নতুন করোনাভাইরাস পুরো বিশ্বকেই বদলে দিচ্ছে। সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে সঙ্গে এই ভাইরাস বদলে দিচ্ছে বিশ্ব রাজনীতিকে। পৃথিবীর নেতৃত্বের ব্যাটন কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে দোলাচল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর শুরু হয়েছিল দ্বিমেরু বিশিষ্ট বিশ্ব রাজনীতি। একদিকে ছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র। সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে এককেন্দ্রিক করে তোলে। সেই বৃত্তের কেন্দ্রে ছিল শুধুই যুক্তরাষ্ট্র। গত কয়েক বছরে সেই বৃত্তে আলাদা প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছে চীন ও রাশিয়া। ওদিকে জাতিসংঘ ক্রমেই খেলনা পুতুলে পরিণত হচ্ছে। দিন দিন শক্তি ও প্রভাব হারাচ্ছে সংস্থাটি। আবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থাও সুবিধের নয়। সব মিলিয়ে নতুন করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে সমগ্র বিশ্বে একটি ওলট-পালট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।  করোনাভাইরাসের কারণে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আক্রান্ত ও প্রাণহানি তো আছেই, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নানা কাণ্ডকীর্তি। একবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে ধুয়ে ফেলছেন, তো আরেকবার বলছেন ঘরে বসে অননুমোদিত ওষুধ খেতে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মহামারিকালীন পরিস্থিতিতে বিশ্বের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র কোনো কার্যকর ভূমিকাই রাখতে পারেনি। নিন্দুকেরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ‘পাগলামি’র কুপ্রভাব বেশি। তাঁর কারণেই দিশা হারিয়ে ফেলেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে দেশটি এখনো নতুন করোনাভাইরাসকে ‘উহান ভাইরাস’ সাব্যস্ত করতেই উঠেপড়ে লেগে আছে।

ওদিকে চীন কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। করোনাভাইরাসের প্রাথমিক ধাক্কা পুরোটাই চীন সামাল দিয়েছে। যদিও দেশটি যেভাবে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে, তার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ আছে। চীনের দেওয়া তথ্যের (আক্রান্ত ও প্রাণহানি সম্পর্কিত) সত্যতা নিয়েও সন্দিহান মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে তার পরও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীন করোনা পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। বিশেষ করে, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার পর চীন যেভাবে বিভিন্ন দেশের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, তার প্রশংসা হচ্ছে। আর এই জায়গাতেই যুক্তরাষ্ট্রের দোষারোপের খেলা থেকে নিজেদের আলাদা করে তুলেছে সি চিন পিংয়ের দেশ।

ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া করোনাভাইরাসে বেশ ভুগছে বলেই খবর পাওয়া যাচ্ছে। তবে চীনের মতোই এ সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য রাশিয়া প্রকাশ করছে না। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যতটুকু খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে রাশিয়ার অবস্থা নাজুক বলেই জানা যাচ্ছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে রাশিয়া নিজেদের একেবারেই গুটিয়ে নিয়েছে।

বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। চলতি বছরের অ্যাডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারে দেখা গেছে, এখনো অনেক মানুষ তার দেশের সরকারের তুলনায় জাতিসংঘে বেশি আস্থা রাখে। পিউ রিসার্চ গত বছর ৩২টি দেশের ওপর একটি জরিপ চালিয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল, ৬১ শতাংশ অংশগ্রহণকারী জাতিসংঘকে সমর্থন করে থাকে। কিন্তু বৈশ্বিক সংস্থাটি করোনা পরিস্থিতিতে আস্থার প্রতিদান দেওয়ার সেই সুযোগ হারিয়েছে।

বিশ্বযুদ্ধকালে মূলত যুদ্ধ থামানো ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই জাতিসংঘ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংস্থাটিতে জারি আছে কিছু রাষ্ট্রের খবরদারি। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর হচ্ছে এ বছর। কিন্তু এত দিনেও নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদেরও অন্য কোনো দেশ পাত্তা পায়নি। ফলে জাপান, কানাডা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, জার্মানি, ইন্দোনেশিয়া বা আফ্রিকা মহাদেশের কোনো দেশের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়া সম্ভব হয়নি। আর মহামূল্যবান ভেটো ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আগের পরাশক্তিরাই ছড়ি ঘুরিয়েছে বিশ্বব্যাপী। অথচ ছড়িটি থাকার কথা ছিল জাতিসংঘের হাতে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে জাতিসংঘের মতো আরও কিছু সংস্থা গুরুত্ব হারাচ্ছে। এ তালিকায় আছে ডব্লিউটিও, ন্যাটো বা এনপিটির মতো সংস্থা। কারণ ট্রাম্পের বিভিন্ন কার্যকলাপে এসব নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে বারংবার প্রশ্ন তুলে যাচ্ছেন ট্রাম্প। আবার ডব্লিউটিও-কে পাশ কাটানোর ঘটনা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে এসব সংস্থার প্রভাব খুব সীমিত হয়ে পড়ছে। এবং এ কারণে পুরো পৃথিবীতে নেতৃত্বের সংকট তৈরি হচ্ছে।

ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কর্মকাণ্ডের সুযোগে চীন নিজের আখের গুছিয়ে নেওয়া শুরু করেছে। ২০০০ সালে জাতিসংঘের মোট বাজেটের মাত্র ১ শতাংশের জোগান দিত চীন। কিন্তু এখন তা দাঁড়িয়েছে ১২ শতাংশে। জাতিসংঘের ১৫টি বিশেষায়িত এজেন্সির ৪টির প্রধানের পদ এখন চীনের দখলে। যুক্তরাষ্ট্রের দখলে আছে মাত্র একটি। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এভাবে বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে চীন। একই সঙ্গে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক, ব্রিকস, বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ প্রভৃতির মাধ্যমে আঞ্চলিক রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করছে চীন। অথচ একসময় মার্শাল প্ল্যানের আওতায় এসব করত যুক্তরাষ্ট্র।

চিন্তক প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি (সিএনএএস) গত বছর দেওয়া এক প্রতিবেদনে বলেছে, চীন পুরো পৃথিবীকে একনায়কতন্ত্রের জন্য নিরাপদ করে তুলছে। এ ক্ষেত্রে অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র খুব অল্পই মনোযোগ দিয়েছে। এখন আর বাড়তি মনোযোগ দিয়েও চীনকে আর ঠেকানো যাচ্ছে না। গত জানুয়ারিতেই বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থায় ক্রমবর্ধমান চীনা প্রভাব কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট বিশেষ দূত নিয়োগ দিয়েছিল। বলা হচ্ছে, এর ফলেই গত মার্চে জাতিসংঘের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশনের প্রধানের পদ বাগাতে উদগ্র চীনের প্রচেষ্টা থামাতে পেরেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, আর বেশি দিন চীনকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চাদপসরণ, অন্যদিকে চীনের উত্থান এবং আরেক দিকে জাতিসংঘের ক্রমহ্রাসমান প্রভাব— এই তিন পরিস্থিতিতে মধ্যশক্তির দেশগুলো নিজেদের মধ্যে জোট গঠন করা শুরু করেছে। এই মধ্যশক্তির দেশগুলো চীনের ক্ষমতার সম্প্রসারণ নিয়েও ওয়াকিবহাল। যেমন ফ্রান্স ও জার্মানি এরই মধ্যে নিজেদের মধ্যে একটি জোট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যা কিনা অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্যও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এতে জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো দেশগুলোর যুক্ত হওয়ার কথা চলছে। আবার, ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ থেকে ট্রাম্প বের হয়ে যাওয়ার পর ওই চুক্তির আওতায় থাকা অন্য দেশগুলো নিজেদের মতো করে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। ডব্লিউটিওর সহায়তা নেওয়ার বদলে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তি করছে এসব মধ্যশক্তির দেশ। উদাহরণ হিসেবে জাপানের কথা বলা যায়। শিনজো আবের দেশ এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার ২৮টি দেশের সঙ্গে পৃথক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করে ফেলেছে। অন্য দেশগুলোও সেই পথেই এগোচ্ছে।

এর ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটি বহু মেরুবিশিষ্ট পৃথিবী গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সামনের বিশ্ব কেমন হবে, তা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি এমন একটি বিশ্ব গঠনের চিত্রপট আঁকছে, যেখানে চাইলে ক্ষমতার একাধিক বলয় তৈরি হতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, একমাত্র তখনই একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে, যেখানে সংঘাতের পরিমাণ কমে আসতে পারে। চাইলে জাতিসংঘও তাতে নেতৃত্ব দিতে পারে। যদিও চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতবিরোধ তা হতে দেবে কি না, বলা মুশকিল। সে ক্ষেত্রে এক বা দুই চরম শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাত থেকে ছড়ি ঘোরানোর ক্ষমতা কেড়ে নিতে হবে মধ্যশক্তির দেশগুলোর একাধিক জোটকে। করোনা বিশ্বের নেতৃত্ব শেষতক কার হাতে তুলে দেবে—সময়েই মিলবে তার উত্তর।