বাংলাদেশের শান্তিশৃঙ্খলা চিরতরে ভেঙে ফেলা এবং একটি সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল— এমন বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে। দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে তিনি যে অভিজ্ঞতা ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তা কেবল একজন রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী শাসনামলের ক্ষমতা কাঠামো, সাংবিধানিক চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্য অনুযায়ী, দেড় বছরের বেশি সময় তাঁকে কার্যত ক্ষমতাহীন ও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতীকী প্রধান হলেও তাঁর কিছু মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব রয়েছে— সরকারপ্রধানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক চুক্তি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত থাকা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্য রক্ষা করা।
এই বিশ্লেষণ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়— গণতন্ত্রের ভিত্তি ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রপতির প্রতিষ্ঠান যদি দুর্বল হয়, তবে ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারই সংবিধানের সীমারেখা অতিক্রম করার দৃষ্টান্ত খুঁজে পাবে। এই কারণে সাক্ষাৎকারটি কেবল অতীতের হিসাব নয়, এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। এই সাহসী ও অনুসন্ধানী সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য কালের কণ্ঠের সাংবাদিক হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন কৃতিত্বের দাবিদার।
দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল সংবিধানের অনুচ্ছেদ বা আন্তর্জাতিক র্যাংকিং দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ইতিহাস দেখিয়েছে— একটি দেশ নির্বাচন আয়োজন করতে পারে, সংবাদপত্র প্রকাশের অনুমতি দিতে পারে, তবু যদি সাংবাদিকরা ভয়, নীরবতা বা আত্ম-সেন্সরশিপে বন্দী থাকেন, তবে প্রকৃত স্বাধীনতা অনুপস্থিত থাকে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের দৃষ্টিতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অনুমতি নয়, সুরক্ষার বিষয়। এটি বাগ্মিতার নয়, অনুশীলনের প্রশ্ন।
ইতিহাস আমাদের পথ দেখায়। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির সময় The Washington Post–এর অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতাকেও জবাবদিহিতার মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সেখানে আলো এসেছিল কারণ সত্যকে দাঁড়াতে দেওয়া হয়েছিল, দমন করা হয়নি।
এর বিপরীতে, আজ বহু দেশে অস্পষ্ট আইন— জাতীয় নিরাপত্তা, ডিজিটাল নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার অজুহাতে— সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যখন সত্য বলার ফল হয় গ্রেপ্তার, নির্বাসন বা নিখোঁজ, তখন যত সংবাদমাধ্যমই থাকুক, স্বাধীনতা অন্ধকারেই থাকে।
এই কারণেই রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দেশকে মূল্যায়ন করে এই প্রশ্নে— সাংবাদিকরা কি ক্ষমতার অপব্যবহার, নির্যাতন ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরতে পারেন?
জর্জ অরওয়েলের ভাষায়, সাংবাদিকতা হলো এমন কিছু ছাপানো যা কেউ ছাপাতে চায় না; বাকিটা জনসংযোগ। এই উক্তি আজও প্রাসঙ্গিক।
উপসংহারে বলা যায় – আলো একটি শর্ত, দাবি নয়
সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কোনো সরকারি ঘোষণায় আসে না। এটি বাস্তব হয় তখনই, যখন—
সাংবাদিকরা ভয় ছাড়াই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারেন
সত্য জবাবদিহিতার জন্ম দেয়, প্রতিশোধের নয়
আইন নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে, কর্তৃত্বের নয়
নীরবতা পছন্দ হিসেবে থাকে, চাপ হিসেবে নয়
এই অর্থে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কেবল একটি গণতান্ত্রিক সূচক নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার ও বিবেকের আয়না।
যেখানে সত্য অবাধে চলতে পারে, সেখানেই সংবাদপত্র আলোতে থাকে।
আর যেখানে সত্য ফিসফিস করে— অথবা অদৃশ্য হয়ে যায়— সেখানে অন্ধকার ইতিমধ্যেই নেমে এসেছে। যা বাংলাদেশের সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান।
এই অন্ধকারে আলো জ্বালানোর দরজা কালের কণ্ঠ জনগণের জন্য খুলে দিয়েছে। এখন সেই দরজাটি রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক : দেলোয়ার জাহিদ, স্বাধীন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মুক্তিযোদ্ধা।
সভাপতি, বাংলাদেশ নর্থ আমেরিকান জার্নালিস্ট নেটওয়ার্ক, এডমন্টন, আলবার্টা, কানাডা।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
