Tuesday , 29 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » আবারও তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মহাপরিচালক
আবারও তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মহাপরিচালক

আবারও তোপের মুখে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মহাপরিচালক

অনলাইন ডেস্ক:
আবারও তোপের মুখে পড়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর সঠিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ কিংবা নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার অভিযোগ জোরালো হয়ে ওঠে গোড়া থেকেই। সেই সঙ্গে যুক্ত হয় চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) সংকট এবং তা কেনাকাটা নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় বহু রকমের ঘাটতি ও রোগীদের ভোগান্তির কারণে চিকিৎসা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বিভিন্ন মহলের তোপের মুখে পড়ে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সর্বশেষ যোগ হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে অনুমতি দেওয়া দুটি প্রতিষ্ঠানের ভুয়া পরীক্ষা বা পরীক্ষা না করেই কভিড-১৯ সনদ দেওয়া এবং বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা।
বহুল আলোচিত রিজেন্ট গ্রুপের দুটি হাসপাতালে র‌্যাবের অভিযানের মধ্য দিয়ে আবারও ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ভূমিকা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করার সুযোগ করে দেওয়া, অপকর্মে প্রশ্রয় দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার জন্য সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞদের তোপের মুখে পড়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। এ ধরনের ঘটনার জন্য তাঁদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা ব্যর্থতাকেই দায়ী করা হচ্ছে।
জাতীয় জনস্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি ও বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব  বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে দুর্বৃত্তায়ন এখন চরম আকার ধারণ করেছে। কিছুতেই যেন তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মন্ত্রী কিংবা মহাপরিচালক তাঁরা এ ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এমন পরিস্থিতি আমরা কোনোভাবেই আশা করি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘সমাজের দুর্বৃত্ত মানুষগুলো বরাবরই রাষ্ট্রের যেকোনো সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্যোগ-দুর্বিপাকের অপেক্ষায় ঘাপটি মেরে থাকে, যারা এই দুর্যোগের সময়টাকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দুর্বৃত্তায়নের জন্য কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেয়। এ ক্ষেত্রে পুরো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের কাছে থাকে তাদেরও এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করা দরকার। এবার করোনাভাইরাস মোকাবেলায় শুরু থেকেই একটি দুর্বৃত্তচক্র সক্রিয় হয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘাড়ে ভর করেছে। সেই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের পুরনো দুর্বৃত্তচক্রগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে ঢুকে পড়েছে এ খাতের নানা পর্যায়ে। সাহেদদের মতো প্রতারক-বাটপাররাও এই সুযোগ নিয়েই ঢুকে পড়েছে স্বাস্থ্য খাতে। যারা তাদের জায়গা করে দিয়েছে তারা এর দায় এড়াতে পারে না।’
বিএমএর মহাসচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, ‘আমাদের কাছে পুরো বিষয়টি রহস্যজনক মনে হচ্ছে। নিজেরাই খুব লজ্জিত হচ্ছি। স্বাস্থ্য খাতে যেভাবে একের পর এক অপকর্মের ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে, তাতে শুধু স্বাস্থ্য খাতেরই নয়, সরকারেরও প্রচণ্ড রকম ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তাঁদের দায়িত্বহীনতা ও ব্যর্থতার মাসুল দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে সরকারকে। তাঁরা যেমন স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারছেন না বরং নিজেরাও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন বলে মানুষের মনে সন্দেহ জাগছে, তেমনি তাঁরা করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারছেন না। বরং নানামুখী বিশৃঙ্খলা চলছেই।’ এর নেপথ্যে কী আছে সেই বিষয়গুলো সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে খুঁজে দেখা দরকার বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ রিজেন্ট হাসপাতালসহ আরেকটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার বিষয়ে বলেন, ‘মোহাম্মদ সাহেদ বা রিজেন্ট হাসপাতাল একাধারে রোগী ও সাধারণ মানুষসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলেই আমরা তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনকে অবহিত করেছি। আকস্মিক অভিযান এরই ফল।’ তিনি বলেন, ‘সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মোহাম্মদ সাহেদকে আমি টেলিভিশন ছাড়া কখনো দেখেনি বা চিনতাম না; যদিও পরে কয়েকবার আমার দপ্তরে এসেছে এবং বিভিন্ন প্রভাবশালীর রেফারেন্স ব্যবহার করেছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, গত ২১ মার্চ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আন্ত মন্ত্রণালয় সভা হয়। সভা শেষে অধিদপ্তরের সভাকক্ষ থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তৎকালীন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবসহ একাধিক চিকিৎসক নেতা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে তাঁর কক্ষে যান। ওই সময় সাহেদও মন্ত্রী ও সচিবের পেছনে পেছনে ওই কক্ষে ঢোকেন। আগেই হাতে করে চুক্তিপত্র তৈরি করে নিয়ে এসেছিলেন সাহেদ। হাসপাতাল শাখার পরিচালক ডা. আমিনুল হাসানও ছিলেন সেখানে। ওই কক্ষে একটি টেবিলে বসেই তাত্ক্ষণিক মন্ত্রী, সচিব ও মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তখন সাহেদের সঙ্গে আসা কয়েকজন ছবিও তোলেন। প্রক্রিয়াটি শেষ হতে পাঁচ থেকে সাত মিনিট লেগেছে। পরে হাসপাতাল শাখার পরিচালক এক দফা রিজেন্ট হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তখন পর্যন্ত দৃশ্যত সব কিছু ঠিকঠাক দেখা গেছে। কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই সাহেদ চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে রোগীদের কাছ থেকে বিল নিতে শুরু করেন। বিষয়টি জানতে পেরে মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাঁকে মৌখিকভাবে সতর্ক করে দেয়। এর পরই সাহেদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে বিল চাইতে শুরু করেন এবং নানা জায়গা থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ফোন করিয়ে চাপ দিতে থাকেন। সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রিজেন্টের বিরুদ্ধে পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করে। অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও আলাদাভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অভিযোগ আসতে থাকে। এর ভিত্তিতেই কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও র‌্যাবের টিম যৌথভাবে উত্তরা ও মিরপুরে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়।
করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে জুনের প্রথম সপ্তাহে ওই বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলামকে বদলি করে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব করা হয়। এরপর একই বিভাগের দুজন অতিরিক্ত সচিবকেও বদলি করা হয়।
জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘করোনা মোকাবেলা একক কোনো মন্ত্রণালয় বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এতে আরো অনেক মন্ত্রণালয়ের পারস্পরিক সহযোগিতার দরকার হয়। কিন্তু আমরা প্রত্যাশিত হারে সেই সহযোগিতা পাচ্ছি না। অথচ কোনো সমস্যা দেখা দিলেই সব দায় আমার বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরে এসে পড়ে।’ তিনি বলেন, ‘রিজেন্ট হাসপাতাল বা মোহাম্মদ সাহেদের প্রতারণার দায়ও আমাদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমি তো ওই লোককে চিনিই না। সে তখন ভালো ভালো কথা বলে আমাদের সঙ্গেও তো প্রতারণা করেছে। আমরা তখন যেহেতু কোনো বেসরকারি হাসপাতালকে পাচ্ছিলাম না চিকিৎসার জন্য, তখন এই হাসপাতালটি পেয়ে তাদের অনুমতি দিয়েছি। ওই ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণার আগেই সমাজের আরো অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তা এখন বের হচ্ছে। প্রতারকের প্রতারণা কেউ আগে বুঝতে পারলে তবে কেউ প্রতারিত হয় না। যখন তার প্রতারণা ধরা পড়েছে তখন তো আমাদের পক্ষ থেকেই প্রশাসনের সহায়তায় ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।’

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!