Monday , 28 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » করোনার অজুহাতে ফাঁকিবাজি সরকারি বেসরকারি অফিসে

করোনার অজুহাতে ফাঁকিবাজি সরকারি বেসরকারি অফিসে

টানা সাধারণ ছুটির পর সচিবালয় খুললেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি আটকে আছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে। করোনা মোকাবিলায় সরকার সীমিতসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে অফিস চালানোর সিদ্ধান্ত নিলেও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পুনরায় চাঙ্গা করতে সব গুরুত্বপূর্ণ নথি দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। তবে করোনার অজুহাতে  দায়িত্বশীল পদের অনেক কর্মকর্তা অফিস না করায় জমে থাকা বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানি, বিভিন্ন প্রকল্প ও বাণিজ্যিক নথির কাজ নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড।
সচিবালয়ের বেশির ভাগ দফতরে দেখা গেছে, অমুক বড়কর্তা অফিস করছেন, তমুক বড়কর্তা এতক্ষণ ছিলেন- এইমাত্র চলে গেছেন’ অবস্থা। কোনো কোনো বিভাগে প্রধান কর্মকর্তা থাকলে মধ্যম সারির কর্মকর্তা নেই। আবার কোনো দফতরে মধ্যম সারির কর্মকর্তা থাকলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অনুপস্থিত। ফলে করোনা সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতি চাঙ্গা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেসব দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন সেগুলোও বাস্তবায়ন হচ্ছে না সঠিকভাবে। শুধু সচিবালয় নয়, সচিবালয়ের বাইরে আধা সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত বিভিন্ন সংস্থা ও দফতর, এমন কি বিভিন্ন ধরনের সেবার সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একই পরিস্থিতি।
এদিকে অফিস খোলার একদিন পর জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘২৫ শতাংশ কর্মী অফিসে উপস্থিত থাকবেন। বাকিরা বাড়িতে বসে অনলাইনে কাজ করবেন। কোনো ফাইল আটকানো যাবে না। কারও হাতে নথি আটকে থাকলে তাকে অফিসে আসতে হবে।’ তবে সরকারের সেই নির্দেশ মানছেন না অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী গতকাল বলেন, ‘আরেকজন অফিসার উপস্থিত নেই বলে কাজ ফেলে রাখা যাবে না। তিনজনের কাজ একজনকে করতে হবে। এবং সেই এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। যদি কোনো সরকারি অফিসে জরুরি কাজ করাতে সমস্যা হয় তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা আমাদের মন্ত্রণালয়ে জানান, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে প্রশাসনিক কর্মকান্ড সচল রাখতে সরকার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা সুবিধা (করোনা সংক্রমিত হলে ৫-১০ লাখ টাকা নগদ সুবিধা) ঘোষণা করার পর শোনা যাচ্ছে অনেকেই অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। বিভিন্ন দফতর বা সংস্থায় ২০ থেকে ৪০ জন করে সংক্রমণের খবরের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন খোদ সচিবালয়েরই অনেক কর্মকর্তা। অনেক কর্মী টাকার বিনিময়ে করোনা সংক্রমনের ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে সরকারের দেওয়া আর্থিক সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি অফিস ফাঁকি দিচ্ছেন বলে সন্দেহ তাদের।
এদিকে শিফটিং করে অফিস চালাতে গিয়েও বিভিন্ন কাজে সমন্বয়হীনতা দেখা দিচ্ছে বলে জানান সচিবালয়ের উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা বলেন, এক কর্মকর্তার রেখে যাওয়া নথি অন্য কর্মকর্তারা ধরতে চাইছেন না। ফলে কোনো একটি ফাইল সম্পন্ন করতে আগের কর্মীদের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে এসে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত ফাইলে স্বাক্ষর না হওয়ায় বেশি সমস্যা হচ্ছে। এ ধরনের ফাইলে বিভিন্ন ধরনের কর্মকর্তার স্বাক্ষরের দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজন দিনের পর দিন ঘুরেও সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন না। শুধু তাই নয়, করোনা সংকটে বিপর্যস্ত খাতগুলোকে যেসব নীতি-নির্ধারণী সহায়তা দেওয়া দরকার সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়েও ঢিলেমি চলছে। প্রণোদনার বিষয়গুলো নিয়ে কোনো কোনো মন্ত্রণালয় খাতভিত্তিক উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করছেন, সমাধান মিলছে না। কোনো কোনো সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দেওয়ার। সময়মতো তাও পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি নিয়ম অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ের ১৪ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জেলা থেকে আসা বিস্তারিত তথ্য একসঙ্গে করে আক্রান্ত এলাকার জন্য পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা। অথচ ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাতের ২০ দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করতে পারেনি অধিদফতর।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার অজুহাতে ই-ফাইলিংয়ে জোর দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে কোনো কাজই হচ্ছে না। বাসায় বসে কাজ করার কথা থাকলেও অনেক কর্মকর্তাই সেটা করছেন না। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কর্মকর্তাকে পাঠানো ই-ফাইল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সারা দিনেও অনলাইনে ঢুকে দেখছেন না। ফলে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ফাইল আটকে থাকছে দিনের পর দিন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির চাকা ফের গতিশীল করতে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গতি আরও বৃদ্ধি প্রয়োজন। এই সংকটে প্রশাসনে কর্মচাঞ্চল্য দিয়ে যেখানে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া দরকার, সেখানে সরকারি অফিসগুলোর ঢিলেঢালা অবস্থা উল্টো বেসরকারি খাতের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনে দিনগুলোতে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ মোকাবিলায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে যেখানে বেসরকারি খাতগুলো ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে, অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষ্যে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে-সেখানে সরকারি প্রশাসনের এই স্থবিরতায় সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্যে রাজস্ব আয় ৪০ শতাংশের মতো কমে গেছে বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। দাতাসংস্থাগুলোর আশঙ্কা-জিডিপি প্রবৃদ্ধিও ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ থেকে নেমে আসবে ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, শিল্প উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ায়, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় হ্রাস পাওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৬ শতাংশে নামতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকনোমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে দেশের আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে, সেটি মোকাবিলায় সবার আগে সরকারি দফতরগুলোকে সক্রিয় হতে হবে। কর্মহীনতায় এরই মধ্যে লাখ লাখ লোক বেকার হয়ে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি খাতগুলো যাতে এই বিপর্যয় কাটিয়ে কর্মকান্ড সচল রাখতে পারে সেজন্য যত ধরনের সহায়তা দরকার প্রয়োজনে বাড়ি বাড়ি, প্রতিষ্ঠানে গিয়ে সেটি দিয়ে আসতে হবে সরকারের নীতি-নির্ধারণী সংস্থাগুলোকে। তা না করে, এই সংকটকালে নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রক্রিয়া যদি বিলম্বিত হয়, তবে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়বে দেশ।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!