জঙ্গি হামলার আশঙ্কার দুই দিন পরই বিস্ফোরণে কাঁপল থানা

0
5

অনলাইন ডেস্কঃ

ঈদুল আজহা সামনে রেখে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করে দেশের বিমানবন্দর, উপাসনালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার জন্য পুলিশ তার সব ইউনিটকে নির্দেশনা দিয়েছিল। এর দুই দিন পর গতকাল বুধবার সকালে রাজধানীর মিরপুরে পল্লবী থানায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। জব্দ করা একটি ওজন মাপার যন্ত্রের ভেতরে রাখা বোমার বিস্ফোরণে চার পুলিশ সদস্যসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।

জঙ্গি তৎপরতা নজরদারির প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ দাবি করেছে যে, এই হামলার দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

তবে এই ঘটনার সঙ্গে জঙ্গিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট এই ঘটনায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) মোহা. শফিকুল ইসলাম।

বিস্ফোরণে আহতরা হলেন পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এমরানুল ইসলাম, উপপরিদর্শক (এসআই) সজীব খান ও রুমি বেভরেজ হায়দার, শিক্ষানবিশ সহকারী উপপরিদর্শক (পিএসআই) অঙ্কুর কুমার ও রিয়াজুল ইসলাম নামের অন্য এক ব্যক্তি।  তাঁদের মধ্যে তিনজনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি ব্লকের আবাসিক সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন বলেন, পাঁচজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে এমরানুল ইসলাম ও সজিব খানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রিয়াজুল, অঙ্কুর কুমার ও রুমিকে ভর্তি করা হয়েছে। রুমির বাঁ হাত স্প্লিন্টারের আঘাতে জখম হয়েছে। এমরানুলের পায়ে স্প্লিন্টারের আঘাত লেগেছে। রিয়াজুল ইসলামের বাঁ হাতের কবজি বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত হওয়ায় অস্ত্রোপচার করে তা কেটে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর ডান হাতের একটি আঙুল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেটিও রাখা যায়নি। তাঁর পেটে স্প্লিন্টারের বড় ধরনের আঘাত রয়েছে। অঙ্কুর হাত ও পেটে আঘাত পেয়েছেন।

অঙ্কুর কুমারের চোখে আঘাত লেগেছে। বিস্ফোরণের শব্দে তাঁর কানেও সমস্যা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিকেলে তাঁকে জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়। এরপর রাতে সেখান থেকে ফের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

পল্লবী থানার ওসি নজরুল ইসলাম বলেন, গত মঙ্গলবার রাতে পল্লবীর কালশী কবরস্থানে অভিযান চালিয়ে তিন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, চারটি গুলি, তিনটি ককটেল ও একটি ডিজিটাল ওয়েট মেশিনের মতো ডিভাইস উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তারা পুলিশকে জানায়, ওই ওজন মাপার যন্ত্রে বোমা রয়েছে। গতকাল সকালে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলকে খবর দেওয়া হয়। তারা এসে পরিদর্শকের (তদন্ত) কক্ষে ওজন মাপার যন্ত্রটি পরীক্ষা করে। পরে আরেকটি বিশেষজ্ঞদলকে ডাকা হয়, তারা পৌঁছানোর আগেই সকাল ৭টার দিকে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর আধাঘণ্টা পর আরেকটি বিস্ফোরণ হয়।

ওই ওজন মাপার যন্ত্রের ভেতর একটি তাজা বোমা পাওয়া গেছে বলে ওসি জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আধাঘণ্টার মধ্যে পর পর দুটি বিস্ফোরণের ঘটনায় পুরো থানা কেঁপে ওঠে। আশপাশে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়ায়। কয়েক ঘণ্টা পল্লবী থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল। বিশেষ করে ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা নেওয়া বন্ধ ছিল। থানায় প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করা হয়। গণমাধ্যমকর্মীদের থানার ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। যে কক্ষে বিস্ফোরণ ঘটেছে এর দুটি জানালার মধ্যে একটি ভেঙে নিচে রাস্তায় পড়ে গেছে। অন্যটি ওপরে ঝুলে আছে। কক্ষের ভেতরে ও বাইরে বিস্ফোরণের আলামত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক পুলিশ সদস্যে জানায়, সাধারণ ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র মনে করে পরিদর্শক এমরানুল তাঁর টেবিলের ওপর সেটি রেখেছিলেন। এ ছাড়া সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা আরো তিনটি ককটেল থানার ভেতরে অন্যত্র ছিল। ওজন মাপা যন্ত্রের ভেতরে যে বোমা ছিল এটা তাঁরা বুঝতে পারেননি।

সাধারণ কোনো অপরাধীর এ ধরনের বোমা তৈরি করার কথা নয়। এসব বোমা জঙ্গি সদস্যরা তৈরি করে থাকে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করলে আসল রহস্য বের হয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের উপকমিশনার আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, ওই যন্ত্রে দুটি বিস্ফোরকের একটি বোমা নিষ্ক্রিয়কারী ইউনিট আসার আগেই বিস্ফোরিত হয়েছে। অন্যটি পরে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। তবে আইইডির (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) আদলে তৈরি হাতবোমাগুলো খুবই সাধারণ মানের। সন্ত্রাসীরা এসব কেন, কী উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিল তা জানার চেষ্টা চলছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) কৃষ্ণপদ রায় দুপুরে পল্লবী থানার সামনে ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, যাদের আমরা গ্রেপ্তার করেছি তারা কোনো জঙ্গি গ্রুপের সদস্য নয়। তাদের সঙ্গে ওয়েট মেশিনসদৃশ বস্তু যা ছিল সেটার ভেতরেই এই এক্সপ্লোসিভগুলো ছিল। পল্লবী থানার পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার রাতে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলো শহীদুল ইসলাম, মোশাররফ হোসেন ও রফিকুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে তাদের ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগে (ডিবি) নেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে শহিদুল ইসলামকে গত সোমবার একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন তার বড় ভাই রফিকুল ইসলাম। গত রাতে তিনি দাবি করেন, দুই দিন আগে অর্থাৎ গত সোমবার বিকেলে পল্লবী এলাকার বাসার কাছে আক্কাস আলীর চা-বিস্কুটের দোকান থেকে শহিদুলকে তুলে নিয়ে যায় মাইক্রোবাসে আসা এক দল লোক। ওই রাতেই পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন তিনি। ঘটনাটি র‌্যাবকেও জানিয়েছিলেন বলে তিনি দাবি করেন।

সংশ্লিষ্ট ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার তিনজন শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত বাহিনীর সহযোগী বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের কাছে তথ্য ছিল, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তারা বোমা ও অস্ত্র মজুদ করেছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। ওই রাজনৈতিক নেতা এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ছেলে।

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ