ব্রেকিং নিউজ
Home » দৈনিক সকালবেলা » অপরাধ ও দূর্নীতি » ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওয়াহিদা
ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওয়াহিদা
--সংগৃহীত ছবি

ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওয়াহিদা

অনলাইন ডেস্কঃ

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার নেপথ্য কারণের একাধিক বিষয় সামনে চলে এসেছে। ক্ষমতাসীনদের স্থানীয় রাজনীতিতে বিবদমান একাধিক পক্ষের চক্ষুশূল ছিলেন তিনি। স্থানীয় সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, যুবলীগ নেতাসহ অনেকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। এঁদেরই কোনো পক্ষ ওয়াহিদার ওপর হামলার নেপথ্যে থাকতে পারে বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।ক্ষমতাসীনদের অপকর্মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওয়াহিদা।

ঘোড়াঘাট আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, কোন পক্ষের সঙ্গে কী ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তা সঠিকভাবে বলতে পারবেন ইউএনও ওয়াহিদা। তিনি একটু সুস্থ হলে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসবে। তার আগে স্থানীয় বিবদমান গ্রুপগুলো এ ঘটনার দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর হামলার ঘটনায় সব পক্ষকে সন্দেহের চোখে রেখে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ প্রশাসন।

এর আগেও দিনাজপুর-৬ আসনে এক ইউএনওর ওপর হামলা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ১ অক্টোবর দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে বেধড়ক পেটানো হয়। নবাবগঞ্জের ৩৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নৈশপ্রহরী নিয়োগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই ঘটনা ঘটান। হামলাকারীরা সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের অনুসারী বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। এবার ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় স্থানীয় লোকজন পুরনো সেই হামলার ছায়া দেখছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দিনাজপুরে কাজ করেছেন প্রশাসন ক্যাডারের এমন একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘দিনাজপুর-৬ আসনের সব উপজেলা কর্মকর্তাকে স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনৈতিক নানা চাপে থাকতে হয়। মাদক ও সন্ত্রাসপ্রবণ এই এলাকাটিতে পাতি নেতারাও ইউএনওদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।’

একটি সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওয়াহিদা খানমের সার্বিক খোঁজ নিতে যান প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা। তিনি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পৌঁছে দেন। এই সময় ওই কর্মকর্তা ওয়াহিদার পরিবারের সদস্যদের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চান। পরিবারের সদস্যরা ওয়াহিদার ওপর কারা হামলা করেছে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি। তবে দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নানা অনৈতিক চাপে রাখেন বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওই কর্মকর্তাকে জানানো হয়।

প্রশাসন ক্যাডারদের একটি সূত্র জানায়, গত শুক্রবার রাতে প্রশাসন ক্যাডার সদস্যদের একটি ভার্চুয়াল মিটিংয়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় কর্মরত একাধিক ইউএনও কাজ করতে গিয়ে সংসদ সদস্যদের অনৈতিক চাপ মোকাবেলার বিষয়টি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে বলে জানান। 

দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক বলেন, ‘যুবলীগের জাহাঙ্গীরের ছত্রচ্ছায়ায় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলা হচ্ছে। তাঁর অপকর্মের বিষয়ে যখনই আমি জানতে পারি, তখনই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে থানা পুলিশকে বলেছিলাম। এরপর থেকে আমার রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে।’

এর আগেও একজন ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনা প্রসঙ্গে শিবলী সাদিক বলেন, ‘নবাবগঞ্জের যে ইউএনওর ওপর হামলার কথা বলা হয়, তা ছিল অতিরঞ্জিত। প্রকৃতপক্ষে ওই ইউএনওর কার্যালয় ভাঙচুর হলেও তাঁকে মারধরের ঘটনা ঘটেনি।’

নিজের নির্বাচনী এলাকার অধীন চারটি উপজেলার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চাপে রাখার অভিযোগ প্রসঙ্গে শিবলী সাদিক বলেন, ‘এ অভিযোগ একদমই সত্য নয়। বরং আমার এলাকায় পোস্টিং পেতে ইউএনও, ওসিরা তদবির করে।’

স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি অংশের মতে, ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনায় ঘোড়াঘাট উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাফে খোন্দকার শাহেনশাহ সম্পৃক্ত থাকতে পারেন। তাঁর একাধিক অবৈধ কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা।

দিনাজপুর জেলার বিরামপুর, হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ ও ঘোড়াঘাট এই চারটি উপজেলা নিয়ে দিনাজপুর-৬ আসন। সীমান্তঘেঁষা এই চারটি উপজেলা মাদক কারবারি ও চোরাকারবারিদের নিরাপদ রুট। হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাটকে বলা হয় মাদকের রাজধানী। থানাগুলো অলিখিতভাবে ডাক নিয়ে থাকে চোরাকারবারিরা। এই চোরাকারবারিরা রাজনীতিতেও প্রভাবশালী। তারা রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেপরোয়া হয়ে নানা অপকর্ম করে থাকে।

জানা গেছে, ঘোড়াঘাট উপজেলা যুবলীগের সদ্য বহিস্কৃত আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও ৩ নম্বর শিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি মাসুদ রানা, যুবলীগ সদস্য আসাদুল ইসলাম—এই তিনজনই রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হওয়া ক্যাডার। এঁদের বিরুদ্ধে ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলার মূল অভিযোগ করা হচ্ছে।

দিনাজপুর শহর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে ঘোড়াঘাট উপজেলা। এ উপজেলায় কোনো সরকারি বালুমহাল নেই। দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ঘাট তৈরি করে প্রায় ১০টি জায়গা থেকে লোহার পাইপ বসিয়ে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। শুরু হয়েছে গোবিন্দগঞ্জ-দিনাজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রশস্তকরণ কাজ। এতে বালুর চাহিদা বেড়ে যায়। আর সেই চাহিদাকে সামনে রেখে বালু উত্তোলনে বেপরোয়া হয়ে ওঠে জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ রানা ও আসাদুল ইসলাম। তবে বালুমহালের টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের বনিবনা হচ্ছিল না। এতে জাহাঙ্গীর আলমকে বাদ দিয়ে ৩ নম্বর শিংড়া ইউনিয়নের যুবলীগের সভাপতি মাসুদ রানাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানম ড্রেজার মেশিন পুড়িয়ে দেওয়া ছাড়াও অবৈধ বালুমহাল বন্ধ করে দেন। অবৈধ এই বালুর টাকার ভাগ পেতেন স্থানীয় প্রভাবশালী সব পক্ষ। সে কারণেও ইউএনওর ওপর হামলা হতে পারে।

গত ১৪ মে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা সায়েদ আলীর জামাতা আবিদুর রহমান আওয়ামী যুবলীগ দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদকের কাছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগটি ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও আসে। অভিযোগে বলা হয়, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক জাহাঙ্গীর আলম ও মাসুদ রানা দুই মাস ধরে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। বিভিন্ন সময় দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়। বাকি টাকা দিতে বিলম্ব হলে কলোনিপাড়া এলাকায় এক একর জমি দখল করে নেন তাঁরা। পরে ইউএনও ওয়াহিদা খানম ওই জমি উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ কারণে হামলা হয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় বেপরোয়া ছিলেন। গত ১২ মে বিকেলে ইফতারি বিতরণের সময় ঘোড়াঘাট উপজেলা চত্বরে পৌরসভার মেয়র বিএনপি নেতা আবদুস ছাত্তার মিলনের ওপর হামলা চালান তিনি। সে দিন জাহাঙ্গীর আলমসহ চার যুবলীগ নেতাকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু তাঁরা ছাড়া পেয়ে যান। একই মাসে সংসদ সদস্য শিবলী সাদিকের ওপরে হামলার চেষ্টা চালান যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম। হামলার পরিকল্পনার কথা জানাজানি হয়ে গেলে জাহাঙ্গীর আলমকে আটক করে ঘোড়াঘাট থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। সেদিন এমপি শিবলী সাদিক থানায় এসে জাহাঙ্গীর আলমকে চড়-থাপ্পড় মেরে ছেড়ে দেন। এরপর জয়পুরহাটের হিলিতে মাদকসহ আটক হন জাহাঙ্গীর আলম। মাদকসহ জাহাঙ্গীরের একটি ভিডিও ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এর পরও ছাড়া পেয়ে যান তিনি।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দিনাজপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বদিউজ্জামান বাদল বলেন, ‘ইউএনওর ওপর হামলার ঘটনা নিছক কোনো ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর হামলার শামিল। এই হামলাগুলো ঘটছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায়। আর রাজনৈতিক কারণেই তাঁরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছেন। সে কারণে দিনাজপুরে বারবার ইউএনওদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে।’

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*