প্রথমে দিল্লিতে দুই দিনের দ্বিপক্ষীয় সফর, যেখানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তার আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তারপর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে একই বিমানে চেপে মরিশাসে যাচ্ছেন একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে যোগ দিতে।
৯ এপ্রিল সকাল আটটা থেকে এয়ার মরিশাসের ওই বাণিজ্যিক বিমানে একটানা সাত-আট ঘণ্টার ওই দীর্ঘ সফরেও দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে একান্তে কথাবার্তা বলার বিস্তর সুযোগ থাকবে যথারীতি।
বিশেষ করে মাত্র দু-তিন মাস আগেও যে ঢাকার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্কে রীতিমতো অস্বস্তি আর শীতলতা ছিল, সে দেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মি জয়শঙ্করের একসঙ্গে দীর্ঘ বিমানযাত্রার সিদ্ধান্তই বলে দেয়, দুই দেশই তাদের সম্পর্ক ‘রিক্যালিব্রেট’ করতে চাইছে।
ওই সম্মেলন যৌথভাবে আয়োজন করেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আর দিল্লির শীর্ষস্থানীয় থিংকট্যাংক ‘ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন’ আর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর নিজেও সেখানে যোগ দিচ্ছেন।
এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম কোনো হাই-প্রোফাইল দ্বিপক্ষীয় সফরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৭ এপ্রিল (মঙ্গলবার) দিল্লিতে যাচ্ছেন।
ড. রহমানের এই সফরটিকে ভারতও অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো বৈঠক হবে কি না তা পরিষ্কার নয়।
বিবিসি জানতে পেরেছে, ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গেও ড. রহমানের আলাদা একটি বৈঠক আয়োজনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, তবে সেটি শেষ পর্যন্ত হবে কি না তা নিশ্চিত নয়।
ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফর নিয়ে এখনো কোনো বিবৃতি আসেনি, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো আভাস দিচ্ছে, গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করা, বিভিন্ন কানেক্টিভিটি প্রকল্পর অগ্রগতি, ভারত থেকে জ্বালানি সরবরাহ এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সুবিধাগুলো পুনর্বহাল করার ব্যাপারে এই সফরে কথাবার্তা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বস্তুত বাংলাদেশে শেষবারের মতো বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল প্রায় কুড়ি বছর আগে এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সেই সরকারে গুরুত্বপূর্ণ শরিক ছিল জামায়াতে ইসলামী। তবে সেই সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক ছিল তা কিছুতেই বলা যাবে না।
গত দুই দশকে গঙ্গা ও পদ্মা নিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে, ভারতের ব্যাপারে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থানেও অনেক ওঠাপড়া দেখা গেছে। তারেক রহমানের সরকারে জামায়াতও শরিক নয়, বরং তারা এখন প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায়।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নতুন একটি বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের ঠিক কী ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেই প্রশ্নের নিরিখেই খলিলুর রহমানের এই সফর আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।
বাংলাদেশের দিক থেকে এই সফরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রিয়াজ হামিদুল্লাহও সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় গিয়েছিলেন–তিনিও রবিবার (৫ এপ্রিল) দিল্লি ফিরে এসেছেন।
‘সম্পর্কের গতিপথে কোর্স কারেকশন’
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিজেপির প্রাক্তন এমপি এম জে আকবর নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশ সংক্রান্ত অ্যাফেয়ার্স দেখাশোনা করতেন, এখনো অলিখিতভাবে সরকারের তরফে তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ রাখেন।
মি আকবর বিশ্বাস করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা যে ‘কোর্স কারেকশন’ বা গতিপথ পাল্টানোর দরকার, সেটা দুই পক্ষই উপলব্ধি করছে এবং খলিলুর রহমানের এই দিল্লি সফর সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “আমি বলব দুই পক্ষের মধ্যেই এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে যে মাঝের বেশ কিছুদিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিরাট ‘ডিসরাপশন’ লক্ষ্য করা গেছে, যা কারোরই উপকারে আসেনি।”
‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে কিছু এলিমেন্ট, তারা নিজেদের শক্তিকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে এই সম্পর্কটাকে বিগড়ে দেওয়ার কাজ করেছে। তবে সুখবর হলো, দুই পক্ষই এখন অনুধাবন করেছে—এটা পাল্টানো দরকার,” বলছিলেন মি আকবর।
এম জে আকবর যে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবের দিকেই ইঙ্গিত করছেন–তা তার কথায় ছিল স্পষ্ট।
খলিলুর রহমানের এই সফর আগামী দিনে খুব শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের পথও প্রশস্ত করবে বলে তার ধারণা।
তবে তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারতকে বেছে নেবেন, না কি চীন, আমেরিকা বা সৌদি আরবের মতো অন্য কোনো দেশে যাবেন–সেটা এখনো নিশ্চিত নয়।
‘এখন দেনা-পাওনার হিসাবের সময়’
গত তিন-চার মাসে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তারেক রহমান তথা বিএনপি নেতৃত্বের প্রতি ভারত যেভাবে প্রকাশ্য আউটরিচ করেছে, সেটা নির্দিষ্ট কিছু ‘প্রতিশ্রুতি’র বিনিময়েই ঘটেছে বলে ভারতের কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের বিশ্বাস।
ঢাকায় ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী এই দলেই পড়েন এবং তিনি বিশ্বাস করেন, এখন বিএনপি সরকারের সেসব প্রতিশ্রুতি রক্ষার পালা।
বিবিসিকে তিনি বলছিলেন, ‘আমি যতদূর জানি, বাংলাদেশ এই সফরে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তত তিনটি দাবি জানাবে–এক, সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যা বন্ধ করা, পানিচুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করা আর বাণিজ্য সুবিধাগুলো প্রত্যাহার করা।’
‘তা ছাড়া পশ্চিম এশিয়া পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশ যে জ্বালানিসংকটে ভুগছে, তার জন্য বিদ্যমান চুক্তির আওতায় ভারতের কাছ থেকে অতিরিক্ত ডিজেলও কিনতে চাওয়া হবে অবধারিতভাবে।’
মি চক্রবর্তী সেই সঙ্গেই বলছেন–‘ভারতও যেহেতু সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়’, তাই এসব দাবি বা অনুরোধে ইতিবাচক মনোভাবই দেখানো হবে; কিন্তু সেই সঙ্গে ভারতেরও অবশ্যই কিছু পাল্টা দাবি থাকবে।
‘যেমন ডিজেল আমরা অবশ্যই দেব। কিন্তু কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো আপনাদের খুলতে হবে–আগরতলা-আখাউড়া রেল সংযোগের মতো যে কাজগুলো থমকে আছে, সেগুলো দ্রুত শুরু করতে হবে।’
‘তা ছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে আপনারা যত খুশি ব্যবসা-বাণিজ্য করুন আপত্তি নেই; কিন্তু তাদের কোনো স্ট্র্যাটেজিক স্পেস দেওয়া চলবে না। এই প্রশ্নটায় ভারত বিন্দুমাত্র আপস করবে না’, বলছিলেন ভারতের এই সাবেক শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিবিদ।
ফলে খলিলুর রহমানের আসন্ন ভারত সফরে দুই পক্ষ কার কাছে ঠিক কী চাইছে, সেটা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে বলেই তিনি মনে করছেন।
বাণিজ্য সুবিধাগুলো পুনর্বহাল হবে?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের ভারত সফরে দুই দেশের যে পারস্পরিক বাণিজ্য সুবিধাগুলো গত দেড় বছরে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা পুনর্বহাল করার বিষয়েও আলোচনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দিল্লির থিংকট্যাংক আরআইএসের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে বলছিলেন, ‘দিল্লি বিমানবন্দর নিয়ে বাংলাদেশের গার্মেন্ট প্রস্তুতকারকরা বিদেশে পণ্য পাঠানোর যে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পেতেন, সেটা তুলে নেওয়ায় তাদের সমস্যা অনেক বেড়ে গেছে।’
‘এখন তারা পণ্য পাঠাচ্ছেন মালদ্বীপ বা দুবাই হয়ে, যা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তা ছাড়া স্থল সীমান্ত দিয়েও পণ্য ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না–সেগুলো অ্যালাও করা হচ্ছে একমাত্র মুম্বাইয়ের নওসেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে, যেটা তাদের জন্য অনেক ঘুরপথ।’
ফলে বাংলাদেশের তরফে এই সুবিধাগুলো এখন ফেরত চাওয়া হবে বলেই তিনি ধারণা করছেন।
ড. দে বিবিসিকে আরো বলছিলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার যাতে ‘সার্ক’কে জিইয়ে তোলার ওপর জোর না দিয়ে ‘বিমসটেক’-কে বেশি গুরুত্ব দেয়–ভারত কিন্তু সেটাই প্রত্যাশা করবে।
‘মনে রাখবেন, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার কিন্তু বাংলাদেশ। কিন্তু জোটের চেয়ার হিসেবে তাদের যে বৈঠকগুলো আহ্বান করার কথা, গত এক বছরে তার একটাও প্রায় করা হয়নি।’
‘ড. ইউনূস বিমসটেককে উপেক্ষা করে শুধু সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার কথাই বলে গেছেন–যেটা ভারতের পক্ষে সহজবোধ্য কারণেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।’
‘চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের মেয়াদের আরো এক বছর বাকি। এই সময়টায় যাতে তারা বিমসটেকে গুরুত্ব আরোপ করে এবং তাদের দায়িত্বগুলো সম্পাদন করে, আমি নিশ্চিত দিল্লির দিক থেকে তার জন্য চাপ থাকবে,’ বলছিলেন ওই অর্থনীতিবিদ।
ফলে সামগ্রিকভাবে খলিলুর রহমানের আসন্ন ভারত সফর যেকোনো অর্থেই নিছক রুটিন সফর হবে না; বরং আলোচনার ধারে ও ভারে তা গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা বহন করবে–সেই লক্ষণ একেবারে স্পষ্ট।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
