উচিত এবং এইচআইভি পরীক্ষা করা উচিত।

 

পেশী প্রসারণ : সাধারণ শারীরিক কাজকর্মে কেউ যদি অল্পতেই পেশীতে সবসময় ব্যথা এবং অস্বস্তি অনুভব করেন, তাহলে এটাকে অবহেলা করা যাবে না। এটি এইচআইভি এর একটি লক্ষণ হতে পারে।

 

জয়েন্টগুলোতে ব্যথা এবং ফোলা ভাব : বাড়তি বয়সের জন্য জয়েন্টগুলোতে ব্যথা এবং ফোলা ফোলা ভাব স্বাভাবিক। কিন্তু এটি যদি নির্দিষ্ট বয়সের আগেই ঘটে তবে চিন্তার বিষয়।

 

ওজন কমে যাওয়া : এইডস রোগীর ওজন প্রতিদিন একটু একটু করে হ্রাস পেতে থাকে। যদি কারো কোনো কারণ ছাড়া দুই মাসেই ওজন কমে যেতে থাকে তবে তাকে এ বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিৎ।

 

মাথা ব্যথা: যদি কারো মাথা সবসময় ব্যথা থাকে, এবং তা সকালের দিকে কমে তাহলে এটি এইচআইভির লক্ষণ হতে পারে।

 

ঠাণ্ডা লাগা: স্বাভাবিক আবহাওয়াতে ঠান্ডা লাগার কারণ ছাড়াই যদি ঠান্ডা লাগার ঘটনা ঘটে, তাহলে এটি এইচআইভির লক্ষণ হতে পারে।

 

পেটে প্রদাহ: এইডসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপসর্গ হলো পেটে প্রদাহ হওয়া। সেইসাথে নিয়মিত ডাইরিয়ার ভাব থাকা।

 

চামড়ার উপর প্রদাহ: এইচআইভির কারণে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে থাকে। যার প্রভাব ত্বকের উপর পড়ে। ফলে গলায় বা মাথায় লাল ফুসকুঁড়ি কিংবা র‌্যাশ দেখা দেয়। অনেক সময় ঠোঁট ও যৌন অঙ্গের চারপাশে  ফোসকা ও ঘা হয়ে তা  ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। এইজাতীয় উপসর্গ গুলো এইডস এর একটি লক্ষণ।

 

শুকনো কাশি এবং বমি বমি ভাব: অতিরিক্ত কাশি হওয়া, সেইসাথে মুখ ব্যথা করা এইডসের  এইচআইভির লক্ষণ হতে পারে। একইসঙ্গে খানা খাওয়ার পর পরই বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া শরীরের এইচআইভি সংক্রমণ বলা ধরা হয়।

 

ঘুমানোর সময় ঘেমে যাওয়া: যদি সাধারণ তাপমাত্রায় ঘুমের সময় ঘাম হতে থাকে তাহলে এটা এইডস এর কারণ হতে পারে।

 

গলা শুষ্ক থাকা: যদি প্রচুর পরিমাণ পানি পান করার পরও সবসময়  গলা শুকনো থাকে, তাহলে এই ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

 

অহেতুক দুশ্চিন্তা করা: অকারণে দুশ্চিন্তা করা, কান্নাকাটি বা মানসিক অবসাদগ্রস্ত থাকা এইচআইভির একটি কারণ হতে পারে।

 

শিশুদের ক্ষেত্রে এইডসের লক্ষণ

জন্মের পর শিশুর ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া, স্বাভাবিক বৃদ্ধি না হওয়া,  হাঁটতে সমস্যা হওয়া, মানসিক বৃদ্ধি দেরীতে হওয়া, কানের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া এবং টনসিলের মতো সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকট আকার ধারণ।  উপরোক্ত  একাধিক লক্ষণ দেখা দিলেই তার এইডস হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। তবে, সাবধানতা অবলম্বনে এইডসের পরীক্ষা করা জরুরী।

 

এইডস কিভাবে ছড়ায়

এইচআইভি মানবদেহের কয়েকটি নির্দিষ্ট তরল পদার্থে (রক্ত, বীর্য, বুকের দুধ ইত্যাদিতে) বেশি থাকে। ফলে, মানব দেহের এই তরল পদার্থগুলোর আদান-প্রদানের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। সুনির্দিষ্টভাবে যে যে উপায়ে এইচআইভি ছড়াতে পারে তা হল-

 

১) এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর রক্ত সাধারণ কোন  ব্যাক্তির দেহে দান করলে ঐ ব্যক্তি এইডসে আক্রান্ত হবে। বিশেষকরে যারা নেশাগ্রস্ত ভাসমান রক্তদাতা তারা এই পদ্ধতিতে এইডসের সংক্রমণ বৃদ্ধি করে।

২) এইডস আক্রান্ত মায়ের মাধ্যমে (গর্ভাবস্থায়, প্রসবকালে বা সন্তানের মায়ের দুধ পানকালে)। মায়ের এইডস থাকলে অবশ্যই তার গর্ভের সন্তানের এইডস হওয়ার ঝুঁকি বেশী। একইসাথে আক্রান্ত মা শিশুকে দুগ্ধ পান করালেও এইডস আক্রান্ত হবে।

৩) যেকোনো অনিরাপদ দৈহিক যৌন মিলনে। বিশেষকরে যৌন পল্লীতে যাদের নিয়মিত যাতায়াত তাদের এইডস হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। একইসাথে সমকামী এবং নিম্নশ্রেণীর যৌনকর্মী দ্বারাও এইডস ছড়ায়।

৪) আক্রান্ত ব্যাক্তি কতৃক ব্যবহৃত সুচ বা সিরিঞ্জ অন্য কোন ব্যাক্তি ব্যবহার করলেও এইডস হয়। যারা নেশাগ্রস্ত তারা এই উপায়ে বেশী আক্রান্ত হয়।

৫)  আক্রান্ত ব্যক্তির কোন অঙ্গ অন্য ব্যক্তির দেহে প্রতিস্থাপন করলে।

 

এইডস বৃদ্ধির কারণ

দিনদিন দেশে বিভিন্ন কারণে এইডসের রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ হলো-

 

পারিবারিক অনুশাসন না থাকা: সমীক্ষা দেখা যায় যে, কিশোর ও যুবক শ্রেণীরাই এইডস আক্রান্ত বেশী। এই কিশোর তরুণ যুবকরা পারিবারিক নৈতিক অনুশাসন না থাকার কারণেই নেশা এবং যৌনতায় মেতে উঠে।

 

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলা: পারিবারিক অনুশাসনের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন খুবই জরুরী। ধর্মীয় অনুশাসনে সর্বাবস্থায় নেশা এবং অবৈধ যৌনতাকে নিষিদ্ধ করে। এই ধর্মীয় অনুশাসন না থাকার কারণে কিশোর যুবকরা সহজেই নিষিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়ে। আর এভাবেই এইডসের মতো রোগের বিস্তার করে।

 

সহজলভ্য পতিতাবৃত্তি: আজ শহর গ্রাম সবখানেই পতিতাবৃত্তি হচ্ছে হাতের লাগালে। এই সহজলভ্য যৌনতার কারণে  কিশোর যুবক তরুণরা অনায়াসেই নিষিদ্ধ যৌনাচারে জড়িত হয়। যারফলে এইডসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় নিয়মিত হারে।

 

সহজলভ্য নেশাদ্রব্য: আজকাল নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে হাতের নাগালেই সকল নেশাদ্রব্য পাওয়া যায়। যা এইডসের বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

 

সামাজিক অবক্ষয়: দিনদিন সমাজ থেকে মানুষে নীতি নৈতিকতা উঠে যাচ্ছে। ফলে আজকাল কেউ কারো মন্দ দেখলেও তাকে শুধরানোর চেষ্টা করে না। একইসাথে সমাজের মানুষ টাকাপয়সাকে গুরুত্ব দেয়। যারফলে উপযুক্ত বয়সের বেশী হওয়ার পরও ছেলেদের বিয়ের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করে। এতেকরে তরুণ যুবকরা নিষিদ্ধ পল্লিতে যাতায়াত করে এইডসের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়: রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থের জন্য কিশোর তরুণদের ব্যবহার করছে প্রতিনিয়ত। এইসব কিশোর তরুণদের নিজেদের কাজে লাগানোর জন্য তাদের ঠেলে দেয় নেশা এবং নিম্নশ্রেণীর যৌনতায়। যেখানে গিয়ে হাজার কিশোর তরুণ নিজেদের ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা: রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে আজ লক্ষ লক্ষ তরুণ বেকার। এইসব শিক্ষিত অশিক্ষিত বেকাররা উপযুক্ত বয়স পার হওয়ার পরও বিয়ে করতে পারে না। ফলে তারা নেশা এবং যৌনতার  নিষিদ্ধ দুনিয়ায় প্রবেশ করে। এতে করেও এইডসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় সমাজে।

 

এইডস প্রতিরোধের উপায়

এইডস এমন একটি রোগ, যার অধিকাংশ রোগীর বয়সই হচ্ছে ১৫-২৫ বৎসরের মধ্যে। অর্থাৎ আনুপাতিকহারে যুবকরাই এই রোগে বেশী আক্রান্ত। তাই যুবকদের সঠিকভাবে পরিচর্যা করাই হতে পারে এইডস প্রতিরোধে সঠিক সিদ্ধান্ত। আমরা বিভিন্ন উপায়ে এইডস প্রতিরোধ করতে পারি। সেগুলো হলো, পারিবারিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সর্বশেষ ধর্মীয়ভাবে।

 

পারিবারিক উপায়

 

পারিবারিক সুশিক্ষা: একটি পরিবার হলো যেকোনো মানুষের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। সকল মানুষ ভালো মন্দ সবকিছুর শিক্ষা প্রথমে পরিবারেই পেয়ে থাকে। তাই যে পরিবারে নীতি নৈতিকতা ভালো সেই পরিবারের সন্তানেরা কখনোই অনৈতিক পথে পা বাড়ায় না। এইডসে আক্রান্তদের অধিকাংশই হলো নেশাগ্রস্ত এবং অনৈতিক শারিরীক সম্পর্ক স্থাপনকারী। তাই আমাদের সকলেরই উচিত পারিবারিকভাবে সন্তানদের শাসন করা এবং তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করা। বিশেষকরে কিশোর কিশোরীদের মানসিক ও শারিরীক বিষয় গুলোর দিকে নজর দেওয়া। যাতে তারা কোন অবস্থাতেই নেশাগ্রস্ত কিংবা শারিরীক সম্পর্কের দিকে যেতে না পারে।

 

শারিরীক উপযুক্ততায় বিয়ে করানোএইডস প্রতিরোধে একটি কার্যকরী পদক্ষেপ হতে পারে, সন্তানদের শারিরীক উপযুক্ততায় বিয়ে করানো। আমাদের দেশে বিয়ের যোগ্যতাকে শারিরীক দিকে বিবেচনা না করে বরং অর্থনৈতিক ভিত্তিতেই বিবেচনা করা হয় বেশী। অর্থাৎ ছেলেরা যখন অর্থনৈতিক ভাবে উপযুক্ত হয় তখনই তাদের বিয়ের চিন্তা করা হয়। যা কখনোই উচিত নয়। যেসব সন্তানরা উপযুক্ত সময় হওয়ার পরও বিয়ে করতে পারে না, তারা যৌনপল্লীতে যৌনকর্মীর কাছে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে। আর এভাবেই অবাধ যাতায়াতে একজনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাস বাসা বাঁধে। তাই বিয়ের বিষয়ে আমাদের পরিবারগুলো যদি সচেতন হয়, তাহলে এইডসের প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

 

প্রবাসী পাত্রের সতর্কতা: যারা প্রবাসী পাত্রকে মেয়ে  বিয়ে দিতে চান, তাদের অবশ্যই পাত্র সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরী। কেননা অধিকাংশ এইডসের রোগীই বিদেশফেরত। তাই পাত্র সম্পর্কে খোঁজ খবর নেওয়া এবং যদি সম্ভব হয় এইচআইভি পরীক্ষা করাও জরুরী। কেননা পাত্র এইচআইভি পজেটিভ হলে তার স্ত্রী সন্তানেরও এইচআইভি পজেটিভ হবে।

 

সামাজিক বিভিন্ন উপায়

 

সৃজনশীল সংগঠন: আমাদের দেশে অতীতে প্রতিটি পাড়া মহল্লায় গ্রামে অসংখ্য সামাজিক ও ক্রীড়া সংগঠন ছিলো। এলাকার সন্তানরা এইসব সংগঠন করে তাদের কৈশোর এবং যৌবন পার করতো। সংগঠন করার কারণে এলাকায় একটা সামাজিক নৈতিকতা এবং আদর্শের শৃঙ্খলা ছিলো। ফলে ছোটরা বড়দের সম্মান করতো। ছোটদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড়রা বাঁধা দিয়ে তাদের শাসন করতো। যা বর্তমান সামাজিক অবস্থায় কল্পনাই করা যায় না। তাই বর্তমানেও যদি এই জাতীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা যায় তাহলেও উঠতি বয়সের ছেলেদের আমরা অনৈতিক পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবো। আর তরুণদের এই পথ থেকে ফেরানোর মাধ্যমে আমরা এইডসসহ অন্যান্য রোগ থেকেও প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো।

 

অনৈতিক কর্মকান্ডে বাঁধা: তৎকালীন সামাজিক শৃঙ্খলার ফলে এলাকার সন্তানরা সহজে চাইলেই কখ‌নো নেশা কিংবা অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হতো পারতো না। শুধু তাইনয় তৎকালীন সময়ে এলাকায় কখনোই কোনো যৌন কিংবা নেশার ব্যবসার জায়গায় দেওয়া হতো না। ফলে অনেকের খারাপ ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক চাপে তাদের ইচ্ছা পূরণ হতো না। যা এখন সমাজে হাত বাড়ালেই বাসাবাড়িতে সহজেই পাওয়া যায়। তাই সমাজে যদি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাঁধা প্রদান করা হয় তাহলেও এইডস প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

 

বিয়েকে সহজ করাআমাদের দেশে পুরুষরা দেরীতে বিয়ে করার মূল কারণ হলো, সামাজিকভাবে বিয়ের স্বীকৃতি না দেওয়া। অর্থাৎ আমাদের সমাজে চাকরি বাড়ি গাড়ি ইত্যাদি না করা পর্যন্ত কোনো ছেলেকে কোনো বাবাই তার মেয়েকে বিয়ে দেয় না। একইসাথে পরিবারে সকল বোনদের বিয়ে দেওয়ার পরই ছেলেকে বিয়ে কারানোর একটি বাজে নীতি সমাজে চলমান। যারফলে উপযুক্ত বয়স এবং উপযুক্ত আর্থিক অবস্থা হওয়ার পরও অধিকাংশ ছেলে বিয়ে করতে পারে না। এতে করে একটি নির্দিষ্ট অংশের ছেলে যৌবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে অনৈতিক যৌনাচারে। আর এভাবেই অবাধ যৌনাচারে এইডসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায় সমাজে। তাই এখনই উচিত সামাজিকভাবে বিয়ে করাটা সহজলভ্য করা। যাতে সমাজে অনৈতিক কাজের পথ রুদ্ধ হতে পারে।

 

ধর্মীয় উপায়

 

ধর্মীয় অনুশাসন: যেসব পরিবারে ধর্মীয় কঠোর অনুশাসন মেনে চলা হয়, সেইসব পরিবারের সন্তানরা কখনোই অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হতে পারে না। তাই প্রত্যেকেরই উচিত সন্তানদের ধর্মীয় অনুশাসনে রাখা। একইসাথে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলোতে এইডসের ভয়াবহতা নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করার মাধ্যমেও এইডস প্রতিরোধ করা সম্ভব।

 

যিনা ব্যবিচার থেকে দূরে থাকা: প্রতিটি ধর্মেই যিনা ব্যবিচার নিষিদ্ধ। ইসলামেও যিনা করা চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধ।  আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমরা জিনা’র কাছেও যেও না। কেননা এটি অত্যন্ত অশ্লীল ও মন্দ পথ।’ (সুরা ইসরা : আয়াত ৩২)

 

সুতরাং কোনো অবস্থাতেই যিনা ব্যবিচারের ধারে কাছেও যাওয়া যাবে না। ইসলামে এটা গর্হিত এবং কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অতএব নিজেকে মুসলিম দাবি করা কেউ কখনোই অবাধ যৌনাচারের লিপ্ত হতে পারে না। আর এভাবেই এইডস প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

 

শালীনতা বজায় রাখা: আমাদের দেশে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগার কারণে দিনদিন শালীনতার সভ্যতা উঠে যাচ্ছে বলেই চলে। আজ রাস্তা-ঘাটে, শপিংমল-অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে, নারী পুরুষের পোশাকের কোনো শালীনতা নেই। নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশার কারণে অশালীন পোশাক পুরুষদের যৌন উত্তেজনাকে বর্ধিত করে। যার পরবর্তিত পদক্ষেপ হয় যৌন পল্লীতে যাতায়াতের মাধ্যমে। আর এভাবেই অবিবাহিত কিশোর তরুণ যুবকেরা নিজেদের নিবৃত্ত করতে পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। যার অসাবধানতার শেষ পরিনতি হয় এইডসের মাধ্যমে। সুতরাং ঘরে বাইরে নারী পুরুষদের শালীন পোশাক পরিচ্ছেদ এইডস প্রতিরোধের একটি উপায় হতে পারে।

 

সমকামিতা বন্ধ করা: আজ বিশ্বে সমকামিতা একটি নিকৃষ্ট বিষয়। যদিও বিভিন্ন দেশ সমকামিতাকে স্বীকৃত দিয়েছে। যা একটি গর্হিত বিষয়। সমাজ স্বীকৃত না হওয়ার কারণে গোপনেই চলছে এইসব কুকর্ম। এই সমকামিতার ফলেও দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই আমাদের উচিত উপযুক্ত আইন প্রনয়ণের মাধ্যমে সমকামিতা রোধ করা।

 

বিয়ের ওয়াজ নসিহত করা: প্রতিটি আলেম ওলামা এবং দাঈীদের এটা পবিত্র দায়িত্ব যে, তারা ওয়াজ নসিহতে উপযুক্ত সময়ে ছেলেদের বিয়ে করার গুরুত্ব কি তা তুলে ধরা। যাতেকরে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে বিয়ে করা কত জরুরী তা বুঝতে পারে। আর উপযুক্ত সময়ে বিয়ে করলে সমাজ থেকে যাবতীয় অনৈতিক অনাচারের পথ রুদ্ধ হবে।

 

রাষ্ট্রীয় উপায়

 

অবাধ যৌনাচার বন্ধ করা: এইডসের মূল টার্গেটই হলো কিশোর তরুণ যুবকশ্রেণী। যাদের যৌন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সবচেয়ে কম। এই বয়সটাই হলো নতুন নতুন বিষয়কে আবিষ্কার করা। তাই এইসব কিশোর তরুণরা অবাধ যৌনতায় মেতে উঠে সহজেই। আর দেশে যৌনতা সহজলভ্য হওয়ার কারণে এইডসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায় নিমিষেই। একারণে যদি অবাধ যৌনাচার বন্ধ করা যায় তাহলে এইডস সংক্রমণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

 

অবাধ মাদকদ্রব্য পরিহার করা: আমাদের বর্তমান সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় কারণে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা চারিদিকে। এরফলে কিশোর তরুণ যুবকরা সহজেই নেশাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। তাই এখনই উচিত সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা রোধ করা।

 

পতিতাবৃত্তি বন্ধ পুনর্বাসন: যত্রতত্র গড়ে উঠা সকল পতিতালয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বন্ধ করে তাদের পুনর্বাসন করা জরুরী। যদি সহজলভ্য পতিতাবৃত্তি বন্ধ করা যায়, তাহলে এইডসের মতো ভয়ংঙ্কর রোগের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হবে।

 

সকল প্রকার পর্নসাইট বন্ধ করা:  আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বে পতিতাবৃত্তি ও যৌনতা বিভিন্ন এ্যাপস এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। কোমলমতি কিশোর তরুণদের যৌনতা থেকে দূরে রাখতে হলে অবশ্যই সকলপ্রকার পর্নগ্রাফিক সাইট এবং এ্যাপস সরকারি উদ্যোগে  বন্ধ করে দিতে হবে।

 

সার্বিক প্রচার প্রচারণা: সকলপ্রকার গনমাধ্যমে এইডসের কুফল তুলে ধরে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে। একইসাথে প্রতিটি এলাকার  গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি যেমন, মসজিদের ইমাম, চেয়ারম্যান, মেম্বার এবং সর্বজন পছন্দের ব্যক্তি দ্বারা ব্যাপক প্রচারণা চালানো। এইসব ক্ষেত্রে মন্দির, গির্জা ও প্যাগোডার ধর্মীয় শুরুদেরও  এ কাজে অন্তর্ভুক্ত করা।

 

শিক্ষার্থীদের সচেতন করা: সরকার পাঠ্যবইয়ে এইডসের বিষয়ে পাঠ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করে এইডস প্রতিরোধ করতে পারে। কিশোর ও তরুণ  শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে বেশী বেশী কর্মশালা দিয়ে তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তারা সচেতন হলেই সমাজ থেকে এইডসের সংক্রমণ হ্রাস পাবে।

 

ব্যক্তিগত সচেতনতা

 

রক্ত গ্রহণে সতর্কতা: যেকোনো জরুরী প্রয়োজনে রক্ত গ্রহণ বা প্রদানের সময় অবশ্যই রক্তে এইচআইভি আছে কিনা পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। কেননা কারো শরীরে  এইচআইভি আছে কিনা তা সহজেই বোঝা যায় না। প্রায় ক্ষেত্রে এইচআইভি পজেটিভ হওয়ার অনেক পরেই রোগী জানতে পারে তার এইডস হয়েছে। তাই সর্বাবস্থায় রক্ত প্রদান এবং গ্রহণের পূর্বে অবশ্যই পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত।

 

যৌন আসক্তি ব্যক্তির সতর্কতা: পৃথিবীতে অনেক পুরুষ রয়েছেন যাদের যৌন আসক্তিটা বেশী। এরা কোন অবস্থাতেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে এরা স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও যেখানে সেখানে  অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হয়। এইসব ব্যক্তির দ্বারাই এইডসের সংক্রমণ বেশী হয়। তাই এদের ব্যক্তিগতভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরী। যাতে কোনভাবেই তার দ্বারা  এই ভাইরাস  পরিবার এবং সমাজে বিস্তার লাভ করতে না পারে।

 

স্ত্রীদের সতর্কতা: যেসব স্বামীরা নিজ স্ত্রীতে সন্তুষ্ট নয়, তাদের উচিত স্বামীদের প্রতি নজর দেওয়া। বিশেষকরে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করে তাদের সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করা। কেননা কোনো স্বামী অবাধ যৌনাচারে লিপ্ত হলে, তার মাধ্যমেও স্ত্রী এবং অনাগত সন্তানও এইডসের অধিকারী হতে পারে। তাই এই ব্যাপারে স্ত্রীদের সতর্ক হওয়া উচিত।

 

নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির সতর্কতা: যারা বিভিন্ন কারণে নেশাগ্রস্ত হয়ে ঐ পথ থেকে ফিরে আসতে পারছেন না, তাদের উচিত নেশা করার সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা। যাতে একজনের ব্যবহৃত সূচ অন্যজনে ব্যবহার না করে। এবং নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা করা।

 

এইডসের চিকিৎসা কী

এইচআইভি রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে  ক্ষেত্রে প্রধান বাঁধা হল সামাজিক দৃষ্টিকটুতা। আমাদের সমাজে এইডস রোগীকে কখনোই ভালো চোখে দেখা হয় না। ফলে রোগী দ্রুতই মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন। তাই এই রোগের প্রথম চিকিৎসাই হলো রোগীকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা। সেইসাথে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

 

“ফিউশন ইনহিবিটর্স”- এইচআইভি  চিকিৎসায় খুবই কার্যকরী ওষুধ।  যা শরীরের সিডি৪ কোষগুলোতে এইচআইভি ভাইরাস প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। এইচআইভি অতি অভিযোজন সক্ষম হওয়ায় এটি সরাসরি দেহের টি-সেলগুলোকে সংক্রমিত করে এবং এসব সেলের প্রোটিন গ্রহণ করে দ্রুতগতিতে অল্প সময়ে বংশবিস্তার করে। ইসিডিফোর-এলজি ওষুধ কোষের অভ্যন্তরে থাকা প্রোটিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুসারে, বিভিন্ন ওষুধ এইডসের কাজে ব্যবহৃত হয়। যেমন : জিডোবোডিন, ল্যামিবোডিন, নেভিরাপিন, টেনোফোবিন ইত্যাদি। এছাড়াও  এইডসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত আরো কিছু অ্যান্টিবায়োটিক হলো,Alltera Alltera, Valten 300 Mg, Saquin Saquin 500 Mg, Ritocom, 50 Mg/200 Mg,Heptavir 10 Mg, Lamimat, Dinosin 100 Mg Tablet, LAMIVIR 100MG, Dinex Ec 400 Mg

 

এইসব ঔষধ ছাড়াও এআরভি ড্রাগসে আধুনিক অনেক ওষুধ রয়েছে, যার সাইড ইফেক্ট অনেক কম কিন্তু কার্যকারিতা অনেক বেশি। যা একজনের দেহের ভাইরাস অনেক কমিয়ে আনতে পারে। তবে কখনোই পুরোপুরি নির্মূল করতে পারে না। ট্রিটমেন্টটা এতো ভালো যে, নিয়মিত ওষুধ খেয়ে যেতে হবে এবং সেটা  আজীবন। যাতে করে ভাইরাল লোডটা কমিয়ে রাখা যায়। ফলে তার নিজের দেহেও কোনো ইমপ্যাক্ট ফেলবে না এবং সেইসাথে অন্যের দেহেও ছড়াবে না। এভাবে আক্রান্ত একজন ব্যক্তি একেবারে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।

 

বাংলাদেশে এইডসের সেবা

বাংলাদেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হয় ১৯৮৯ সালে। বাংলাদেশে সরকারিভাবেই এইডসের চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। বেসরকারি পর্যায়ে এখনো পুরোপুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এইডস শনাক্তের জন্য সারা দেশে ২৭টি কেন্দ্র রয়েছে। চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় ১১টি কেন্দ্র থেকে। বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী এইডস আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত ৮৪ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছে।

 

বাংলাদেশে সংক্রমিতদের মধ্যে রয়েছে নারী ও পুরুষ যৌনকর্মী, সমকামী, যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তি, প্রবাসী শ্রমিক, হাসপাতালে প্রসব সেবা নিতে আসা মা ও রোহিঙ্গা। আক্রান্তদের ৩৩ শতাংশ সাধারণ মানুষ। এইডসের চিকিৎসার নেওয়ার জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয় না। অধিকাংশ রোগীই বাড়িতে থেকে চিকিৎসা সেবা নেন। তবে তাদেরকে নির্ধারিত নিরাময় কেন্দ্রে যোগাযোগ রেখে চিকিৎসা নিতে হয়। বড়দের জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ আর শিশুদের জন্য সিরাপ দেওয়া হয়। তবে প্রায় ক্ষেত্রে এইডসের পাশাপাশি অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকে। যারজন্য অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সেই রোগের চিকিৎসা নিতে হয়।

 

বাংলাদেশের সরকার এইডস রোগের চিকিৎসায় যথেষ্ট আন্তরিক। তবে এখনো কিন্তু কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। রোগীরা নিয়মিত সরকারি ঔষধ পেলেও অনেক কিছুর ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষকরে অন্যান্য সেবা যেমন তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাউন্সেলিং এবং মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। অনেকে কিছুদিন পর সামাজিক কারণে কিংবা  অনীহাবশত  ওষুধ ছেড়ে দেন বা নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যান। যা  চিকিৎসার জন্য একটি বড় সমস্যা।

 

এছাড়াও। যারা আক্রান্ত হন তাদের অনেকে খুবই দরিদ্র। তাদের খাবার, কর্মসংস্থান, জীবনযাপনের ক্ষেত্রে পুনর্বাসনের প্রয়োজন হয়। যা কখনোই সম্ভব হয় না। একইসাথে এইচআইভি ছাড়াও যাদের অন্যান্য রোগ থাকে তাদের আলাদা চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না।

 

এইডস সম্পর্কিত  ভুল ধারণা

 

সাধারণ মেলামেশায় এইডস ছড়ায় না: অনেকের ধারণা যে, এইডস আক্রান্তদের সঙ্গে মেলামেশা করলেই বুঝি এ রোগ ছড়ায়। এটা ঠিক নয়। কেননা এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। একই বাতাসে নিশ্বাস নিলে, হাত মেলালে, জড়িয়ে ধরলে, চুমু খেলে, একই পাত্রে খাবার খেলে কিংবা পানি পান করলেও আক্রান্তের সম্ভাবনা থাকে না। শুধু তাইনয় আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র ব্যবহার করলে বা তার ব্যবহৃত টয়লেট ব্যবহার করলেও কারো এইডস হবেনা।

 

মশা এইডস ছড়ায় না: অনেকেই মনে করেন, মশার দ্বারাও এইডস ছড়াতে পারে। এটি একটি ভুল ধারণা। যদিও রক্তদ্বারা এই ভাইরাস ছড়ায় কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মশা বা রক্ত খায় এমন কিট দ্বারা কেউ আক্রান্ত হয় না। কেননা রক্ত মশা বা অন্যান্য কীটের শরীরে বেশিহক্ষণ বেঁচে থাকে না।

 

যৌনমিলন সংক্রান্ত ভুল: যৌন মিলনের পর গোসল করলে এইচআইভি ভাইরাস পরিষ্কার হয়, এই ধারণাও একেবারেই ভুল। একইসাথে কনডম ব্যবহার করলেই যে এইডস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে না, এটাও একটি ভুল ধারণা। কেননা  যৌন মিলনের সময় কনডম ছিদ্রও হতে পারে। কিংবা অসাবধানতাবশত  যেকোনো উপায়ে তা যোনিতে প্রবেশ করতে পারে। তাই সর্বাবস্থায় যৌনমিলন থেকে বিরত থাকতে হবে।

 

অল্প বয়সে মারা যাওয়া: এইচআইভিতে আক্রান্তরা অল্প বয়সে মারা যায়- এ ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তিও দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করছেন।

 

সন্তানের এইডস হওয়া: আমাদের ধারণা হচ্ছে কোনো আক্রান্ত মা সন্তান জন্ম দিলে তার শিশুরও এইডস হবে। এই ধারণা সবসময় সঠিক নয়।  আক্রান্ত মায়ের শরীরে এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সন্তান জন্মদানের সময় সে শিশু আক্রান্ত নাও হতে পারে।

 

লক্ষণ ছাড়া এইডস না হওয়া: এইডস রোগীদের অধিকাংশেরই লক্ষণ দেখা দেয় দেরীতে। ফলে অনেকেই এইচআইভি পজেটিভ হয়েও লক্ষণ না থাকার কারণে মনে করেন, যেহেতু কোনো লক্ষণ নেই,  তাই কোন লক্ষণ দেখা না দিলে এইচআইভি আক্রান্ত নই। এটা একটি ভুল ধারণা। এমনও হয়েছে আক্রান্ত ব্যক্তি লক্ষণ ছাড়াই দশ পনেরো বছর বেঁচে আছে।

 

স্বাভাবিক জীবনযাপনে বাঁধা: অনেকেই মনে করেন এইডস মরণব্যাধি এবং ছোঁয়াচে রোগ। এইডস ঘাতকব্যাধি হলেও ছোঁয়াচে নয়। তাই এইডস আক্রান্ত ব্যক্তির স্বাভাবিক  জীবনযাপনে কোনো বাঁধা নেই। আর দশজনের মতোই সে সাধারণ জীবনযাপন করতে পারবে।

 

এইডস আক্রান্তদের প্রতি করণীয়

এইডস যেহেতু মরণব্যাধি সেহেতু তাদের প্রতি সদয় হওয়াটা প্রতিটি মানুষেরই কর্তব্য। সকলেরই উচিত এইডস আক্রান্তদের সঙ্গে  সহানুভূতিপূর্ণ ও উত্তম আচরণ করা। কারণ এইডস কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তাই তাদের প্রতি সদয় হওয়া, সুস্থ্য জীবন-যাপনে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা উচিত।

 

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমরা এইডস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারলাম। আমরা বুঝতে পারলাম এইডস কী, কীভাবে এই রোগ হয়, এবং প্রতিরোধে আমাদের করণীয় কী। আসুন আমরা এইডস সম্পর্কে নিজে সচেতন হই এবং  সবাইকে সচেতন করি। যাতে আমরা আগামী প্রজন্মকে এইচআইভি মুক্ত একটি ধরণী উপহার দিতে পারি।

 

 

সাখাওয়াতুল আলম চৌধুরী

কলামিস্ট

 

 

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com