সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে

0
12

রাজধানীর কল্যাণপুরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযানে নিহত ৯ জঙ্গির মধ্যে গতকাল বুধবার পর্যন্ত সাতজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলো সেজাত রউফ অর্ক ওরফে মরক্কো, জোবায়ের হাসান, আবদুল্লাহ, আবু হাকিম নাঈম, তাজ উল হক রাশিক, আরিফুজ্জামান খান ও মতিয়ার রহমান। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কর্মকর্তারা নিহত জঙ্গিদের আঙুলের ছাপ নিয়ে তা জাতীয় পরিচয়পত্রে সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হন।

গত মঙ্গলবার রাতে ডিএমপির ওয়েবসাইটে ৯ জঙ্গির ছবি প্রকাশ করা হয়। তাদের মধ্যে একজনকে সাব্বিরুল হক কণিক ওরফে সাব্বির বলে স্বজনরা দাবি করলেও জাতীয় পরিচয়পত্রে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের সঙ্গে তার আঙুলের ছাপ মেলেনি। নিহত আরেক জঙ্গির পরিচয় গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

গতকাল রাতে ডিএমপির পুলিশের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান অবাক নিউজ 24 কে জানান, সেজাত রউফ অর্কর বাসা রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায়। তার বাবার নাম তৌহিদ রউফ। অন্যদের মধ্যে

আরিফুজ্জামানের বাড়ি ঢাকার গুলশানের ১০ নম্বর সড়কে, তার বাবার নাম সাইফুজ্জামান খান। রাশিকের বাড়ি ধানমিণ্ডর ১১/এ নম্বর সড়কে, তার বাবার নাম রবিউল হক। জোবায়েরের বাড়ি নোয়াখালীর সুধারাম থানার পশ্চিম মাইজদী গ্রামে (মেম্বারবাড়ি)। তার বাবার নাম আব্দুল কাইয়ুম। মতিয়ারের বাড়ি সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ওমরপুর এলাকায়, তার বাবার নাম নাসির উদ্দিন সরদার। আবদুল্লাহর বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ভল্লবপুর এলাকায়, তার বাবার নাম মো. সোহরাব আলী। আবু হাকিম নাঈমের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটায়, তার বাবার নাম নুরুল ইসলাম।

পুলিশ বলেছে, কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ছিল। লাশ শনাক্ত করতে স্বজনদের খবর দেওয়া হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হতে স্বজনদের ডিএনএ টেস্ট করা হবে। এরপর লাশ হস্তান্তর করা হবে। লাশগুলো ঢাকা মেডিক্যালের হিমঘরে রাখা হয়েছে।

গতকাল বুধবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৯ জঙ্গির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ৪৫ মিনিটে তাদের লাশ ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকদের ভাষ্য মতে, মর্গে আনার ১২-১৩ ঘণ্টা আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। সবাই গুলিতে নিহত হয়েছে। ৯ জনের মধ্যে বেশির ভাগের শরীরে বুলেট ঢুকেছে পেছন দিক থেকে। শরীরের অন্যান্য অংশেও গুলি লেগেছে। প্রত্যেকের শরীরে ছয়-সাতটি করে গুলির চিহ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও মাথায় আঘাত থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।

জাহাজ বিল্ডিং নামে পরিচিত কল্যাণপুরের সেই তাজ মঞ্জিল গতকাল সিলগালা করে দিয়েছে পুলিশ। গতকাল সকাল ১০টার দিকে মিরপুর থানা পুলিশের একটি টিম কল্যাণপুরের ৫ নম্বর সড়কের ৫৩ নম্বর পাঁচতলা বাড়িটি সিলগালা করে দেয়। পুলিশের অনুমতি ছাড়া ওই বাড়ি থেকে কোনো বাসিন্দা জিনিসপত্র সরিয়ে নিতে পারবে না বলেও জানানো হয়েছে।

তবে অভিযান ও ৯ জঙ্গি নিহত হওয়ার ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ বলছে মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আর মঙ্গলবার সকালে অভিযান শেষে আটক ৪২ জনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল মুচলেকা নিয়ে ৩৮ জনকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। বাকি চারজনের মধ্যে বাড়ির মালিকের স্ত্রী মমতাজ বেগমকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে দুই দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিল অর্ক : পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী অর্ক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল। গুলশান হামলায় অংশ নেওয়া নিবরাস ইসলামের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল তার। দুজনই মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। সম্প্রতি র‌্যাবের প্রকাশ করা নিখোঁজ তালিকায়ও অর্কর নাম ছিল। গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাসা থেকে বের হওয়ার পর অর্ক আর ফেরেনি জানিয়ে তার বাবা ১৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ভাটারা থানায় জিডি করেছিলেন।

পুলিশ জানায়, গতকাল দুপুরে বাবা তৌহিদ রউফ এবং ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক কর্মকর্তা লাশ দেখতে ঢাকা মেডিক্যালের মর্গে যান। তৌহিদ রউফ প্রথমে লাশটি অর্কর বলে শনাক্ত করেন। তবে আরেকবার দেখে তিনি লাশটি অর্কর কি না তা নিয়ে সন্দেহের কথা জানান। এ নিয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পুরোপুরি নিশ্চিত হতে ডিএনএ টেস্ট করতে পুলিশের কাছে আবেদন জানান তিনি।

গতকাল বিকেলে বাসায় গিয়ে অর্কদের পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। বাসার  কেয়ারটেকার আশরাফ জানান, স্যার (তৌহিদ রউফ) মেডিক্যালে আছেন। তিনি সকালে বের হয়েছেন। অর্কের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে অর্ক নিখোঁজ ছিলেন। তারপর থেকে তৌহিদ স্যার অসুস্থ হয়ে গেছেন। তাঁর হার্টে দুই বার অপারেশন করা হয়েছে। সাত-আট বছর আগে ম্যাডাম (অর্কর মা) মারা গেছেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তান ছিলেন অর্ক। তিনি আমেরিকার নাগরিক ছিলেন। তাঁর  বড় বোনও আমেরিকা থাকেন। অর্ক শান্ত স্বভাবের ছিলেন। দিনের বেলায় বাইরে থাকতেন। তবে সন্ধ্যার পরপরই বাসায় চলে আসতেন।

গতকাল মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তৌহিদ রউফ অবাক নিউজ 24 কে বলেন, ‘প্রথমে মনে করেছিলাম ৯টি লাশের মধ্যে একটি অর্কর। মর্গে গিয়ে তা নিশ্চিত হয়েছিলাম। তবে আরেকবার লাশটি দেখার পর সন্দেহ হচ্ছে। কারণ অর্ক সুস্থ দেহের অধিকারী ছিল। আর এখন অনেক চিকন হয়ে গেছে। এই কারণে পুলিশের কাছে আবেদন করেছি  ডিএনএ টেস্ট করার জন্য।’

শিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিল জোবায়ের : জোবায়ের নোয়াখালী সরকারি কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিল। পরিবারের দাবি, ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল জোবায়ের। গত ১০ রমজানের দিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় সে। এ বিষয়ে গত ১০ জুলাই সুধারাম থানায় জিডি করা হয়েছিল। র‌্যাবের নিখোঁজ তালিকায় তার নাম ছিল। গত সোমবার ডিআইজি চট্টগ্রাম রেঞ্জ অফিস থেকে প্রকাশিত নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকায়ও জোবায়েরের নাম ছিল।

পারিবারিক সূত্র জানায়, গতকাল সংবাদমাধ্যমে ছবি দেখে আবদুল কাইয়ুম ছেলের লাশ শনাক্ত করেন। পরে বিষয়টি তিনি পুলিশকে জানান। পুলিশের নির্দেশনা পেয়ে তিনি লাশ শনাক্তের জন্য গতকালই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন।

আবদুল কাইয়ুম জানান, পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় ছিল জোবায়ের। শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল সে। তাকে জঙ্গি হতে উদ্বুদ্ধ করেছে মেম্বারবাড়ির জামায়াতের রুকন বাহাদুর। বাহাদুর বেশ কিছুদিন সৌদি আরব ছিল, সেখান থেকে ফিরে জঙ্গি হতে জোবায়েরকে উদ্বুদ্ধ করেছে।

নোয়াখালীর এএসপি এ কে এম জহিরুল ইসলাম জানান, পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে আবদুল কাইয়ুম জোবায়েরকে শনাক্ত করে সকালে (বুধবার) সুধারাম থানার পুলিশকে জানান।

সাব্বিরকে নিয়ে ধোঁয়াশা : ডিএমপির প্রকাশ করা ছবির মধ্যে তৃতীয় সারির মাঝে আট নম্বর লাশটি সাব্বিরের বলে দাবি করছে স্বজনরা। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে সংরক্ষিত আঙুলের ছাপের সঙ্গে ওই যুবকের আঙুলের ছাপ না মেলায় গতকাল পুলিশ তার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি।

ওই পরিবারের ভাষ্য মতে, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের ইকোনমিকস অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারে পড়ত সাব্বির। তার বাড়ি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায়। বাবার নাম আজিজুল হক চৌধুরী রাশেদ। তিনি উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। পরিবারের দাবি, পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ ছিল সাব্বির। তবে পরিবার কোনো জিডি করেনি।

আজিজুল হক চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর আদায়কারী পদে কর্মরত আছেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, সাব্বির গোল্ডেন জিপিএ পেয়ে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাই স্কুল থেকে ২০১০ সালে এসএসসি এবং ২০১২ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে। এইচএসসি পাসের পর নগরের চকবাজার এলাকায় জামায়াত-শিবির পরিচালিত একটি কোচিং সেন্টারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করতে গিয়ে হঠাৎ করে তার কথাবার্তা, চালচলনে পরিবর্তন দেখা দেয়। পরে সে জামায়াত নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামে ভর্তি হয়। সীতাকুণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের কুমিরা ক্যাম্পাসের আবাসিক হোস্টেলে থাকত সে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, ছেলে বিপথগামী হয়েছে—এ খবর পেয়েও আইনি ঝামেলা এড়াতে এবং মানসম্মানের ভয়ে থানায় জিডি করেননি বাবা আজিজুল হক।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, তাবলিগের কথা বলে মাঝে মাঝে সাত থেকে ১০ দিনের জন্য উধাও হয়ে যেত সাব্বির। বছরখানেক আগে একবার তিন মাস নিরুদ্দেশ থাকার পর বাসায় ফিরেছিল। সর্বশেষ পাঁচ মাস আগে চট্টগ্রামের রাউজানে এক বিয়েতে যাওয়ার কথা বলে বাবার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে বের হয়। এরপর আর ফেরেনি।

স্বজনরা জানায়, সম্প্রতি ‘আইডি নাম্বার দুই’ নামে ফেসবুকের একটি আইডি থেকে সাব্বিরের কিছু তৎপরতা স্বজনদের কাছে ধরা পড়ে। ওই আইডি থেকে জানা যায়, সাব্বির বিয়ে করেছে। কিন্তু কোথায় আছে তা জানা যায়নি।

বাবা আজিজুল হক বলেন, ‘সাব্বির গত ২১ ফেব্রুয়ারি ঘর থেকে বের হয়ে আর ফেরেনি। রাগে-দুঃখে তাকে ফেরানোর কোনো চেষ্টা করিনি, থানায় জিডিও করিনি। কল্যাণপুরের ঘটনার পর পত্রিকায় ছবি দেখে ছেলের বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছি।’

জিডি করেননি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আজিজুল হক বলেন, ‘লোকলজ্জা আর সামাজিকতার ভয় ছিল, রাগ-ক্ষোভও ছিল। নিজের জন্মদাতা পিতার কথা না শুনে খারাপ লোকের কথা শোনে, তাই তার চেহারাও দেখতে চাই না। তার লাশও আনব না।’

ইতিমধ্যে পুলিশ, র‌্যাব ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা যোগাযোগ করছেন জানিয়ে আজিজুল বলেন, ‘আমাদের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। আমাদের ঘরের সন্তানের এ ধরনের কর্মকাণ্ড লজ্জার।’

স্বজনদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার রাতে আনোয়ারা থানার ওসি আবদুল লতিফ বরুমচড়ায় সাব্বিরের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নেন। পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আজিজুল হককে গতকাল ডেকে নিয়ে কথা বলেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ও জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা গতকাল অবাক নিউজ 24 কে বলেন, ‘উনার (বাবা) সাথে আমরা কথা বলেছি। নিহত ওই জঙ্গির সঙ্গে সাব্বিরের চেহারার অনেকটা মিল আছে। লাশ শনাক্তের জন্য তিনি (বাবা) ঢাকা যাচ্ছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারি থেকে সাব্বির নিখোঁজ রয়েছে।’

বেশির ভাগের গুলি লেগেছে পেছন দিক থেকে : হাসপাতাল সূত্র জানায়, গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে ৯ জনের লাশের ময়নাতদন্ত শুরু হয়। শেষ হয় দুপুর ১টা ২৯ মিনিটে। ময়নাতদন্তের আগে মিরপুর থানার তিনজন সাব-ইন্সপেক্টর লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। ময়নাতদন্ত বোর্ডের প্রধান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডাক্তার সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, সবাইকে অজ্ঞাত হিসেবেই ময়নাতদন্ত করা হয়। সবাই গুলিতে নিহত হয়েছে। একেক জনের বুক, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছয়-সাতটি করে গুলি লেগেছে। বেশির ভাগের শরীরে গুলি লেগেছে পেছন দিক থেকে। চারজনের শরীর থেকে সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনের শরীরে তিনটি, আরেকজনের শরীরে দুটি এবং অন্য দুজনের শরীরে একটি করে গুলি ছিল। বাকি পাঁচ জনের শরীরে ক্ষত থাকলেও কোনো গুলি পাওয়া যায়নি। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থান দিয়ে গুলি ঢুকে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সোহেল মাহমুদ আরো বলেন, লাশগুলো থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ ও প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিটি লাশ থেকে চুল, ঊরুর মাসল ও প্রসাবের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

জাহাজ বিল্ডিংয়ের মালিকের স্ত্রী রিমান্ডে : অভিযান শেষে আটক ৪২ জনের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গতকাল ৩৮ জনকে পুলিশ ছেড়ে দিয়েছে। আটক চারজনের মধ্যে বাড়ির মালিক মমতাজ বেগমকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। মিরপুর থানার এসআই জাকির হোসেন জানান, অন্যদের মধ্যে মমতাজ বেগমের ছেলে জুয়েল, বাড়ির কেয়ারটেকার মুনিম আহমেদ ও বাড়ির মালিকের এক মেয়ের জামাতা আটক রয়েছেন। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

সুস্থ হলে রিগ্যানকে রিমান্ডে নেওয়া হবে : জাহাজ বিল্ডিংয়ে যৌথ অভিযানের সময় আহত অবস্থায় ধরা পড়া বগুড়ার রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন। গতকাল পুলিশ-র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাকে কয়েক দফা জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। পুলিশের দাবি, ঢাকায় হোসনি দালানে হামলার ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তাকে পুলিশ খুঁজছিল।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে হাসান জানিয়েছে, গুলশান হামলায় যারা অংশ নিয়েছিল তাদের সবার সঙ্গে আমাদের (কল্যাণপুরে নিহত) যোগাযোগ ছিল। একেকটি গ্রুপ হয়ে আমরা কাজ করছিলাম। আমরা সবাই আইএস মতাদশে বিশ্বাসী। সামনে আরো হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা অবাক নিউজ 24 কে জানান, রিগ্যান কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। গুলশানে নিহত জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছে। সে সুস্থ হলে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কার নির্দেশে তারা জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করছিল তা বের করার চেষ্টা চলছে। আর রিগ্যান কল্যাণপুরের ওই বাসায় বাবুর্চি ছিল না। কারণ ওই বাসার রান্নাঘরে কোনো হাঁড়ি-পাতিল পাওয়া যায়নি।

সাতক্ষীরায় মতিয়ারের বাড়িতে পুলিশ : এদিকে আমাদের সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, কল্যাণপুরে ৯ জঙ্গির মধ্যে নিহত মতিয়ারের বাড়ি সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানার ধানদিয়া ইউনিয়নের ওমরপুর গ্রামে। গতকাল সন্ধ্যায় এ খবর প্রচার হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশ তার বাড়িতে যায়।

ধানদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, মতিয়ারের বাবা নাসিরউদ্দিন বিল থেকে মাছ ধরে বিক্রি করে সংসার চালান। বসতভিটা ছাড়া তার নিজের কোনো জমিজমা নেই। তার বাবা চার বিয়ে করেছেন। এখন কোনো স্ত্রীই তাঁর কাছে থাকেন না।

 

কোন মন্তব্য নেই

একটি উত্তর ত্যাগ