Friday , 15 May 2026
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে হিমশিম সরকার
--সংগৃহীত ছবি

জ্বালানি আমদানির অর্থ জোগাতে হিমশিম সরকার

অনলাইন ডেস্ক:

এক লাখ টন ক্রুড অয়েল ও ৬৩ হাজার টন এলপিজিবোঝাই দুটি জাহাজ ৪২ দিন ধরে আটকে আছে হরমুজ প্রণালিতে। যুদ্ধবিরতির ফাঁকে এ দুটি জাহাজ দেশে আসার সুযোগ তৈরি হলেও জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা না থাকায় সেগুলোর একটিও আসতে পারেনি। আসতে পারছে না চলতি মাসে বুকিং থাকা ৯ জাহাজ এলএনজি। সোমবার (১৩ এপ্রিল) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপিসির নির্ধারিত সূচিতে থাকা ১৬টি জাহাজের অর্ধেকও আসবে না। আগামী মে মাসে আসার কথা পাঁচ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) বুকিং বাতিল করেছে। এভাবে একের পর এক জাহাজের পূর্বনির্ধারিত বুকিং বাতিল হচ্ছে। বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে একের পর এক জ্বালানি কিনছে সরকার।

এতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সংকট আরো তীব্র হবে আগামী দিনগুলোতে। স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনতে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান করতে বিপাকে পড়েছে সরকার।বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন) মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে বাধা পাওয়ায় আমাদের এলপিজি ও এলএনজিবোঝাই দুটি জাহাজ দেশে আসতে পারছে না। নির্ধারিত সূচির আরো বেশ কয়েকটি জাহাজ বুকিং বাতিল করেছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি এনে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি আমরা।

ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা কম। এগুলো চলতি মাসের চাহিদার চেয়ে বেশি আছে।’তিনি জানান, স্পট ও জিটুজি পদ্ধতিতে পাঁচ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেল কেনার অনুমতি এরই মধ্যে দিয়েছে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। এগুলো এলে সংকট কিছুটা কমবে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেন, আগামী মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা নিশ্চিত আছে। সোমবার আরো স্পট মার্কেট থেকে দুটি কার্গো কেনা চূড়ান্ত হবে। এ দুটি হলে ২৩ মে পর্যন্ত নিশ্চিত থাকা যাবে। এ ছাড়া ১৫ মে পূর্বনির্ধারিত একটি কার্গো আসার কথা রয়েছে অন্য উৎস থেকে। তিনি বলেন, বিশ্ববাজারেও দাম বেশি। ডলারের দামও বেড়েছে। এ কারণে খরচ বেশি পড়ছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ঝুঁকি কতটা গভীর। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। স্বল্পমেয়াদে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি ও তেল কিনে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে এতে ব্যয় বাড়বে।

মার্চের ঘাটতির প্রভাব এপ্রিলে

তথ্য মতে, মার্চ মাসে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে মোট ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল বিপিসির। কিন্তু পুরো মাসে এসেছে ১০টি জাহাজ। যেগুলোতে তেল ছিল মাত্র আড়াই লাখ টন। বুকিং থাকলেও আসেনি দেড় লাখ টন জ্বালানি তেলের বাকি ছয়টি জাহাজ। অভিন্ন চিত্র আছে এলএনজি নিয়েও। গত মাসে ৯টি এলপিজিবোঝাই জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে মাত্র পাঁচটি। বুকিং থাকলেও আসেনি প্রায় তিন লাখ টনের চারটি এলপিজির জাহাজ। একইভাবে সূচি নির্ধারিত থাকার পরও ক্রুড অয়েলের দুটি জাহাজের একটিও আসেনি। এ জন্য কাঁচামাল সংকটে বন্ধ হওয়ার পথে দেশের একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি (ইআরএল)। আর দু-এক দিন চালানোর মতো ক্রুড অয়েল আছে তাদের হাতে।

ইস্টার্ন রিফাইনারির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, যুদ্ধের কারণে হরমুজে আটকে থাকা এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবোঝাই ‘এমটি নরডিক পলুকস’ নামের জাহাজটি আসতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে কিছু অপরিশোধিত তেল আনার প্রচেষ্টা চলছে। কিন্তু এই তেল আসার দিনক্ষণও চূড়ান্ত হয়নি এখনো। তাই উৎপাদন কমিয়ে ইআরএল চালু রাখা হয়েছে।

তিনি জানান, আগামী ২০ এপ্রিল সৌদি আরবের ইয়ানবু কমার্শিয়াল পোর্ট থেকে এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে আরেকটি জাহাজ আনার চেষ্টা চলছে।

আগামী মাসে তীব্র হবে সংকট

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর গত ৪২ দিনে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে একটি জাহাজও আসেনি দেশে। এলএনজি, এলপিজি, তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি নিয়ে গত মাসে ৩৮টি জাহাজ দেশে এসেছে। বুকিং থাকার পরও মার্চ মাসে জ্বালানি নিয়ে ২৬টি জাহাজের মধ্যে এসেছে মাত্র ১৫টি। এপ্রিল মাসে বেশির ভাগ জাহাজই আসছে বিকল্প উৎস থেকে। বেশি দাম দিয়ে এগুলো কেনা হয়েছে স্পট মার্কেট থেকে। এপ্রিলে বন্দোবস্ত হলেও মে মাসের জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে সরকার। কারণ এ সময় গরম বেশি পড়বে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। ফলে বাড়বে জ্বালানির চাহিদা। তাই যুদ্ধ না থামলে মে মাসে তীব্র হবে সংকট। মে মাসের নির্ধারিত পাঁচ জাহাজ এলএনজি পাঠাচ্ছে না কাতার ও ওমান। মূল সংকট অর্থচাহিদা পূরণে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। কিন্তু মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ায় মার্চ ও এপ্রিলে কার্গো এলএনজি স্পট মার্কেট থেকে কিনতে সরকারের অতিরিক্ত খরচ হয়েছে চার হাজার কোটি টাকা।

তথ্য মতে, জ্বালানি তেলও প্রতিদিন ২০০ কোটি টাকার মতো ভর্তুকি লাগছে। ফলে চলতি বছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা ভর্তুকির ৪২ হাজার কোটি টাকা কাজ হচ্ছে না। আগামী জুন পর্যন্ত আরো ৩৯ হাজার কোটি টাকা বাড়তি লাগবে। এই টাকার সংস্থানের জন্য দাতা সংস্থার দ্বারস্থ হয়েছে সরকার। তবে এখনো সাড়া মেলেনি।

এদিকে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা ডলারের ওপর চাপ বাড়ছে। মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত এলএনজি আমদানি করতে শুধু পেট্রোবাংলার চাহিদা ছিল ১৪০ কোটি ডলারের। এটি আরো বেড়েছে। বিপিসির লেনদেনই হয় ডলারে। ফলে আগামী দিনে সংকট তীব্র হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

এলএনজি আমদানির স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠান ইউনি গ্লোবাল বিজনেস লিমিটেডের সিনিয়র ডিজিএম মো. নুরুল আলম বলেন, প্রতি মাসে গড়ে ৯ থেকে ১০টি জাহাজ এলএনজি আমদানি করা হয় দেশে। মার্চে এসেছে অর্ধেক। এপ্রিলে সেটিও আসেনি। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করায় মার্চে কিছু জাহাজ নোঙর করতে পেরেছে। এখন যেসব জাহাজ আসছে, সেগুলো স্পট মার্কেটে কেনা কিংবা বিকল্প দেশ থেকে আনা।

ভোগান্তি কমেনি

রাজধানীর আসাদগেট, কল্যাণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে তীব্র জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গাড়ির দীর্ঘ সারি থাকলেও অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না।

ফার্নেস অয়েলের দাম বেড়েছে

ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়িয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি লিটার ৭০ টাকা ১০ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯৪ টাকা ৬৯ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। নতুন মূল্য গতকাল মধ্যরাত থেকে কার্যকর হয়েছে।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply