ব্রেকিং নিউজ
Home » দৈনিক সকালবেলা » অপরাধ ও দূর্নীতি » এমএলএম প্রতারণা থেমে নেই, টার্গেট যুবসমাজ
এমএলএম প্রতারণা থেমে নেই, টার্গেট যুবসমাজ

এমএলএম প্রতারণা থেমে নেই, টার্গেট যুবসমাজ

চট্টগ্রাম ব্যুরোঃ থেমে নেই এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) ব্যবসা। অ্যানালগ পদ্ধতি থেকে উঠে এখন চলছে ডিজিটাল ভার্সনে। সেই নব্বই দশকের জিজিএন থেকে হালের গ্রেট ওয়ান, স্পিক এশিয়া, ইউনিগেটওয়ে, গোল্ডেন ট্রি, নিউওয়ে পর্যন্ত- একটাই টার্গেট-টাকা হাতিয়ে নেয়া। ইনিয়ে বিনিয়ে টার্গেট করা মানুষকে বিভ্রান্ত করে অর্থ হাতিয়ে চম্পট দেয়াই হচ্ছে এমএলএম’র উদ্দেশ্য। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ডেসটিনি, ইউনি পে টু, আইসিএল, রেভনেক্স বিডির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এমএলএম-প্রতারকরা। বিভিন্ন কৌশলর তারা মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে শত শত কোটি টাকা। তবে এখন আর কোনো পণ্য বা বৃক্ষরোপন পরিকল্পনা বা বিক্রি নয়-রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, কখনোবা ট্যুর ও আবাসিক হোটেল সার্ভিসে বিনিয়োগের মাধ্যমে ৩ মাসে দ্বিগুণ অর্থ ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তারা। গাছের চারা বিক্রির স্থলে এখন অনেকে বিক্রি করছেন কাল্পনিক ট্যুর এবং আবাসিক হোটেল সার্ভিস। আবার অনেকেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের তার্গেট করছে। করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্টান বন্ধ থাকাতেই, অনলাইনে শিক্ষার্থীদের তার্গেট করে গেমস, বিভিন্ন কোর্স ও ভর্তির নামে বিভিন্ন সুযোগ দিয়ে ডিসকাউন্ট ও পারসেন্টিজ সুবিধার নামে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। বর্তমান খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে ভুয়া ওয়েবসাইটদারী মার্কেটিং কোম্পানির সংখ্যা। অনেকেই একটি নির্দিষ্ট অর্থ জমা রাখলে বিনিময়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট অর্থ দিচ্ছে। এভাবে লোভে পড়ে মানুষ সর্বহারা হয়ে পড়ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউটিকেশন অ্যান্ড রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর চোখে ধুলো দিয়ে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে  এই এমএলএম কোম্পানিগুলো। মালয়েশিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র কখনো বা যুক্তরাজ্য থেকে ডোমেইন, হোস্টিং ভাড়া নিয়ে চলছে অনলাইন এমএলএম। ভয়ংকর ‘মানি গেম’র মাধ্যমে গত চার বছরে গ্রাহকের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। বহু বেকার তরুণ-তরুণী, শিক্ষার্থী, গৃহবধূ ওয়েবসাইটভিত্তিক এ ব্যবসায় অর্থ লগ্নি করে সর্বস্ব খুইয়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুরনো এমএলএম প্রতারকরাই এখন ধরন এবং নাম পাল্টে প্রতারণা অব্যাহত রেখেছে। বছর দুই আগেও তারা সেগুনবাগিচা, রমনা পার্ক, বিজয়নগর হোটেল ৭১, চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ, মুরাদপুর সংলগ্ন স্থানে গোপনে সভা-সেমিনার করত। এখন বেরিয়ে এসেছেন তা প্রকাশ্যে। প্রসিদ্ধ এই এমএলএম প্রতারকরা প্রতিষ্ঠা করেছেন সমিতি। ‘Direct Selling Association of Bangladesh’ (DSAB) নামে এ সমিতি প্রতিষ্ঠা হয় গাজীপুরে গত বছর অক্টোবরে। তাদের নামে দেশের আনাচে কানাচে রীতিমতো সমিতি খুলে দোর্দন্ড প্রতাপে চালিয়ে যাচ্ছে এমএলএম প্রতারণা।

অনুসন্ধান মতে, কথিত সংগঠন ‘ডিস্যাব’র নেতৃত্বে রয়েছেন ‘এক্সিলেন্ট ওয়ার্ল্ড’ নামক এমএলএম কোম্পানির প্রধান নির্বাহী আনোয়ার এইচ রয়েল রানা। ‘ডিস্যাব’ সূত্র জানা যায়, উক্ত সমিতিভুক্ত প্রতিটি সদস্যেরই রয়েছে এক বা একাধিক এমএলএম মালিকানা প্রতিষ্ঠান। ওয়েবসাইট খুলে তারা নির্বিঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়েবসাইটের রয়েছে গোপন এডমিন নাম ও পাসওয়ার্ড। শুধুমাত্র কথিত কোম্পানিতে অন্তর্ভুক্ত হলেই ঐ পাসওয়ার্ড দেয়া হয়। একজন সাধারণ ব্যক্তি ইচ্ছে করলে তাদের নির্দেশনা অনলাইনে জানার সুযোগ নেই। সব কাজ হয় অনলাইনে গোপনীয়তায়।

‘E-Commerce Limited’ নামক ওয়েবসাইট খুলে এমএলএম কোম্পানি পরিচালনা করছেন এম আরিফ হাসান। এছাড়া অ্যাসোসিয়েশনভুক্ত আব্দুল মালেক স্বাধীনের মালিকানায় রয়েছে ‘ Walmark International Ltd’ নামক এমএলএম নেটওয়ার্ক। ‘Winlife Global Limited’ পরিচালনা করছেন মো. মনিরুল ইসলাম কাইয়ুম। ‘Daily Bazar Ltd’ নামের এমএলএম চালাচ্ছেন আমিনুল ইসলাম হৃদয়। ‘Power life BD’-এর কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রেজাউল লতিফ রিপন, ‘Memory Global Ltd’ চালাচ্ছেন আব্দুল মোমিন মিয়াজী ও দেলোয়ার হোসেন। ‘World Mission -21’ চালাচ্ছেন জাকির হোসেন। ‘Apon Bazar Int. Ltd’ চালাচ্ছেন মেহেদী হাসান, ‘OM Bazar Ltd’-এর মালিক লুৎফুর রহমান রুবেল, ‘Mzith World Ltd.’-এর মালিক আনিসুর রহমান, ‘Tasor Care Ltd’-এর কান্ট্রি ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন সোলায়মান হোসেন। ‘Win 24 Ltd’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুমন আহমেদ, ‘Win Touch Int. Ltd’-এর প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ইমরান হোসাইন আকাশ। মালয়েশিয়াভিত্তিক ‘Infinity’ পরিচালিত হচ্ছে গুলশান-১ এ জব্বার টাওয়ার থেকে। ‘AB Nurtric Int.’ ঢাকার বায়তুল ভিউ টাওয়ার এবং চট্টগ্রাম থেকে পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানটি উচ্চ মূল্যে এক ধরনের বায়োস্প্রে বিক্রি করছে। মগবাজারস্থ রাইন রাজ্জাক প্লাজায় ‘Modern MXM Ltd’ চালাচ্ছেন আলমগীর মতি। পল্টনভিত্তিক অনেকগুলো এমএলএম সক্রিয় থাকলেও ‘Mission – 10’ নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বড়। ‘Wall Mission’ পরিচালিত হচ্ছে বিজয়নগর স্কাইলার্ক সেন্টার থেকে। রাজধানীর মোতালেব প্লাজাসহ হাতিরপুলেই রয়েছে ৩০টির মতো এমএলএম কোম্পানির ব্যবসা কার্যালয়। পুরানা পল্টন এলাকার একটি গলিতেই রয়েছে ৪২টি এমএলএম কোম্পানির প্রধান অফিস। প্রতিটি জেলা শহরে তাদের পাঁচ-সাতটি করে সাব-অফিস রয়েছে এবং সমাজের উঁচুস্তরের মানুষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করে  বলে জানা গেছে। চটকদার সাইনবোর্ড, আইডি, অফিস সর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলেই প্রতারিত হয় মানুষ। বহু মানুষ প্রতারিত হলেও প্রশাসন এ বিষয়ে নীরবতা পালন করছে। কখনও বা সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। উত্তরাভিত্তিক এমএলএম কোম্পানি ‘Bright Future’ মানুষকে স্বল্প মূল্যে প্লট দেয়ার প্রলোভনে ৬ বছরে হাতিয়ে নিয়েছে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্যোক্তা সোহেল রানা নাম পাল্টিয়ে, একেক সময় একেক নামে এসে, একের পর এক গড়ে তুলেছেন এমএলএম কোম্পানি। তার প্রধান সহযোগী আলাউদ্দিন আহমেদও এমএলএম প্রতারণায় সুবিখ্যাত। সোহেল-আলাউদ্দিন এমএলএম চক্রটি সুন্দরী নারীদেরকে কাজে লাগিয়ে সারাদেশে বিস্তার করেছে প্রতারণার জাল। একাধিক মন্ত্রী, নায়িকা, অভিনেতা, গায়িকার নাম ভাঙিয়ে তারা নির্বিঘ্নে  চালাচ্ছেন এমএলএম প্রতারণা।

এদিকে সহজ সরল মানুষ এমএলএম দ্বারা প্রতারিত হলেও কোনো দফতর থেকেই এর প্রতিকার পাচ্ছেন না। কথিত এসব ব্যবসায় কোনো ধরনের ডিড-ডকুমেন্ট না থাকায় প্রতারিতরা আইনের আশ্রয় নিতেও পারেন না। অনেক গৃহবধূ স্বামী কিংবা পরিবারের অজ্ঞাতে অর্থ বিনিয়োগ করে প্রতারিত হচ্ছেন। তারা প্রতারণার কথা কাউকে জানাতেও পারেন না। এ নিয়ে পরিবারে শুরু হয় গৃহ বিবাদ ও অশান্তি। এই এমএলএমের কারনে সংসারও ভাঙছে অনেক গৃহবধূর।

অব্যাহত এমএলএম প্রতারণা বিষয়ে ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’-এর প্রেসিডেন্ট অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জানান, এমএলএম দ্বারা প্রতারিত হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে মানুষের অসচেতনতা ও লোভ। এসব প্রতারকদের টার্গেটই থাকে সহজ-সরল মানুষ। তারা প্রলোভনে পড়ে অর্থলগ্নি করে। পরে নিজেরায় প্রতারিত হয়। তিনি বলেন, এমএলএম রোধে কার্যকর আইন হওয়া খুবই জরুরি।

Attachments area

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*