Sunday , 25 October 2020
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » যশোরের শিশির ঘোষ হত্যাকান্ডেে ফেসে যাচ্ছেন দারোগা আলমগীর

যশোরের শিশির ঘোষ হত্যাকান্ডেে ফেসে যাচ্ছেন দারোগা আলমগীর

 মাহিদিয়ায় বন্দুকযুদ্ধের কোনো ঘটনা ঘটেনি-দাবি স্থানীয়দের

আব্দুর রহিম রানা, যশোরঃঃ

যশোরের ডিবি হেফাজতে শিশির ঘোষের হত্যাকান্ডের জট খুলতে শুরু করে।  এ হত্যা মামলায় ফেঁসে যাচ্ছেন শিশিরের খুনি ইয়াবা দারোগা আলমগীর বাবুসহ তার অনুগতরা। যেকারণে মামলাটি আতুড়ঘরেে মাটি চাপা দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন তিনি। এরই ধারাবাহিকতায় নজিবুর রহমান নামে তার এক সোর্সকে ব্যবহার করে এলাকায়  গভীর রাতে গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে বলতে হবে বলে শাসাচ্ছেন এলাকার সাধারণ মানুষকে।  তাছাড়া ষষ্টিতলার বাড়ির সামনে থেকে রাত ৮টার দিকে শিশিরকে আটক করে আলমগীরসহ ৫ সদস্যের সাদা পোশাকের পুলিশ-দাবি স্থানীয়দের।

যশোরের মাহিদিয়ার কাবিল ইটভাটার আশপাশে ৬ আগস্ট রাতে বন্দুকযুদ্ধের কোনো ঘটনা ঘটেনি। গোলাগুলির কোন ঘটনাও ঘটেনি।স্থানীয় একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, শিশির হত্যাকান্ড নিয়ে গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড় ওঠায় দৌঁড়-ঝাপ শুরু হয়েছে। হত্যাকান্ডের প্রধান অভিযুক্ত যশোর ডিবির এএসআই আলমগীর বাবু তার কথিত সোর্স মাহিদিয়ার উত্তরপাড়ার নজিবুরকে দিয়ে স্থানীয়দের ভয় দেখাতে শুরু করেছেন। কেউ তদন্তে গেলে তাদের যেন বলা হয় ওই রাতে প্রচুর গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি বলা হলে তাকে মাদক মামলায় ফাঁসানো হবে বলে শাসিয়েছে নজিবুর।পড়ুন>>যশোর ডিবি অফিসেই শিশিরকে খুন করে কপালে গুলি:এতিম শিশুর কী হবে?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সূত্র জানান, আজ সোমবার (ঈদের দিন) নজিবুর বাড়ি বাড়ি গিয়ে শাসিয়ে বলেছে কেউ তদন্তে আসলে তারা যেন বলে ৬ আগস্ট মধ্যরাতে দু’পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। তারা গুলির শব্দ শুনে ভয়ে তটস্থ ছিলেন।বন্দুকযুদ্ধ হয়নি বা গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি এমন কিছু বলা হলে তাকে মাদক মামলায় লাল কোঠায় পাঠানো হবে বলেও শাসিয়েছে নজিবুর।সরেজমিনে তদন্তে গিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

অপর একটি সূত্র জানান, তিনি শুনেছেন পুলিশের সোর্স নজিবুরকে দিয়ে স্থানীয় ইউপি মেম্বারকে ওই রাতে ডেকে একটি সাদা কাগজে সাক্ষর নিয়েছেন আলোচিত দারোগা আলমগীর।বিষয়টি নিশ্চিত হতে ইউপি মেম্বার কুতুবউদ্দিনের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।স্থানীয়দের অনেকে জানিয়েছেন কারা তদন্তে এলাকায় ঢুকেছে শুনে মেম্বার গা ঢাকা দিয়েছেন।

এদিকে পুলিশ মামলার এজাহারে দাবি করেছে কোতয়ালী থানার একদল ফোর্স ৬ আগস্ট শহরের শংকরপুর মুরগী ফার্ম এলাকা থেকে ষষ্টিতলাপাড়ার শিশির ঘোষকে একটি পিস্তলসহ আটক করে।রাতে তাকে নিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে গেলে শিশিরের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি করে। পরে ঘটনাস্থল থেকে শিশিরের লাশ ও অস্ত্রগুলি উদ্ধার করে পুলিশ।অথচ মাহিদিয়ার কাবিল ইটভাটার আশপাশের লোকজন জানালেওন ওইরাতে কেন, এ যাবত ওই এলাকায় কোনো গোলাগুলির ঘটনা ঘটেনি। আজ সোমবার নজিবুরে মুখে তারা জানতে পারেন বন্দকুযুদ্ধের কল্প কাহিনী। সূত্রমতে, নজিবুর পুলিশের সোর্স হওয়ায় তার বিরুদ্ধে এলাকার কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পান না। আজ সে শাসিয়েছে কেউ যদি বলে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়নি, তাহলে তাকে জেলের ভাত খেতে হবে।

এদিকে মুরগী ফার্ম এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক কর্মচারী ও স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, ৬ আগস্ট তারা শিশিরকে গ্রেফতার করতে দেখেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র জানান, পুলিশ প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে শিশিরকে হত্যা করেছে। বন্দুকযুদ্ধ প্রচার দিয়ে পুলিশ প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিকল্পিত এই হত্যাকান্ডের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে সরেজমিনে ষষ্টিতলাপাড়ায় যাওয়া হয়। সেখানকার অনেকেই বলেছেন ৬ আগষ্ট রাত আনুমানিক ৮টার দিকে আলমগীর বাবুসহ ৫ জনের একদল সাদা পোশাকের পুলিশ ষষ্টিতলাপাড়ার মন্দিরের পূর্বগলির মুখ থেকে আটক করে।এ সময় জামেরুলসহ আরও দু’জনকে পুলিশ আটক করে দেহ তল্লাশী করে দৌঁড় দিতে নির্দেশ দেয়। এ সময় শিশিরের গলার চেইন, দুটো এনন্ড্রয়েট মোবাইল সেট ও পকেট থেকে টাকার বান্ডিল কেড়ে নিতে দেখেছেন অনেকে। তবে কত টাকা তা তারা বলতে পারেননি। এ সময় বেশ কয়েকজন পুলিশের ছবি দেখানো হলে তারা ডিবির আলমগীর বাবুকে সনাক্ত করে বলেন, এই সেই পুলিশ যে শিশিরকে জাপটে ধরে প্রথমেই চেইন মোবাইল টাকা ছিনিয়ে নেন। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় পাড়ার বেশকিছু নারী-পুরুষ রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়ালে আলমগীর দারোগা কোমর থেকে পিস্তল উচিয়ে গুলি করার হুমকি দেন। কোন নটির ছেলে এগুলে গুলি চালানো হবে, হুংকার দিয়ে সবাইকে ছত্রভঙ্গ করে ইজিবাইকে তুলে মুজিব সড়ক বেয়ে ডিবি অফিসের দিকে নিয়ে যায়।

এই একই অভিযোগ প্রথম থেকে করে আসছেন শিশিরের পরিবারের লোকজন।

শিশিরের মা চায়না রানী ঘোষ জানান, শিশিরকে আটক করার খবর পাওয়ার পরপরই তিনি আরেকটি ইজিবাইকে চেপে পিছু নেন। তিনি দেখতে পান শিশিরকে নিয়ে ইজিবাইকটি পুলিশ লাইন্স ডিবি অফিসে প্রবেশ করে। এ সময় গেট থেকে তাকে ভেতরে ঢুুকতে দেয়া হয়নি।

গেটে দায়িত্বরত পুলিশকে প্রথমে নগদ টাকা দিয়ে ভেতরে গিয়ে শিশিরের সাথে দেখা করানোর প্রস্তাব দেন কিন্তু পুলিশ অপরাকতা প্রকাশ করেন।এক পর্যায়ে শিশিরের মা পুলিশের হাতে-পায়ে জড়িয়ে ধরলে তাকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়, আলমগীর স্যারের বিনানুমতিতে ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। ভেতরে ঢুুকতে দিলে চাকরি থাকবে না বলেও জানিয়ে দেন ওই সময় গেটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য।

এরপর রাত ১২টার দিকে একটি কালো মাইক্রো বের হতে দেখেন শিশিরের মা চায়না ঘোষ। তারপর তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। তিনি কান্নাজড়িত কন্ঠে বলেন, তার ধারণা ওই গাড়ীতে করে শিশিরের লাশ পুলিশ নিয়ে যায় মাহিদিয়ায়। কারণ পরদিন শিশিরকে ক্রসফায়ারে হত্যার খবর পেয়ে স্বজনরা যশোর আড়াইশ বেড হাসপাতাল মর্গে ছুঁটে যান। তারা দেখতে পান মুখোমন্ডল ভুলো এবং কপালে একটি গুলির ছিদ্র, যা মাথার পিছন অংশ ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। এ সময় শরীরের কোথাও কোনো কাদা মাটি ছিল না। তারমানে ডিবি হেফাজতে হত্যার পর মরদেহ মাহিদিয়ায় নিয়ে কপালে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়েছে, এমনটিই মনে করছেন স্বজনরা।

শিশিরের মা এই হত্যাকান্ডের বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করে বলেন, আলমগীর দারোগা প্রায়ই শিশিরের কাছে ৫ লাখ ঘুষ দাবি করে আসছিল। টাকা না দিলে ক্রসে হত্যার হুমকিও দিচ্ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে থানায় জিডি করার উদ্যোগ নিয়েছিলাম কিন্তু শিশির বাধা দিয়েছে। শিশির বলেছিল পুলিশের বিরুদ্ধে জিডি করে বাঁচা যাবে না। যেকারণে জিডি করা হয়নি।

নিহত শিশিরের কাকা সাংবাদিক সুনীল ঘোষ জানান, তিনি স্থানীয় একটি পত্রিকায় সহ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অফিস থেকে বেরিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা সিদ্দিক বেকারীর দক্ষিণপাশে আপেলের দোকানের সামনে থেকে রাত পৌনে ১১টার দিকে ডিবির ওসি মারুফ আহমেদকে তার সরকারি মোবাইল ০১৭১৩-৩৭৪১৭১ নম্বরে ০১৬১১-৬৬৭৯৪৬ থেকে ফোন করেন। এসময় ওসি মারুফ আহমেদ জানান, শিশিরের বিরুদ্ধে কোন পরোয়ানা নেই।কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে আলমগীর সাহেব ধরে এনেছেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এসময় সুনীল ঘোষ মারুফ আহমেদ বলেন, ১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর শিশিরকে কথিত ক্রসফায়ারে বাম পা ও বাম হাত পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। তারপর থেকে নিজ বাড়িতে রেখে গাইড করি। তার এক বছর বয়সের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ করুন জানিয়ে সুনীল ঘোষ তাকে অনুরোধ করেন পঙ্গু শিশিরের উপর যেন কোন রকমের অন্যায় কিছু না হয়। এ সময় মারুফ আহমেদ কিছু হবে না বলে আশ্বস্ত করেন।

অথচ পরদিন কাকডাকা ভোরে লোকমুখে শোনা যায় শিশির বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।খবর পেয়ে তিনিসহ স্বজনরা হাসপাতাল মর্গে ছুটে যান। পরে লাশবাহি এ্যাম্বুলেন্স প্রেসক্লাব যশোরের সামনে রেখে সুনীল ঘোষ আগের রাতের ঘটনা তুলে ধরে সাংবাদিকেদের জানান, শিশিরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন ডিবির এএসআই আলমগীর। আটকের সময় শিশিরের কাছ থেকে একটি স্বর্ণের চেইন, দুটি দামী হাউয়াই কোম্পানীর এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট ও ৮ হাজার টাকা জনসম্মুখ্যে ছিনতাই করেছেন। পরে ডিবি হেফাজতে তাকে মাথায় আঘাত করে হত্যার পর মরদেহের কপালে গুলি ঠুকে বন্দুকযুদ্ধ প্রচার দিচ্ছে পুলিশ। তিনি ছিনতাই ও হত্যা মামলা করবেন বলেও সাংবাদিকদের জানান।

এদিকে ঘটনার পরই ৭ আগস্ট লাইভে সুনীল ঘোষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।একই সাথে তিনি এইও বলেন, হত্যার দায় কোতয়ালীর ওসি মনিরুজ্জামান নিচ্ছেন কিন্তু বাস্তবতা হলো কোতয়ালী পুলিশ শিশিরকে আটক করেনি। ডিবি আটক করে থানায় হস্তান্তরও করেনি।ডিবি অফিসেই শিশিরের মাথায় প্রচন্ড আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সুনীল ঘোষ।

পরদিন ৮ আগস্ট ফের লাইভ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন ও প্রধান বিচারপতির কাছে সুনীল ঘোষ শিশির পরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার দাবি করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*