Tuesday , 29 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » রাজধানী » পূর্ব রাজাবাজারের পরীক্ষামূলক ’লকডাউন’ কার্যকর ফল দিচ্ছে

পূর্ব রাজাবাজারের পরীক্ষামূলক ’লকডাউন’ কার্যকর ফল দিচ্ছে

অনলাইন ডেস্ক:
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ৯ জুন মধ্যরাত থেকে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার এলাকায় পরীক্ষামূলক লকডাউন চলছে। লকডাউন শুরুর সময় ওই এলাকায় ৩১ জন করোনা রোগী ছিলেন। গত ২৩ জুন পর্যন্ত ১৪ দিনে উপসর্গ থাকা আরও ২০৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে ৪০ জনের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। বাকিদের ফল নেগেটিভ এসেছে। আক্রান্ত ওই ৪০ জনের বেশিরভাগই লকডাউনের শুরুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কর্মকর্তারা। কার্যকর ফল পাওয়ায় এখানে লকডাউনের মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। জানতে চাইলে আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, লকডাউনের নির্ধারিত তিন সপ্তাহ না যাওয়া পর্যন্ত এর কার্যকারিতা সম্পর্কে বলা যাবে না।
কারণ অনেকে লকডাউন শুরুর আগে থেকে সংক্রমিত হলেও শনাক্ত হননি। পরে তাদের শনাক্ত করা হয়েছে। আক্রান্তদের সুস্থ হয়ে উঠতে তিন সপ্তাহের মতো লেগে যাবে। এই সময়ের পর কী পরিমাণ আক্রান্ত হন, সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং ২১ দিনের আগে সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। তবে গত কয়েকদিনের সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বলা যায়, লকডাউনের কারণে সংক্রমণের নিম্নমুখী গতি দেখা যাচ্ছে। এতে ভালো ফল মিলছে বলে আশাবাদী তিনি।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এএসএম আলমগীর বলেন, লকডাউনের প্রথম সপ্তাহে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে ১৯ শতাংশের মতো আক্রান্তের হার পাওয়া গিয়েছিল। শেষ পাঁচ দিনে তা ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ আক্রান্তের হার শুরুর তুলনায় শেষের দিকে কমে আসছে, যা আশাব্যঞ্জক। এর মাধ্যমে পরীক্ষামূলক এই লকডাউনের কার্যকারিতা পাওয়া যাচ্ছে। চলতি সপ্তাহে ২১ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর এই এলাকা সম্পর্কে পুরোপুরি একটি ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
আইইডিসিআরের এই দুই শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যে দেখা যায়, রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারে পরীক্ষামূলক লকডাউন কার্যকর ফল দিচ্ছে। তাই পূর্ব রাজাবাজারকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করে রাজধানীর ৪৫ এলাকাসহ রেড জোনে থাকা সারাদেশের প্রতিটি এলাকায় দ্রুত লকডাউন দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, পূর্ব রাজাবাজারে লকডাউনের মাধ্যমে সফলতা পাওয়া গেলে, এটিকে মডেলে হিসেবে ধরে সারাদেশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত এ কার্যক্রম শুরু করা প্রয়োজন। করোনার সংক্রমণ যেভাবে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে সংক্রমিত এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত লকডাউনের সিদ্ধান্ত না নিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।
লকডাউন করা এলাকা :জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক তিনটি আদেশে দেশের ২১ জেলার রেড জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। আদেশে রেড জোনের এলাকাগুলোতে লকডাউন দেওয়ার দিন থেকে পরবর্তী ২১ দিন পর্যন্ত সাধারণ ছুটি কার্যকর থাকবে বলে জানানো হয়। গত ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দেশের ১০ জেলার রেড জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে আদেশ জারি করে। ওই আদেশে নারায়ণগঞ্জে ১১ জুন, চট্টগ্রামে, চুয়াডাঙ্গা, মুন্সীগঞ্জ ও মাদারীপুরে ১৭ জুন, যশোরে ১৫ জুন, কুমিল্লায় ১৬ জুন, বগুড়া ও মৌলভীবাজারে ১৪ জুন এবং হবিগঞ্জের রেড জোনে ১৮ জুন থেকে লকডাউন দেওয়ার কথা বলা হয়। ২২ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অন্য এক আদেশে আরও পাঁচ জেলার রেড জোন এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। ওই আদেশে নরসিংদী ১১ জুন, মানিকগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১৩ জুন, কুষ্টিয়া ও ফরিদপুরে ১৬ জুন থেকে লকডাউন দেওয়ার কথা বলা হয়। ২৩ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেকটি আদেশে আরও চার জেলার রেড জোনে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। আদেশে হবিগঞ্জ ১৮ জুন, কক্সবাজারে ২০ জুন, মাগুরায় ২১ জুন এবং খুলনায় ২২ জন থেকে লকডাউন দেওয়া হয়।
রাজধানীতে জোন ম্যাপিং সমস্যা :ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মোট ৪৫টি এলাকাকে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির ১৭ এবং দক্ষিণ সিটির ২৮টি এলাকা আছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটির যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মুগদা, গেন্ডারিয়া, ধানমন্ডি, জিগাতলা, লালবাগ, আজিমপুর, বাসাবো, শান্তিনগর, পল্টন, কলাবাগান, রমনা, সূত্রাপুর, মালিবাগ, কোতোয়ালি, টিকাটুলী, মিটফোর্ড, শাহজাহানপুর, মতিঝিল, ওয়ারী, খিলগাঁও, পরীবাগ, কদমতলী, সিদ্ধেশ্বরী, লক্ষ্মীবাজার, এলিফ্যান্ট রোড ও সেগুনবাগিচা এবং উত্তর সিটি করপোরেশনের গুলশান, বাড্ডা, ক্যান্টনমেন্ট, মহাখালী, তেজগাঁও, রামপুরা, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, গুলশান, মগবাজার, এয়ারপোর্ট, বনশ্রী, রাজাবাজার, উত্তরা ও মিরপুর এলাকার নাম রয়েছে।
তবে রাজধানীর এই ৪৫ এলাকায় লকডাউন নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ঢাকার দুই সিটি মেয়র জোন ম্যাপিং করা ছাড়া পুরো এলাকায় লকডাউন দেওয়ার বিপক্ষে মত দেন। তারা বলেছেন, একেকটি বড় এলাকাকে রেড জোন হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু সেই এলাকার সর্বত্র সংক্রমণের মাত্রা এক রকম নয়। উচ্চ সংক্রমিত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দেওয়া ছাড়া লকডাউন দেওয়া সম্ভব নয় বলে মত দেন দুই মেয়র।
এরপর জোন ম্যাপিং কার্যক্রম শুরু করতে গিয়ে বেকায়দায় পড়ে যান স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা দেখতে পান যে, আক্রান্ত অনেককে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনেকের মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কয়েক হাজার ব্যক্তির ঠিকানার ঘরে শুধু ঢাকা লেখা রয়েছে। এ অবস্থায় মোবাইল ট্র্যাকিং করে অ্যাপসের মাধ্যমে আক্রান্তদের শনাক্তের চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু ওই অ্যাপসের মাধ্যমে কার্যকর ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অ্যানালগ পদ্ধতিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। এতে জোন ম্যাপিং নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, জোন ম্যাপিংয়ের কার্যক্রমটি তারা প্রায় শেষ করে আনলেও চূড়ান্ত হয়নি। প্রতিদিনই বিষয়টি নিয়ে বৈঠক করা হয়। কিন্তু এখনও সমাধানে পৌঁছানো যায়নি। তবে বাস্তবে জোন ম্যাপিং করে লকডাউন কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানান তিনি।
দ্রুত কার্যকর করার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের: রাজধানী ঢাকাসহ অধিক ঝুঁকিপূর্ণ চিহ্নিত রেড জোনে দ্রুততম সময়ে কার্যক্রম শুরুর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম  বলেন, সারাদেশে সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি ঢাকায়। অথচ সেই ঢাকার রেড জোনগুলোতে এখনও লকডাউন কার্যক্রম শুরু করতে না পারা উদ্বেগজনক। জোন ম্যাপিং নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা যা বলছেন, তা অগ্রহণযোগ্য। তাদের বক্তব্য প্রমাণ করে, করোনা পরিস্থিতিতে তারা দায়সারা কাজ করেছেন। যে কারণে এখন তথ্য-উপাত্ত মেলাতে পারছেন না। এই চরম অবহেলার দায় কে নেবে? এটি তাদেরই ঠিক করতে হবে। দ্রুততম সময়ে কার্যক্রমটি শুরু হোক, এটি সবাই চায়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সরকারকে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জোনভিত্তিক কার্যক্রম ঘোষণার ২৬ দিন পরও সর্বোচ্চ সংক্রমিত রাজধানীর রেড জোনে লকডাউন দিতে না পারার বিষয়টি চরম ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছু নয়। এই কার্যক্রমের সঙ্গে যারা যুক্ত ছিলেন, তারা এতদিন আসলে কী করেছেন, তা জানতে চাওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অবহেলা অবশ্যই খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ তাদের অবহেলায় লাখ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সুতরাং কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই মাহবুব বলেন, করোনার সংক্রমণ তো জোন ম্যাপিংয়ের জন্য বসে থাকেনি। প্রতিদিনই সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়েছে; কিন্তু লকডাউন হয়নি। শুধু মিটিং আর মিটিং হয়। কাজের কাজ তো হচ্ছে না। তাহলে এই মিটিং করে লাভ কী? দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় আরও খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশের কয়েকটি জেলায় জোনভিত্তিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে চালু হয়েছে। রাজধানীতে জোন ম্যাপিং কার্যক্রম চালুর জন্য প্রতিদিনই সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠক করছেন। প্রক্রিয়াটি অনেক দূর এগিয়েছে। রাজধানীর ক্ষেত্রে লকডাউন নিয়ে অনেক কিছু ভাবতে হচ্ছে। কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও চালু রাখতে হবে। আবার লকডাউনও দিতে হবে। সুতরাং এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর পদ্ধতি বের করে রেড জোনে কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে জানান তিনি।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!