Tuesday , 9 March 2021

ডাকসু ব্যর্থ!

সকালবেলা শিক্ষা ডেস্কঃ
আনুষ্ঠানিকতাতেই অর্ধকোটি টাকা ব্যয়, সমাধান হয়নি মৌলিক কোনো সমস্যার, দূরত্ব ঘোচেনি ভিপি-জিএসের
প্রায় তিন দশকের আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিতর্কের পর সচল হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নানা সমস্যার ইতি ঘটবে বলে আশা করেছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে আসলেও শিক্ষার্থীদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি ডাকসু! কার্যনির্বাহী কমিটির সম্পাদক ও সদস্যরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কাজ করলেও মৌলিক কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি। সংঘাত, আলোচনা-সমালোচনা নিয়েই সময় কাটছে ডাকসুর।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, নির্বাচনের পূর্বে দলগুলোর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসন, গণরুম-গেস্টরুম প্রথা উচ্ছেদ, অছাত্র-বহিরাগত বিতাড়ন, সন্ধ্যাকালীন বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পরিবহন সমস্যার সমাধান, ক্যান্টিনে খাবারের মান বৃদ্ধি, সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল, ক্যাম্পাসে বাইরের যান চলাচল বন্ধসহ নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এসব প্রতিশ্রুতির কোনোটিই বাস্তবায়ন করতে পারেননি ডাকসু নেতৃবৃন্দ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিপি-জিএসের মধ্যে দূরত্ব, ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ এবং ছাত্রলীগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রতি আকর্ষণ, সমন্বয়হীনতা প্রভৃতি কারণে ডাকসু তার কার্যক্রম সঠিকভাবে চালিয়ে যেতে পারছে না। তবে কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ছাত্র সংসদ না থাকায় ডাকসুর নিয়মতান্ত্রিকতার সঙ্গে সবাই অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। ফলে ভালোভাবে কাজ করতে পারছে না প্রতিনিধিরা।
ছাত্রলীগের অসহযোগিতাকে দায়ী করলেন ভিপি
জানা গেছে, নির্বাচনের পরপরই কিছুটা সমাঝোতায় কাজ শুরু করলেও ক্রমেই দূরত্ব বাড়ে ভিপি-জিএসের। বহিরাগত উচ্ছেদ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ ও সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় গভীরভাবে। সে দূরত্ব ঘোচেনি গত ১১ মাসেও। তবে এমন পরিস্থিতির জন্য ছাত্রলীগের অসহযোগিতাকে দায়ী করছেন ভিপি নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ মুখে সহযোগিতার কথা বললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। কোনো কাজ করার উদ্যোগ নিলেও সেখানে ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বাধা আসে। একাধিকবার জিএস-এজিএসকে গণরুম-গেস্টরুম বন্ধের উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করেছেন তিনি। কিন্তু তারা উদ্যোগ নেননি। উপাচার্যও ছাত্রলীগের সুরেই কথা বলেন।
তবে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে শিক্ষার্থীরা যেসব সুবিধা পায়নি, ডাকসুর কল্যাণে সেসব সুবিধা পেতে শুরু করেছে। এদিকে ডাকসুকে সফল হিসেবে দেখেন এর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সাদ্দাম হোসেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা ডাকসুর প্রথম সফলতা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান করেছে ডাকসু।
বড়ো বাধা ছাত্রলীগ-ছাত্র পরিষদ দ্বন্দ্ব
ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ২৩ জন প্রতিনিধি ও ছাত্র অধিকার পরিষদের দুই জন প্রতিনিধির মধ্যে দ্বন্দ্ব ডাকসুর কার্যক্রমে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে ছাত্রলীগের ২৩ জন ডাকসুর ব্যানারে একটি কর্মসূচি পালন করলে ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক সেখানে থাকেন না। আবার ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক কোনো কর্মসূচি নিলে ছাত্রলীগ এতে থাকে না; বরং বাধা প্রদান করে। দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গেও ডাকসুর কোনো যোগাযোগ বা আলাপ-আলোচনা নেই। ছাত্রলীগ তাদের মতো করে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ডাকসুর নামে।
আনুষ্ঠানিকতায় ব্যয় বেশি
ডাকসু হওয়ার পর থেকে দিবস ও উপলক্ষ্য সম্পর্কিত প্রোগ্রাম হয়েছে বেশি। এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে ব্যয় হয়েছে বেশি। এর বাইরে মৌলিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কোনো কাজ নেই ডাকসুর। ডাকসু থেকে পাওয়া এই কমিটির প্রথম ১০ মাসের হিসেবে দেখা যায়, ১০ মাসে ডাকসুর ব্যয় ৮৭ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ডাকসুর অফিস খরচ বাবদ ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ব্যয় হয়। বাকি ৮৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার মধ্যে ৫০ লাখের চাইতে বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায়।
গণরুম-গেস্টরুম প্রথা চলছেই
নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা ইশতেহারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমস্যা ‘গণরুম’ ‘গেস্টরুম’ প্রথা বন্ধ করার কথা বললেও এখনো তা চালু রয়েছে নতুন আঙ্গিকে। গণরুম হয়েছে ‘বন্ধুরুম’, গেস্টরুম হয়ে উঠেছে ‘মতবিনিময় কক্ষ’। অথচ কার্যক্রম চলে আগের মতোই। শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনাও ঘটছে রীতিমতো। গণরুম সমস্যাকে পুঁজি করে শিক্ষার্থীদের দলীয় প্রোগ্রামে ব্যবহার করা হচ্ছে নিয়মিত।
ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল
ডাকসুতে জয়ী ২৫ জনের ২৩ জনই ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জন্যও স্তিমিত হয়ে পড়েছে ডাকসুর কার্যক্রম। দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে সমন্বিতভাবে কাজ করা অসম্ভব হয়ে ওঠেছে।
ভিপি-জিএস ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন
ছাত্রদের ভোটে নির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী হলে থাকেন না। দুই জনই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাইরে আলাদা বাসা নিয়ে থাকেন। ফলে শিক্ষার্থীদের যেকোনো সমস্যায় তাদের এগিয়ে আসাও সম্ভব হয় না। ছাত্রলীগের হামলা ও নিরাপত্তার শঙ্কায় হলে থাকেন না বলে জানান নুরুল হক নুর। গোলাম রাব্বানী হলে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় হলে থাকতে পারেন না বলে জানান।
কাজে নেই অনেক সম্পাদক ও সদস্য
নির্বাচনের পর থেকে গত ১১ মাসে কোনো কাজে দেখা যায়নি ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটোরিয়া বিষয়ক সম্পাদক লিপি আক্তার, সদস্য নিপো ইসলাম ও সাবরিনা ইতিকে। প্রথম এক মাস মাঠে সক্রিয় থাকলেও পরবর্তীতে বিয়ে করে সংসারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন লিপি আক্তার। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে লিপি জানান, তিনি সপ্তাহে দু’একবার ক্যাম্পাসে আসেন এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কাজ করেন। নিপো ইসলাম জানান, সাহিত্য সম্পাদকের সঙ্গে এক হয়ে তিনি বেশ কিছু কাজ করেছেন। তবে সেগুলোর প্রচার না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা জানতে পারেনি। সাবরিনা ইতি বলেন, কোনো সম্পাদক প্রোগ্রাম করলে সদস্যরা সম্মিলিতভাবে সেখানে অংশগ্রহণ করে থাকে। তবে আমি নিজে কোনো প্রোগ্রাম করিনি।
ভিসির সন্তোষ প্রকাশ
এদিকে ডাকসুর কার্যক্রমে সন্তুষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘ডাকসু বিভিন্নভাবে অনেক কর্মসূচি করছে এবং সেগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততাও দেখা গেছে। এগুলো দেখে খুব ভালো লাগছে। এত অল্প সময়ে তারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা খুবই আশাব্যঞ্জক।’ তবে ডাকসুর কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা ভালো মতামত দিতে পারবেন বলেও মনে করেন উপাচার্য।
প্রসঙ্গত, গত বছরের ১১ মার্চ ডাকসুর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২৩ মার্চ। সে হিসাবে এ মাসেই ডাকসুর মেয়াদ পূর্ণ হবে।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*