পদ্মা বহুমুখী সেতুতেও আলসেমির স্পর্শ : করোনাভাইরাসের আতঙ্কও অন্যতম কারণ

--ফাইল ছবি

সকালবেলা অনলাইন ডেস্কঃ

পদ্মা বহুমুখী সেতুতে ইতোমধ্যে ২৪টি স্প্যান বসেছে। তবে অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের মতোই পদ্মা বহুমুখী সেতুও আলসেমির স্পর্শ থেকে মুক্ত হতে পারছে না। গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালে দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি চালুর পরিকল্পনা নিয়ে সরকার দ্রুতগতিতে কাজ চলমান রাখে। কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। যেখানে ১০ বছরে এই সেতু দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষসহ দেশের জনগণ চলাচলের স্বপ্ন দেখছিল কাজ শুরুর সোয়া পাঁচ বছরে সেটার গড় অগ্রগতি মাত্র ৭৭ শতাংশ। এখন করোনা ভাইরাসের একটা আতঙ্কও এই প্রকল্পে দেখা দিয়েছে। চীনের জনবল এই প্রকল্পে কাজ করার কারণে তাতে করোনা ভাইরাসের ছায়া পড়ছে। পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধসে অর্থায়নেও একটা ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। প্রকল্পে চীনের ঠিকাদার কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তাদের আনুমানিক ৯০০ জনবলের মধ্যে ২০০ ছুটিতে আছে। ফলে কাজের কিছুটা ধীরগতি হওয়াই স্বাভাবিক।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বহুল আলোচিত পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হতে এখনো বাকি দেড় বছরের মতো সময়। সেতুর ৪১টি স্প্যানের মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত ২৪টি বসানোর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২৪তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হলো তিন হাজার ৬০০ মিটার। বেলা সোয়া ১টায় ‘৩-এফ’ নামে স্প্যানটি শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তের ৩০ ও ৩১ নম্বর পিলারের ওপর বসানো হয়। ২৩তম স্প্যান বসানোর ৯ দিনের মাথায় ২৪তম স্প্যানটি স্থাপন করা হলো। বাকি আছে ১৭টি। জাজিরা প্রান্তে তিনটি স্প্যানের ওপর বসানো শুরু হয়েছে স্ল্যাব। এরই মধ্যে ৩০০টি স্ল্যাব বসানোও শেষ হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের তথ্যানুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেতুটি করার জন্য ২০০৭ সালের আগস্টে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একনেক থেকে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পিছিয়ে যায় এই সেতু প্রকল্প। গত ২০১১ সালের জানুয়ারিতে একনেক সভায় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা বা ২৯৭ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার ডলার সংশোধিত ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়। পরে দ্বিতীয় দফা সংশোধন করে এর ব্যয় বাড়িয়ে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা করা হয়। এখন নিজস্ব অর্থায়নেই দেশ এই সেতুটির নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করছে। মূল সেতুর কাজ ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর, নদী শাসনের কাজ ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর, জাজিরা অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর, মাওয়া অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ ২০১৪ সালের জানুয়ারি এবং সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি শুরু হয়। জাজিরা অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ, মাওয়া অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণ এবং সার্ভিস এরিয়া-২ এর কাজ যথাসময়ে শেষ হয়েছে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।

সেতু বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর জানান, কংক্রিট ও ইস্পাতের তৈরি দ্বিতল বিশিষ্ট ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার এ সেতুর নদীতে পিলার বা খুঁটি থাকবে ৪২টি। প্রস্থ হবে ৭২ ফুটের চার লেন বিশিষ্ট। দ্বিতল এই সেতুর নিচ দিয়ে চলবে রেলগাড়ি আর ওপর দিয়ে যান ও পণ্যবাহী পরিবহন। পানির স্তর থেকে ৬০ ফুট উঁচু হবে মূল সেতু। সেতু নির্মাণে চার হাজারেরও বেশি-দেশী-বিদেশী জনবল দিনরাত কাজ করছে। ২০১৪ সালের ২৮ জুন চায়না মেজর ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে শুরু হয় ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতুর কাজ। এ প্রকল্পের নির্মাণকাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে নদী শাসনের কাজ করছে চীনের আরেকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। তাদের সাথেও চুক্তি হয় ২০১৪ সালের নভেম্বরে। অন্য দিকে জাজিরা-মাওয়া দুই প্রান্তে টোল প্লাজা, সংযোগ সড়ক, দু’টি থানা, ফায়ার সার্ভিস ও আটটি পুনর্বাসন কেন্দ্র, তিনটি সার্ভিস ইয়ার্ডসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করছে দেশীয় কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এই সেতুর ২৯৪টি পাইলের ওপর ৪২টি পিলার দাঁড়াবে। এই পাইলগুলো ১০৪ মিটার থেকে ১২৮ মিটার মাটির গভীরে বসানো হয়েছে। এর মধ্যে ২২টি পিলারের নিচে সাতটি করে ও ১৮টি পিলারে ছয়টি করে পাইল বসানো হয়েছে। ১ ও ৪২ নং পিলারের নিচে ১৬টি করে পাইল বসানো হয়েছে। সব ক’টি পিলারের নিচে পাইল বসানোর কাজ শেষ হলেও ৩৭টি পিলার পদ্মার বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বাকি ৫টি পিলারের মধ্যে ৮, ১০ ও ১১ নং পিলারের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বাকি ২৬ ও ২৭ নং দু’টি পিলারের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। এ ছাড়াও পদ্মা সেতুতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অপটিক্যাল ফাইবার লাইনসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকবে।

কাজের শুরুতেই নদীর তলদেশের গভীরে নরম মাটির স্তর পাওয়ায় পাইল বসাতে সমস্যা দেখা দেয়। তখন হ্যামার দিয়ে পাইল বসাতে গিয়ে ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৯, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ ও ৩৬ নম্বর পিলারের কাজে জটিলতা দেখা দেয়। পরে বিশেষজ্ঞ এবং প্যানেল অব এক্সপার্টদের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা হয়। এতে সেতু নির্মাণকাজে প্রায় এক বছর সময় বেশি লাগছে। ইতোমধ্যে ২৪টি পিলারের ওপর ২৪টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। প্রস্তুত রয়েছে আরও ১৪টি স্প্যান। আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যান বসানোর কাজ শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সেতু বিভাগের দায়িত্বশীল প্রকৌশলীরা। এ ছাড়াও জাজিরা প্রান্ত থেকে শুরু হয়েছে রোডওয়ে এবং রেলওয়ে স্লাব বসানোর কাজ। ইতোমধ্যে দুই হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্লাবের মধ্যে ৫৭৩টি ও দুই হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্লাবের মধ্যে ২৪৪টি বসানো হয়েছে।

সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে গোটা দেশের যোগাযোগব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হবে। দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে নুতন মাত্রা। শ্রমজীবী বেকার মানুষের কর্মসংস্থানে ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে এলাকায়। সবক্ষেত্রে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে বলে আশা করছে পদ্মাপাড়ের মানুষ। প্রতি দিনই সেতুর অগ্রগতি দেখতে ভিড় করছে মানুষ। তাদের আনন্দের যেন শেষ নেই। এখন অপেক্ষা শুধু স্বপ্ন পূরণের। আর এ সেতুর কাজ শেষ হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে ঢাকাসহ সমগ্র দেশের যোগাযোগ অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে। এতে অর্থনীতির চাকা ঘোরার সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতোমধ্যে পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে সেতুর পার্শ্ববর্তী এলাকায় অনেক দেশীয় নামীদামি কোম্পানির লোকজন জমি ক্রয় করেছেন কলকারখানা নির্মাণের জন্য। এতে দুই পাড়ের জমির দামও বেড়েছে অনেকগুণ।

সেতু নির্মাণে সবমিলিয়ে ব্যয় হবে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল সেতু নির্মাণ হবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে। ২০২১ সালের জুলাই মাসের মধ্যে সেতুর সব কাজ শেষ হবে এবং জুন মাসের মধ্যে যানবাহন চলাচল করতে তা খুলে দেয় হবে বলে জানিয়েছেন সেতু বিভাগ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। তবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজে চীনের একটি বড় ধরনের জনবল জড়িত বিধায় করোনা ভাইরাসের কারণে সেতুর কাজ শেষ হতে একটু দেরি হতে পারে। তবে এটি ২০২২ সাল পার হবে না। আনুমানিক ৯ শ’র মতো জনবল রয়েছে চীনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের। যাদের মধ্যে আনুমানিক ২ শ’র মতো ছুটিতে আছে। সংশ্লিষ্টদের মতে তাদের কাজে বিলম্ব হলে স্বাভাবিকভাবে কিছুটা প্রভাব পড়বেই। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা আশা করছেন সেতু চালু করার।

এ দিকে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে বরাদ্দের অর্থ থেকে কিছু ফেরত দিতে চায় সেতু বিভাগ। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) এই প্রকল্পের বরাদ্দ কমছে এক হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা। কাক্সিক্ষত হারে প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি না হওয়ায় এই বরাদ্দ কমানোর প্রস্তাব সেতু বিভাগ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। এই অর্থবছর এই প্রকল্পটির জন্য পাঁচ হাজার ৩৭০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল। বছরের মাঝপথে এসে এই অর্থ ব্যয় করতে না পারায় সংশোধিত এডিপিতে সেতু বিভাগের এ প্রকল্পে চার হাজার ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। তবে প্রকল্পটি নির্ধারিত মেয়াদেই সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

জাজিরা উপজেলার পূর্ব নাওডোবা ইউনিয়নের পাইনপাড়া হাজী ওসিমুদ্দিন মাদবারকান্দি গ্রামের মোখলেছ মাদবর ও কাজিরহাট এলাকার চুন্নু কাজীসহ অনেকে বলেন, বাপ-দাদার ভিটেমাটি চলে যাওয়ার পরেও যখন পদ্মা সেতুর পিলারের ওপর এক একটি স্প্যান বসে তখন আনন্দে মনটা ভরে ওঠে। ভুলে যাই সব খোয়ানোর যন্ত্রণা। আর মনে হয় মাত্র কয়েকটা দিন যে দিন লঞ্চ, ট্রলার ও স্পিডবোটের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা থেকে আমরা মুক্ত হবো এবং অল্প সময়ে পৌঁছে যেতে পারব ঢাকাসহ দেশের অপর প্রান্তে।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের পরামর্শক ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বিভিন্ন টানাপড়েনের কারণেই কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে। প্রকল্পটি এখন দেশের নিজস্ব টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে। তবে অগ্রগতি এখন দু’টি ঝুঁকির মুখে। রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধসের কারণে অর্থায়ন ঝুঁকি এবং চীনের করোনা ভাইরাসের ঝুঁকি। যেহেতু প্রকল্পের নির্মাণকাজের সাথে যুক্ত চীনের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের জনবল হলো চীনের। ফলে তারা ছুটিতে গেলে তাদের ফিরে আসাও একটা সমস্যা। তিনি বলেন, সরকারের উচিত তাদের নিরাপদ পরীক্ষার মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে এনে কাজে যোগদানের ব্যবস্থা করা। অন্যথায় কাজে কিছুটা হলেও ধীরগতি আসতে পারে।

ড. জাহিদ বলেন, সরকারের উচিত পদ্মা বহুমুখী সেতুর মতো ফাস্টট্রাকের প্রকল্পগুলো যাতে নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া। প্রয়োজনে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তালিকাভুক্ত কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোয় অর্থায়ন বন্ধ রেখে হলেও এসব প্রকল্পে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা। কারণ প্রকল্প বিলম্বিত হলে সময় ও অর্থের অপচয় হবে।

পদ্মা সেতুর সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক মো: শফিকুল ইসলামের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সকালবেলাকে জানান, জানুয়ারি পর্যন্ত কাজের গড় অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ। এখানে মূল সেতুর অগ্রগতি ৮৬ শতাংশ এবং নদী শাসনের অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ। কাজ যেভাবে এগিয়ে চলছে আমরা আশা করছি ২০২১ সালের জুলাই মাসের ৩১ তারিখের মধ্যে সেতুসংশ্লিষ্ট সব কাজ সম্পন্ন করতে পারব।