মাত্র দুই বছরেরও কিছু বেশি সময় আগের কথা। যখন শেখ হাসিনা এমন এক নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন, যা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল এবং তার পক্ষে কারচুপির ওঠে। তখন কল্পনা করা কঠিন ছিল যে, তার ১৫ বছরের ক্ষমতার অধ্যায় হঠাৎ করে ভেঙে পড়বে অথবা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী দল, যারা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছিল, তারা এতটা শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে।
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির ধারাবাহিকতায়, এটি হাসিনার আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে আরেকটি পালাবদল মাত্র। যারা কয়েক দশক ধরে পর্যায়ক্রমে ক্ষমতা থেকেছে।
তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছরের শেষের দিকে অসুস্থতার কারণে মারা যান। তিনি চার দশক ধরে দলের প্রধান ছিলেন।
দলটি জানিয়েছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। নির্বাচন ঘোষণার পরপরই বিবিসিকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘গত এক দশকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে আবার ঠিক করতে হবে।
২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছিল দেশের তরুণরা। আগের মতো তারা একই পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার জন্য এখন আর সহনশীল বলে মনে হচ্ছে না।
বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আর যুদ্ধ করতে চাই না। পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ আমাদের জয় ছিল না। যখন আমাদের দেশ দুর্নীতিমুক্তভাবে চলবে এবং অর্থনীতি ভালো হবে, তখন সেটাই হবে আমাদের প্রধান জয়।’
তার ২১ বছর বয়সী চাচাতো বোন তাহমিনা তাসনিম বলেন, ‘আমরা প্রথম যে জিনিসটি চাই তা হলো, জনগণের মধ্যে ঐক্য। আমাদের একটি স্থিতিশীল জাতি এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির অধিকার আছে। আমরা একটি বিদ্রোহের অংশ ছিলাম এবং আমরা জানি কিভাবে লড়াই করতে হয়। তাই যদি একই জিনিস আবার শুরু হয়, তাহলে আমাদের আবারও তা করার অধিকার থাকবে।’
হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মেয়াদে দেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হতে হবে। অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, খাদ্যের দাম হ্রাস করা এবং বাংলাদেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অন্যান্য বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলেন, ‘সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার অভাব প্রায় সব দলকেই প্রভাবিত করে। জামায়াতে ইসলামী প্রথমবারের মতো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন জয়ের সুযোগ পেয়েছে। বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী কিছু শিক্ষার্থীর উদ্যোগে গঠিত তাদের জোটসঙ্গী ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি) তাদের প্রথম নির্বাচনে ছয়টি আসন জিতেছে।’
লুৎফা বলেন, ‘সব দলই বাংলাদেশের নারীদের হতাশ করেছে। মাত্র ৪ শতাংশের এর বেশি প্রার্থী ছিলেন নারী।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা জুলাইয়ের বিদ্রোহের অংশ ছিলাম, সমস্ত রাজনৈতিক দল আমাদের যৌথ সংস্থাকে আরো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক, নির্বাচনী অঙ্গনে রূপান্তর করতে ব্যর্থ হয়েছি। সংসদ সদস্যদের এখন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে তারা সংসদে সংরক্ষিত নারীদের জন্য আসনগুলোতে দক্ষ, সৎ এবং যোগ্য প্রার্থীদের আনতে পারেন।’
বাংলাদেশের সংসদের ৩৫০টি আসনের মধ্যে ৩০০টি নির্বাচিত এবং বাকি ৫০টি নারীদের জন্য সংরক্ষিত। এই সংরক্ষিত আসনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ফলাফলের অনুপাতে নারী সদস্য মনোনয়ন দেয়।
গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে আবার মূল রাজনৈতিক ধারায় ফিরিয়ে আনার পক্ষে সমর্থন করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরে আসতে কিছুটা সময় লাগবে, কারণ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। যখন আপনার বিরুদ্ধে আপনার নিজের লোকদের হত্যা, নৃশংসতা, নিপীড়নের অভিযোগ আনা হবে, তখন জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে যে, বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যতে তারা কোথায় থাকবে।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
