সিলেট ব্যুরো চিফ:
সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা, ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ (কেমুসাস)-এর আয়োজনে সম্পন্ন হলো ‘শেকড়ের সন্ধানে অভিযাত্রা ২০২৫’। গত ২৫ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার ১০১ জন সাহিত্যপ্রেমী, কবি ও গবেষকের একটি কাফেলা যাত্রা করেছিল কানাইঘাটের বাটইশাইল গ্রামে, যেখানে ঘুমিয়ে আছেন কালজয়ী মরমি সাধক ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের তেজস্বী নেতা হযরত শাহ মোহাম্মদ ইবরাহিম আলী তশ্না (রহ.)।
অভিযাত্রার সূচনা হয় কেমুসাস প্রাঙ্গণ থেকে, যার উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক হারুনুজ্জামান চৌধুরী। কানাইঘাটে পৌঁছে অভিযাত্রী দল প্রথমেই মরমি কবির মাজার জিয়ারত করেন। এরপর উমরগঞ্জ ইমদাদুল উলুম মাদরাসা মাঠে এক বর্ণাঢ্য আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উন্মুক্ত আকাশের নিচে আয়োজিত এই সভাটি কানাইঘাটের স্থানীয় সাহিত্যিক ও সিলেটের গুণীজনদের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়।
আলোচনা সভায় বক্তারা মরমি কবির বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক উন্মোচন করেন। তিনি শুধু একজন উঁচুদরের আলেম বা দেওবন্দ মাদরাসার কৃতি ছাত্রই ছিলেন না, বরং একাধারে ছিলেন শক্তিশালী কবি, সুফি সাধক এবং রাজনীতিবিদ। তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘অগ্নিকুণ্ড’ এবং ৩ শতাধিক আধ্যাত্মিক সংগীত বাংলা মরমি সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। বক্তারা গুরুত্বারোপ করেন যে, তশ্না (রহ.) তাঁর সংগীতের মাধ্যমে এক বিশাল জনগোষ্ঠীকে ইসলামের ছায়াতলে এবং মানবিক চেতনার পথে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন।
শেকড়ের সন্ধানে উপকমিটির আহবায়ক কবি সালেহ আহমদ খসরুর সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব কামরুল আলম ও ক্যালিগ্রাফার জাহেদ হোসাইন রাহীনের যৌথ সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন এবং উপস্থিত ছিলেন সিলেটের শীর্ষস্থানীয় একঝাঁক গুণীজন। সভায় বক্তব্য রাখেন কেমুসাসের সাবেক সভাপতি হারুনুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক সহ-সভাপতি কবি কালাম আজাদ, বর্তমান সহ-সভাপতি আফতাব চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সেলিম আউয়াল এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদ রাজা চৌধুরী।
এছাড়াও কানাইঘাটের কৃতি সন্তান কবি সালেহ আহমদ, দৈনিক নয়াদিগন্তের ব্যুরো চিফ আবদুল কাদের তাপাদার, লাইব্রেরি সম্পাদক কবি নাজমুল আনসারী, সহ-লাইব্রেরি সম্পাদক কবি ইশরাক জাহান জেলী, কবি কামাল তৈয়ব অ্যাডভোকেট, সাংবাদিক মোয়াজ আফসার এবং উমরগঞ্জ মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা আফতাব উদ্দিন আলোচনায় অংশ নেন। স্থানীয় আয়োজকদের পক্ষে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কবির প্রপৌত্র ও বিশিষ্ট লেখক কবি সরওয়ার ফারুকী।
অভিযাত্রী দলে আরও উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক মোয়াজ আফসার, ড. তুতিউর রহমান, চ্যানেল আই সিলেট প্রতিনিধি সাদিকুর রহমান সাকি, দৈনিক সকাল বেলা’র সিলেট ব্যুরো চিফ কবি ও সাংবাদিক সৈয়দ মুহিবুর রহমান মিছলু, কানাইঘাট প্রেসক্লাবের সভাপতি নিজাম উদ্দিন, সেক্রেটারি মাহবুবুর রশীদ, নকশী বাংলা ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম জয়নাল, খন্দকার রোমানা আহমদ, মাছরাঙা প্রকাশনীর প্রকাশক কবি আবুল কাশেম, প্রবাসী সাংবাদিক শাহ সোহেল আহমেদ, ছড়াকার সাজ্জাদ হোসাইন সাজু, কবি শান্তা কামালী, সাংবাদিক আব্দুল ওয়াহিদ চৌধুরী, আব্দুর রব তাপাদার, প্রকাশক বায়েজীদ মাহমুদ ফয়সল, লুৎফুর রহমান তোফায়েল, আব্দুল্লাহ আল নোমান সহ অনেক বিজ্ঞ সাহিত্য অনুরাগী।
উমরগঞ্জ মাদরাসা মাঠের বিশেষ আকর্ষণ ছিল কবির ব্যক্তিগত স্মারক প্রদর্শনী। তাঁর হাতের লেখা পাণ্ডুলিপি, ঐতিহাসিক সিলমোহর এবং কানাইঘাট অঞ্চলের লেখকদের বইয়ের এক দুর্লভ সংগ্রহ অভিযাত্রীদের বিমোহিত করে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এই অঞ্চলের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার চিত্রও ফ্যাস্টুনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। অনুষ্ঠানের শেষে ‘দৈনিক সুরমা মেইল’-এর বিশেষ ক্রোড়পত্রের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
কানাইঘাটের সাহিত্যিক দাবি ও কেমুসাস-এর ভূমিকা
অনুষ্ঠানে স্থানীয় লেখকদের পক্ষ থেকে একটি জোরালো দাবি উঠে আসে। কবি সরওয়ার ফারুকীসহ স্থানীয় সাংবাদিক ও কবিরা উল্লেখ করেন যে, কানাইঘাট সাহিত্যের এক উর্বর ভূমি হলেও যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে অনেক গুণী লেখক হারিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা সিলেটের সাহিত্য তীর্থ কেমুসাস-এর প্রতি আহ্বান জানান যেন কানাইঘাটের এই সমৃদ্ধ সাহিত্যভাণ্ডার নিয়ে বিশেষ গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কেমুসাস নেতৃবৃন্দও এই বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার ইতিবাচক আশ্বাস প্রদান করেন।
এই অভিযাত্রা কেবল একটি ভ্রমণ ছিল না, বরং এটি ছিল শেকড়ের সাথে আগামীর সেতুবন্ধন। কবি তশ্না-র জীবন ও দর্শনের মধ্য দিয়ে আমাদের সন্তানদের দেশপ্রেম ও আধ্যাত্মিকতার শিক্ষা দেওয়ার যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই অতুলনীয়। শিল্পী আলী হায়দারের মরমী কণ্ঠ আর সালেহ আহমদ খসরুর উদাত্ত আবৃত্তির মধ্য দিয়ে সন্ধ্যার গোধূলিলগ্নে শেষ হয় এই ঐতিহাসিক সাহিত্য সফর।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
