ব্রেকিং নিউজ
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » হুমায়ূন আহমেদ কেন বেঁচে আছেন
হুমায়ূন আহমেদ কেন বেঁচে আছেন
--ফাইল ছবি

হুমায়ূন আহমেদ কেন বেঁচে আছেন

অনলাইন ডেস্ক:

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু হয়েছে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। অঙ্কের হিসাবে রীতিমতো এক দশক। কিন্তু এর মধ্যে জনপ্রিয়তা মোটেই ম্লান হয়নি তাঁর, একটুও প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়ায়নি হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্য। প্রতিবছর বইমেলাগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, স্টলগুলোতে হুমায়ূন আহমেদের বড় বড় ফটো শোভা পাচ্ছে আগের মতোই, যেন আছেন তিনি, একটু বাদেই স্টলে এসে বসবেন! একালে জনপ্রিয়তার হালে বাতাস পাওয়া লেখকদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বিক্রি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের বই।

বাংলাদেশের বাজার ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ বহির্বিশ্বেও বাঙালি পাঠকদের কাছে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের কদর বেশ ঈর্ষা করার মতোই। আবার হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের নানা ক্ষেত্র নিয়ে এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে একাধিক উচ্চতর গবেষণা, বিশেষ করে এমফিল ও পিএইচডি হয়ে গেছে এবং হচ্ছে। ফলে সমকালীন সাহিত্য রচয়িতা হিসেবে জনপ্রিয়তা এবং ক্লাসিক সাহিত্য রচয়িতাদের মতো সাহিত্যগুণের অধিকারী হওয়া—দুটি দিক থেকেই হুমায়ূন আহমেদ এখন আলোচনা-পর্যালোচনায় আছেন। একেই বলা যায় ‘বেঁচে থাকা’। জীবনানন্দ দাশ যে বলেছিলেন, মানুষের মৃত্যু হলেও ‘মানব বেঁচে রয়’—এই ‘মানব’টি আসলে ‘হয়ে ওঠা’ জরুরি। হুমায়ূন আহমেদ সেই মানব হতে পেরেছেন এবং তাই তাঁর মৃত্যু হলেও তিনি আদতে এখনো ‘বেঁচে’ আছেন।

একজন ‘বেঁচে থাকা’ অর্থাৎ জীবন্ত মানুষকে নিয়ে কথা তো থাকবেই। এ কথা শুরু হয়েছিল গত শতকের সাতের দশক থেকে। ১৯৭২ সালে মাত্র এক রাতে তিনি লিখেছিলেন ‘নন্দিত নরকে’ নামে একটি ছোটগল্প। দীর্ঘ এই ছোটগল্পটিকে তিনি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। প্রকাশক শর্ত দিয়েছিলেন, গল্পটি আরো বড় করে আনতে হবে এবং বইটিতে যাতে বিখ্যাত কেউ প্রশংসা করে মুখবন্ধ লেখেন সেটি নিশ্চিত করতে হবে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর গল্পটির আয়তন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন উপন্যাসের রূপ এবং এর ভূমিকা লেখানোর জন্য গিয়েছিলেন সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ শরীফের কাছে। অধ্যাপক শরীফ একটি ভূমিকা লিখেছিলেন। ফলে হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বই হিসেবে ‘নন্দিত নরকে’ প্রকাশিত হয়েছিল ঠিক সময়ে। ব্যাপক প্রশংসিতও হয় ‘নন্দিত নরকে’। এর পরের বছর অর্থাৎ ১৯৭৩ সালে প্রকাশ পায় হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘শঙ্খনীল কারাগার’। দুটি বই-ই মূলত মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। অতএব বিষয়ে প্রশ্নাতীত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সে সময় অনেকেই তো নানা ধারার লেখা লিখছিলেন, অভিজ্ঞতার বয়ান দিচ্ছিলেন।

তখন হুমায়ূন আহমেদের বয়স ২৪-২৫ বছর। এত অল্প বয়সে লেখা গদ্যগ্রন্থ দুটি ব্যাপক জনপ্রিয় হলো কেন? নিশ্চয়ই সেটি বিষয়ের গুণে। কিন্তু এর চেয়েও বেশি লেখকের গদ্যভঙ্গি ও পরিবেশনরীতির জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠলেন জনপ্রিয় সাহিত্যধারার একজন দক্ষ কারিগর। পাকিস্তান আমলে এ রকম আরেকজন গদ্য লেখককে আমরা পেয়েছিলাম। তিনি আকবর হোসেন। পাকিস্তান শাসিত পূর্ব বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর প্রতিটি বই বহু বহু সংস্করণ হয়েছিল।

হুমায়ূন আহমেদের রচনায় সেই জনপ্রিয়তার ধারাটি ছিল। কিন্তু তিনি জানতেন কী করে মহৎ সাহিত্য রচনা করতে হয় এবং লেখাকে করতে হয় কালোত্তীর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারায় তিনি পাঠক সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করেন। সহজ-সরল উপস্থাপনায় গভীর দার্শনিক কথাকেও তিনি তাঁর গল্প বা উপন্যাসে তুলে ধরেছেন অবলীলায়। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশে পাঠক সৃষ্টির কারিগরও তাঁকে বলা চলে। পাঠক তো আর সবাই এক ধরনের নয়। সবাই সিরিয়াস পাঠক হবে এমনটি ভাবা অনুচিত। ফ্রান্সিস বেকন বই পড়ার যে পদ্ধতির কথা বলেছিলেন,  বনফুলের ছোটগল্পে পাঠকের মৃত্যুর যে ছবি পাওয়া যায়, তাতেই স্পষ্ট বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, হাসান আজিজুল হকের বাইরেও অনেক পাঠক আছে আর থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। সেই পাঠকদের কথা হুমায়ূন আহমেদের আগে গভীরভাবে আমাদের লেখকরা কি কখনো ভেবেছিলেন? বাংলাদেশে পাঠক রয়েছে, কিন্তু সেই পাঠকদের মূল স্রোতোধারায় নিয়ে আসার মতো লেখকের সংখ্যা কম। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন সেই কমসংখ্যক সাহিত্যিকের অগ্রগণ্য। তিনি বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকদের জন্য ‘পাইপ পাইপার’ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর লেখনীবংশীর সুরঝংকারে সাধারণ বাঙালি পাঠক সেদিন দল বেঁধে রাস্তায় নেমেছিল। তাই বইমেলার দিনগুলো হয়ে উঠেছিল লোকারণ্য। কোনো লেখকের বই কেনার জন্য বইমেলার একটি বা দুটি বুকস্টলের সামনে রেশনের লাইনের মতো পাঠক-পাঠিকার লাইন দেওয়ার দৃশ্য বাংলাদেশের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদই প্রথম সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তিনি যে পাঠক সৃষ্টি করেছিলেন, সেই পাঠকদের জন্য লিখে তিনি একা কুলাতে পারছিলেন না। বিশেষ করে যে সময় তিনি চলচ্চিত্র ও ডকুমেন্টারিগুলো তৈরির কাজে মনোনিবেশ করলেন, তাতে ক্ষতি হলো গল্পপিপাসু পাঠকের। হুমায়ূন আহমেদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক লেখা পাঠক যখন পাচ্ছিল না, তখন পাঠক অন্য লেখকদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু সমকালীন অন্য লেখকরা হুমায়ূন আহমেদের তুলনায় ছিলেন অতি খর্ব। তাঁরা হুমায়ূন আহমেদের পথ অনুসরণ করতে চাইলেন, কিন্তু ব্যর্থ হলেন। ‘ভালোবাসা’ বা ‘প্রেম’ শব্দ দুটিকে নানাভাবে ব্যবহার করে তাঁরা উপন্যাসের নামকরণ করেন। হয়তো তাঁরা মনে করেছিলেন, তরুণ পাঠক-পাঠিকাকে আকৃষ্ট করতে বইয়ের প্রচ্ছদ ও নামকরণে এই শব্দ দুটির নানাভাবে ব্যবহার করা বইকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে কাজে আসবে। অনেকের ক্ষেত্রে তা এসেও ছিল। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্ট শিল্পসৌধকে তাঁরা বুঝতে চাননি, স্পর্শ করতেও পারেননি। তিনি মানবজীবনের সাধারণ ধারায় নিজের কথামালা সাজিয়েছেন। এর প্রয়োজনে এসেছে সব কিছু। বাড়াবাড়ি কোথাও নেই। হুমায়ূন আহমেদের লেখায় উদ্ধৃতিযোগ্য শত শত বাক্য পাওয়া যাবে, যে বাক্যগুলো মূলগ্রন্থ বা গল্প থেকে পৃথক করলেও সেগুলোর পৃথক ব্যঞ্জনা তৈরি হয়। যেমন—পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু একজনও খারাপ বাবা নেই; সবাই তোমাকে কষ্ট দেবে, কিন্তু তোমাকে এমন একজনকে খুঁজে নিতে হবে, যার দেওয়া কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে; যে ভালোবাসা না চাইতেই পাওয়া যায় তার প্রতি কোনো মোহ থাকে না; পৃথিবীতে আসার সময় প্রতিটি মানুষই একটি করে আলাদিনের প্রদীপ নিয়ে আসে, কিন্তু খুব কম মানুষই সেই প্রদীপ থেকে ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগাতে পারে; মানুষ শুধু মানুষের কাছ থেকে শিখবে না, পশু-পাখির কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যায় ইত্যাদি। মিসির আলি, হিমু, শুভ্র ইত্যাদির মতো বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য চরিত্র সৃষ্টি করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। এই চরিত্রগুলো নিজেদের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে ধারণ করেছে, যে কারণে এই চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে বাঙালি পাঠকের কাছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যময়। আজও হুমায়ূন আহমেদ তাঁর কালজয়ী সাহিত্যের মাধ্যমে বাঙালি পাঠককে জাগরিত করছেন এবং তাদের মূল সাহিত্যধারার দিকে ক্রমাগ্রসরে তৎপর আছেন। ফলে বলাই চলে, হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে আছেন, তিনি বেঁচে থাকবেন পাঠকের হৃদয়ে।

লেখক : উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com