ভুতুড়ে মুনাফা নিয়ে শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ ওয়ালটন

--ওয়ালটনের সূচক : সংগৃহীত

সকালবেলা অনলাইন ডেস্কঃ

শেয়ারবাজারে আসার জন্য অপেক্ষমাণ ওয়ালটন হাইটেক পার্কের আর্থিক রিপোর্টে ভুতুড়ে মুনাফার তথ্য মিলেছে। এছাড়া রয়েছে স্ববিরোধী ও সাংঘর্ষিক নানা তথ্য। এর ফলে শুরুতেই কোম্পানিটি বাজারে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

যে কারণে শেয়ারবাজার কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারছে না। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার প্রশ্নে এখানে সরকার তথা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) আরও সক্রিয় ও শক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে।

সূত্র জানায়, কোম্পানির পণ্য উৎপাদন পর্যায়ে ট্যাক্স নেই। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভুতুড়ে মুনাফা বাড়ানো হয়েছে। যে কারণে বিষয়টি নিয়ে এ খাতের বেশ কয়েকজন বিশ্লেষক নানাভাবে প্রশ্ন তুলেছেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, মনে হচ্ছে কোম্পানিটিতে কিছু ঝামেলা রয়েছে। কেননা কাট অব প্রাইজ নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৭৬৫ টাকা অফার এসেছে। বিপরীতে সর্বনিম্ন অফার এসেছে মাত্র ১২ টাকা। এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

এখানে ইস্যু ম্যানেজার ও অডিটররা কী করেছেন তা খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি বলেন, এ ধরনের সন্দেহজনক কোম্পানির ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনকে তাদের পছন্দমতো অডিটর দিয়ে কোম্পানিটিকে পুনঃনিরীক্ষা করানো উচিত।

জানা গেছে, বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে বেশি প্রিমিয়াম পেতে এক বছরেই ওয়ালটন হাইটেক পার্ক আয় বৃদ্ধির অস্বাভাবিক তথ্য তুলে ধরে। যেখানে আগের বছরের চেয়ে ২০১৮-১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ২৯১ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির মোট ৫ হাজার ১৭৭ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হয়েছে।

যার বড় অংশ বিক্রি দেখানো হয়েছে একই গ্রুপের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন প্লাজার কাছে। এসব পণ্য বিক্রির বড় অংশ বাকিতে। এই বাকিতে বিক্রির অর্থই মুনাফা হিসেবে দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে আগ্রাসীভাবে পণ্য বিক্রি দেখানো হলেও বাস্তবে বিক্রির খরচ ওইভাবে বাড়েনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোম্পানিটির এই মুনাফা অলৌকিক এবং আজগুবি।

তাদের মতে, গত কয়েক বছরে শেয়ারবাজারে আসা বিভিন্ন কোম্পানি তাদের আর্থিক রিপোর্টকে এভাবেই ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়েছে। এ কারণে আজ শেয়ারবাজারের এই চরম দুরবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

জানতে চাইলে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের নির্বাহী পরিচালক মো. মহিউদ্দিন আহমদে (এফসিএ) সকলবেলাকে বলেন, এক বছরে হঠাৎ করে কোম্পানির যে মুনাফা দেখানো হয়েছে, তা সন্দেহজনক। বাস্তবে এক বছরে এমন অস্বাভাবিক হারে মুনাফা হওয়ার পরিবেশ বাংলাদেশে আছে কিনা সেটি ভাবা উচিত।

ফলে এই আর্থিক রিপোর্ট সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। তিনি বলেন, সন্দেহের আরও কারণ হল, গত ৫ বছরে যেসব কোম্পানি বাজারে এসেছে, তাদের যে প্রজেকশন ছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন হয়নি। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির রিপোর্টে আগ্রাসী মার্কেটিংয়ের তথ্য এসেছে। কিন্তু মার্কেটিং কস্ট ওইভাবে বাড়েনি। এছাড়া তাদের প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্যও সন্দেহজনক। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির রিপোর্ট পুনঃনিরীক্ষা জরুরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ড. বাকী খলীলী বলেন, ওয়ালটনের আইপিও নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুতর।

এ কারণে এ মুহূর্তে আইপিও স্থগিত করে কোম্পানির আর্থিক রিপোর্ট পুনর্নিরীক্ষা করা জরুরি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক বছরে এ রকম মুনাফা করার সুযোগ নেই। যে কারণে এটি বাজারে আসলে শুধু দীর্ঘমেয়াদের জন্য নয়, স্বল্পমেয়াদেও বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, বিএসইসি চাইলে পুনর্নিরীক্ষা করতে পারে। তবে সেটি বিডিংয়ের আগে করা উচিত ছিল। তাহলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কোনো সন্দেহ থাকত না।

এদিকে উত্থাপিত এসব প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ালটনের হেড অব অ্যাকাউন্স ইয়াকুব আলী গতকাল মঙ্গলবার  বলেন, ২০১৮ সালে দেশে বন্যা হয়েছিল। যে কারণে আমাদের ব্যবসা খারাপ গেছে। কিন্তু ২০১৯ সালে আমরা অটোমেশনে এসেছি। এ ক্ষেত্রে আমরা উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় পুরোটাই ব্যবহার করতে পেরেছি। কোম্পানির সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান তথা ওয়ালটন প্লাজার কাছে বাকিতে পণ্য বিক্রি প্রসঙ্গে তিনি দাবি করে বলেন, ওয়ালটন প্লাজার কাছে যে পণ্য বিক্রি করা হয় তার আংশিক মাত্র বাকি থাকে। এটি অস্বাভাবিক নয়।

শেয়ারবাজারে দেয়া কোম্পানির প্রসপেক্টাসের তথ্য অনুসারে বিস্ময়করভাবে আগের বছরের চেয়ে শুধু ২০১৮-১৯ অর্থবছরেই তাদের মুনাফা ২৯০ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

আলোচ্য সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকা মুনাফা হয়েছে। আগের বছর যা ছিল ৩৫২ কোটি টাকা। অথচ পণ্য বিক্রি বৃদ্ধির হার দেখানো হয়েছে ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ। এর মানে হল- পণ্য বিক্রি কম, কিন্তু মুনাফা অনেক বেশি, যা সাংঘর্ষিক ও অস্বাভাবিক। কিন্তু এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাদের মুনাফা ৫২ শতাংশ এবং টার্নওভার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছিল। অন্যদিকে কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও একই বছরে কোম্পানির ক্যাশ ১০২ কোটি টাকা কমেছে।

শতকরা হিসাবে যা ৯ দশমিক ৭৮ শতাংশ। একই সময়ে কোম্পানির বিক্রি এবং রিসিভাবল আয়ের মধ্যে ১ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা পার্থক্য রয়েছে। এর মানে হল- কোম্পানি বেশিরভাগ পণ্যই বাকিতে বিক্রি করেছে। তাদের বেশিরভাগ পণ্যই ওয়ালটন হাইটেক পার্কের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন প্লাজার কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

কোম্পানিটির আর্থিক রিপোর্টে আরও বলা হয়, গত অর্থবছরে ওয়ালটন প্লাজার কাছে ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি বেড়েছে হাইটেক পার্কের। শতকরা হিসাবে যা ১৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ। একই বছরে ওয়ালটন প্লাজার কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানটির রিসিভাবল অ্যামাউন্ট ছিল ১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। আগের বছর যা ছিল ৪৪০ কোটি টাকা।

কোম্পানির প্রসপেক্টাসে আরও উল্লেখ করা হয়েছে- আলোচ্য বছরে ৫ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা টার্নওভার ছিল প্রতিষ্ঠানটির। আগের বছর যা ছিল ২ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এর মানে- ১২ মাসের ব্যবধানে কোম্পানির টার্নওভার ২ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা বেড়েছে। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১৮-১৯ সালে ৭২ দশমিক ৫২ শতাংশ রিফ্রিজারেটর বিক্রি হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা ১ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা, যা অবিশ্বাস্য।

কোম্পানিটির বিডিংয়ে মূল্য প্রস্তাবেও অস্বাভাবিকতা দেখা গেছে। বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ১০ টাকার শেয়ারে কোনো প্রতিষ্ঠান ১২ টাকা প্রস্তাব করেছে। আর কোনো প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব করেছে ৭৬৫ টাকা। এটি স্বাভাবিক নয়।

আর এই প্রক্রিয়ায় কোম্পানির কাট অফ প্রাইজ নির্ধারিত হয়েছে ৩১৫ টাকা। এ ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মাত্র ২৭ লাখ বা ১ শতাংশ শেয়ার কিনবে। ব্যবসা সম্প্রসারণ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ এবং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের খরচ মেটাতে পুঁজিবাজার থেকে ১০০ কোটি টাকা উত্তোলন করবে ওয়ালটন। তবে প্রিমিয়ামসহ এটি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।