করোনার ধাক্কায় মহাসংকটে যাত্রাশিল্প

কাজ নেই যাত্রাশিল্পীদের। তাই অনেকেই ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।

দেশের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাশিল্প যাত্রাকে বেশ কয়েক বছর ধরেই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অতীতে এই শিল্পের যে বিত্তবৈভব ছিল, তা এখন ম্রিয়মাণ। মঞ্চে মেকআপ করা রঙিন মানুষগুলোর অবস্থা বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত। তার ওপর করোনা যেন মহাসংকটে ফেলেছে এ অঙ্গনের মানুষদের। এ পেশায় টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেটাই ভাবছেন যাত্রার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা।

এই সময়ে করোনার কারণে একেবারেই ক্ষতির মুখে পড়বে এ শিল্প। এটা পুষিয়ে ওঠা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত যাত্রাসংশ্লিষ্টজনেরা। করোনার এ ধাক্কায় একেবারেই তাঁদের সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি রয়েছে।

দেশের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাশিল্প যাত্রাকে বেশ কয়েক বছর ধরেই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অতীতে এই শিল্পের যে বিত্তবৈভব ছিল, তা এখন ম্রিয়মাণ। মঞ্চে মেকআপ করা রঙিন মানুষগুলোর অবস্থা বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত। তার ওপর করোনা যেন মহাসংকটে ফেলেছে এ অঙ্গনের মানুষদের। এ পেশায় টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেটাই ভাবছেন যাত্রার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা।

এই সময়ে করোনার কারণে একেবারেই ক্ষতির মুখে পড়বে এ শিল্প। এটা পুষিয়ে ওঠা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত যাত্রাসংশ্লিষ্টজনেরা। করোনার এ ধাক্কায় একেবারেই তাঁদের সব কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি রয়েছে।

‘গ্রাম বাংলা নাট্য সংস্থা’র নির্মাতা ও মালিক আমজাদ হোসেন মনে করেন, দেশে যাত্রাশিল্পের দর্শক কমে যাওয়ায় এ শিল্পের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে শোচনীয়। এখন করোনার কারণে ধুঁকতে থাকা এ শিল্প একেবারেই বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। তিনি বলেন, ‘যাত্রাশিল্পের এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে শোচনীয় অবস্থা, এর মধ্যে আবার কিছু অসাধু মানুষ যাত্রার নামে অশ্লীল নৃত্য দেখিয়ে ভালো শিল্পীদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারপরও আমরা এখনো পালাগুলো দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে হাল ছেড়ে দিতে হবে। কবে করোনা ভালো হবে, কবে মানুষের সমাগম হবে, কবে যাত্রা করার অনুমতি পাব, এগুলো নিয়ে বড় চিন্তায় আছি।’

একটি যাত্রাদলে যন্ত্রশিল্পী, মেকআপম্যান, অভিনয়শিল্পী মিলে প্রায় ৪০ জন, কোনো কোনো দলে তারও বেশি মানুষ কাজ করেন। তাঁদের প্রায় সবাই এই যাত্রার ওপরই নির্ভরশীল। করোনায় গত ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা সবাই বেকার। করোনা ভালো হওয়ার লক্ষণ না দেখে কিছু যাত্রাশিল্পী পেশা বদল করেছেন। আবার কেউ কেউ সুদিনের আশায় অপেক্ষা করছেন। সত্য নারায়ণ অপেরা, সূর্য মহল অপেরা, মধুমিতা অপেরাসহ দেশের প্রায় ১৫টি যাত্রাদলে অভিনয় করে সংসার চালাতেন আবু বকর কাজী। চার মাস ধরে তাঁর আয় একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবার নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটানোর কথা জানালেন তিনি। যাত্রার এই অভিনেতা বলেন, ‘কর্ম না থাকলে যা হয়। খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে। মেয়ে অসুস্থ। চিকিৎসা করাতে পারছি না। খোঁজ নিচ্ছি, কিন্তু কাজের খবর মিলছে না। অভিনয় ছাড়া অন্য কিছু আমার পক্ষে সম্ভবও নয়। এখন কীভাবে চলব, কোনো উপায়ই দেখছি না। খেয়েপরে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

মধুমিতা অপেরার এক অভিনেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিন তিনি সবজির ব্যবসা করলেও এখন রিকশা চালিয়ে আয় করে কোনোরকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন।

আগে নিয়মিত অনুশীলনে মুখর থাকত শিমুল অপেরার টিনের ঘরটি। দিনরাত কাটত যাত্রার অনুশীলনে। এই ঘরে রাখা যাত্রার পোশাক, ঢোল-তবলায় জমতে শুরু করেছে ধুলাবালু। এই অপেরার মালিক ও প্রধান চরিত্রের অভিনেতা শিমুল উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের মানিকগঞ্জ জেলাসহ দেশের যে মানুষেরা এ পেশার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের প্রায় ৯৯ ভাগই ভালো নেই। ধারদেনায় আমরা জর্জরিত। সরকার আমাদের সহযোগিতা না করলে হয়তো এই পেশাতেই আর থাকতে পারব না।’

যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি মিলন কান্তি দে জানান, কয়েক বছর ধরে যাত্রাশিল্প খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে তার অস্তিত্ব একেবারে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে গেছে। আগে থেকেই বিপর্যস্ত এ শিল্পকে এখন একেবারে পঙ্গু করে দিয়েছে করোনা। নাটক-চলচ্চিত্র সব মাধ্যমে ক্ষতি হচ্ছে, কিন্তু বিকল্প হিসেবে তাঁরা ফেসবুক, অনলাইনে লাইভ করছেন। অনেকে শুটিং করছেন। কিন্তু যাত্রাশিল্পীদের সেই সুযোগ নেই। কীভাবে হাজার হাজার যাত্রাশিল্পী চলছেন নাগরিক জীবনে, এটার কেউ খোঁজখবর রাখে না। তাঁদের জন্য প্রণোদনা হয়েছে সেটা খুবই মুষ্টিমেয়, ১০০ জনের কম শিল্পী এ প্রণোদনা পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। এটাকে বাঁচানোর জন্য নীতিনির্ধারকদের পরিকল্পনা দরকার।