Monday , 28 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » বিভাগীয় সংবাদ » দেশগ্রাম » কুষ্টিয়া অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রতিবন্ধীতাকে জয় করলেন অনিক মাহমুদ

কুষ্টিয়া অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রতিবন্ধীতাকে জয় করলেন অনিক মাহমুদ

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:
অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে প্রতিবন্ধীতাকে জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়েছেন শারিরীক প্রতিবন্ধী অনিক মাহমুদ (২২)। নিজেকে থামিয়ে রাখতে চান না তিনি, নিয়ে যেতে চান সামনের দিকে এবং পৌঁছাতে চান চূড়ান্ত সাফল্যের শিখরে।
বলছিলাম কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ এলাকার প্রতিবন্ধী অনিক মাহমুদের কথা।জন্মগতভাবেই তার নিজের দুই পা অনেক চিকন ও ছোট। স্বাভাবিক মানুষের থেকে আলাদা ও শারিরীক প্রতিবন্ধী হওয়ায় হুইল চেয়ারেই তার বেড়ে ওঠা। আর হুইল চেয়ারে করেই প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে ইতিমধ্যেই নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন। দক্ষতার সাথে ফ্রিল্যান্সারের মাধ্যমে কাজ করে এখন প্রতিমাসে তিনি আয় করছেন ৭০-৮০ হাজার টাকা। তার প্রতিষ্ঠানে আরও কয়েকজন তরুন বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন।
ফাইভার এবং আপওয়ার্ক-এ কাজ করছেন তিনি।
বর্তমানে শুধুমাত্র টি শার্ট ডিজাইন নিয়ে কাজ করছেন এই তরুন। ফাইভার এ লেভেল-২ সেলার এবং আপওয়ার্ক এ টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার হিসেবে তিনি কাজ করে চলেছেন।
শুরুর গল্পটা নিয়ে অনিক মাহমুদ বলেন, কম্পিউটারের প্রতি অনেক আগ্রহ ছিলো। ২০১২ সালের দিকে বাড়ী থেকে হুইল চেয়ার করে কম্পিউটার শিখতে যেতাম আধা কিলোমিটার দুরে। তারপর বাবাকে অনুরোধ করে পোড়াদহ হাইস্কুল মার্কেটে একটা কম্পিউটার কম্পোজ, প্রিন্ট ও ষ্টেনারীজের দোকান দিলাম। নিজে কিছু একটা করবো এমন সিদ্ধান্ত থেকেই আমরা এগিয়ে যাওয়া শুরু।
২০১৪ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাশের পর পড়ালেখা করা হয়নি এ তরুনের। তবে দোকানে বসেই সবসময় কম্পিউটারে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন তিনি।
এরপর ২০১৮ সালের শুরু থেকে ই শিখনের মাধ্যমে অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইনের উপর তিনমাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। একই সাথে বিভিন্ন ইউিটিউব চ্যানেল থেকে ভিডিও দেখে
ফ্রিল্যান্স্যারের উপর কাজ শুরু করি। পাশাপাশি অনেক বড় বড় ফ্রিল্যান্সারের পরামর্শ নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
এভাবেই আমি প্রতিদিন ১৫-১৮ ঘন্টা পর্যন্ত কম্পিউটারে প্রতিনিয়ত কাজ করেছি।
তারপর ২০১৯ সাল থেকে মোটামুটি কাজ পাওয়া শুরু করেন মার্কেটপ্লেসে। টি-শার্টে ডিজাইন নিয়েই মুলত তার কাজ শুরু। তার প্রথম কাজ পায় আপওয়ার্ক থেকে। সেটা ২৫ ডলারের। আর সর্বোচ্চ একটা প্রজেক্ট থেকে তিন হাজার ডলারের কাজ করতে পেরেছি। এখন আর আমাকে বায়ার খুঁজে পেতে খুব বেশি কষ্ট করতে হয়না? প্রচুর কাজের অর্ডার আমি পেয়ে থাকি। এছাড়াও আমার ভালো লাগে আমার তৈরী ডিজাইনের টি-শার্ট বিদেশীরা পরে থাকে।২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে ফাহিম উল করিম নামের বিছানাবন্দী এক প্রতিবন্ধীকে দেখে আমি প্রেরণা পায়। সে যদি বিছানায় থেকে সফলতা লাভ করতে পারে তবে আমি কেন হুইল চেয়ারে বসে পারবো না?তিনি বলেন, আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়া স্বত্ত্বেও আমার বাবা-মায়ের সহযোগীতায় আমি আজ এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি।
তিনি বলেন, আমি যেখানে বসবাস করি সেটা অনেকটাই গ্রামাঞ্চল! যেখানে ২ বছর আগেও ভালোভাবে ইন্টারনেট সেবা সবার নাগালের মধ্যে ছিল না। তাই কাজ শিখতে গিয়ে অনেকটাই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে আমাকে।তিনি বলেন, আমার অদম্য ইচ্ছেশক্তি ছিলো তাই আমি পেরেছি। আমার ইচ্ছে ছিল আমার জীবনে এমন কিছু একটা করবো, যেখানে আমার কারও কাছে কাজের জন্য যাওয়া লাগবে না বরং আমি আমার প্রতিষ্ঠানে কিছু তরুণদের চাকরী দিবো।
সেক্ষেত্রে অনেকটাই এখন সফল আমি। আর এই দৃঢ় মনোবল আর ইচ্ছাশক্তির কারণেই হয়তো আজ আমি সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি।ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অনিক বলেন, বড় একটা আইটি ফার্ম গড়ে আগামীতে আরও তরুণ ও বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবো এটাই আমার স্বপ্ন। পাশাপাশি তিনি এখন তিন চাকা বিশিষ্ট মোটরসাইকেল চালান। কিন্তু ভারতে শারিরীক প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন প্রাইভেট গাড়ী চালানো হয়। আমিই প্রথম বাংলাদেমী হিসেবে তেমন প্রাইভেট গাড়ী চালানোর স্বপ্নে বিভোর।অনিক মাহমুদ জানান, ফ্রিল্যান্সার হতে হলে প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। এ কারণে অনেক তরুণ কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না।তাই কখনোই ভেঙে পড়া যাবে না। আমি কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবি না, অন্য মানুষের মতোই নিজেকে মনে করি। আর কাজ করে যায় নিজের স্বপ্নপূরনে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিজেকে প্রতিনিয়ত আপডেট রাখাও জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তাই এখনোও নতুন নতুন কিছুর সাথে সম্পৃক্ত হই।তার পিতা মোঃ মোজাহার আলী। তিনি হালসা আদর্শ ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক। দুই ভাইয়ের মধ্যে অনিক ছোট। বড় ভাই টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ঢাকায় একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। তিনি বলেন, আমার দুই ছেলের মধ্যে এই ছোট ছেলেকে নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় ছিলাম। কিন্ত এখন আমি আমার এই প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য গর্ব করি। সবাই এখন অনিকের বাবা বলেই আমাকে চেনেন।মিরপুর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার জামসেদ আলী বলেন, কিছুদিন আগে তাকে স্মার্ট কার্ড (প্রতিবন্ধী ব্যাক্তির পরিচয়াপত্র) দিতে গিয়ে তার সম্পর্কে জানতে পেরেছি। তিনি প্রতিবন্ধীদের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে আজ সফল ফ্রিল্যান্সার হয়ে কাজ করছেন অনিক। বেশ ভালো আয় করছেন তার দেখাদেখি করে আরও মানুষ এগিয়ে আসুক এমনটাই কামনা করেন তিনি।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!