Friday , 5 December 2025
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
রাশিয়ায় যুদ্ধে প্রাণ হারালেন সোহান, মরদেহ ফেরত চায় পরিবার

রাশিয়ায় যুদ্ধে প্রাণ হারালেন সোহান, মরদেহ ফেরত চায় পরিবার

নরসিংদী প্রতিনিধিঃ
চাকরির আশায় বিদেশ পাড়ি দিয়ে দালালচক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছেন নরসিংদীর পলাশ উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের সোহান মিয়া (২৮)। শনিবার (২১ জুন) বিকেল সাড়ে তিনটায় সোহানের এক বন্ধু ও সহযোদ্ধা জাফরের ফোনে তাঁর মায়ের কাছে মৃত্যুসংবাদ আসে। এর কিছুক্ষণ পরেই ফোনে পাঠানো হয় সোহানের মরদেহের হৃদয়বিদারক ছবি। সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে সোহানের পরিবার ও পুরো গ্রাম।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোহানের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আত্মীয়—স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামবাসীরা ভিড় করেছেন তাঁকে শেষবারের মতো স্মরণ করতে। একমাত্র সন্তান হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন সোহানের মা নূরন্নাহার।জানা যায়, ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় সোহান এবং তাঁর বোনজামাই আকরাম মিয়া ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ধারদেনা করে পাড়ি জমান বিদেশে।

রাজধানীর বনানীর ড্রিম হোম ট্রাভেলস নামক একটি প্রতিষ্ঠানের দালাল জেরিনের মাধ্যমে সাইপ্রাস যাওয়ার জন্য কাগজপত্র জমা দেন তাঁরা। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী গন্তব্য না হয়ে তাঁদের পাঠানো হয় রাশিয়ায়। ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ১০ জনের একটি দল রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরে পেঁৗছানোর পর তাঁদের কয়েকদিন একটি স্থানে রাখা হয়। এরপর হঠাৎ করেই সোহানসহ আরও দু’জনকে সরিয়ে নেওয়া হয় একটি সেনা ক্যাম্পে। সেখানে তাঁদের দেওয়া হয় সামরিক পোশাক এবং বাধ্যতামূলকভাবে পাঠানো হয় যুদ্ধ প্রশিক্ষণে। প্রশিক্ষণে রাজি না হলে দেওয়া হয় হত্যার হুমকি, মারধর ও খাবার না দেওয়ার মতো অমানবিক নির্যাতন।

তবে সোহানের বোনজামাই আকরাম মিয়া কৌশলে পালিয়ে যান এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিকিটের জন্য আরও দেড় লাখ টাকা সংগ্রহ করে গত ১৬ জানুয়ারি দেশে ফিরে আসেন। সোহানের বড় চাচা রেজাউল আলম রিপন জানান, দালালদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছিল চকলেট কারখানায় কাজের। কিন্তু বাস্তবে তাঁদের রুশ সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। সোহান প্রাণ হারানোর আগে আকরামকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সোহানের মা নূরন্নাহার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেকে ১৪ লাখ টাকা খরচ করে যুদ্ধ করতে পাঠাইনি। সে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিল। মাঝেমধ্যে দেশে ফেরার আকুতি নিয়ে কাঁদতো। ওর শরীরে বোমার বিস্ফোরণ হয়, তাই মারা যায়—জাফর আমাকে ফোনে এ কথা জানায়। আমি দালালদের বিচার চাই, যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

সরকারের কাছে আকুতি—আমার সন্তানের লাশ যেন ফিরিয়ে আনা হয়।” সোহানের স্ত্রী হাবিবা আক্তার জানান, “সোহানকে ফেরানোর জন্য আমরা বারবার ড্রিম হোম ট্রাভেলসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারা জানায়, আড়াই লাখ টাকা দিলে ২৬ জানুয়ারির মধ্যে ফেরত পাঠাবে। কিন্তু সোহান তো আর ফিরে আসেনি, সে এখন লাশ।” তিনি আরও বলেন, “আমি সরকারের কাছে আবেদন করছি, যেন আমার স্বামীর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হয় এবং প্রতারক দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।” এ বিষয়ে পলাশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ আবুবক্কর সিদ্দিকী বলেন, “পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন পেলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মরদেহ দেশে ফেরত আনার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারকে সর্বাত্মক সহায়তা দেওয়া হবে।” এদিকে, এই করুণ ঘটনার পর এলাকাবাসীর মাঝে বিদেশে যাওয়ার আগে সচেতনতা এবং দালালদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। সোহানের মৃত্যু যেন আর কারো জীবনে না ঘটে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবাই করছে।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply