Sunday , 27 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » জেকেজির ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার, রিজেন্টের সাহেদ এখনো অধরা

জেকেজির ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার, রিজেন্টের সাহেদ এখনো অধরা

অনলাইন ডেস্ক:
করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা কেলেঙ্কারিতে জড়িত অভিযোগে জেকেজি হেলথকেয়ারের প্রধান নির্বাহী আরিফুল চৌধুরীর পর তাঁর স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা শারমিন হুসাইন ওরফে সাবরিনা আরিফ চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল রবিবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই চিকিত্সককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তিনি জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
একই উপায়ে নমুনা পরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আরেক প্রতিষ্ঠান রিজেন্টের উত্তরা ও মিরপুরে থাকা দুটি হাসপাতালও গত সপ্তাহে সিলগালা করে দিয়েছে র‌্যাব। এ ঘটনায় র‌্যাবের করা মামলায় হাসপাতালের ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী গ্রেপ্তার হলেও রিজেন্টের মালিক সাহেদ করিম এখনো গ্রেপ্তার হননি। তবে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সাহেদ আত্মসমর্পণ না করলে পুলিশ তাঁকে ধরে ফেলবে।
করোনার নমুনা পরীক্ষা না করেই রিপোর্ট দেওয়াসহ বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামানোর অভিযোগ রয়েছে জেকেজি হেলথকেয়ারের (জোবেদা খাতুন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা) বিরুদ্ধে।  প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালিয়ে একটি ল্যাপটপেই ১৫ হাজার ভুয়া রিপোর্ট তৈরির আলামত পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা ও প্রধান নির্বাহীসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সরকারের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে সরকার। করোনাকালে মাস্ক, পিপিইসহ স্বাস্থ্যসেবার সুরক্ষা সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় দুর্নীতি এবং নমুনা পরীক্ষার দুর্নীতিতে যাঁরা জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রিজেন্ট ও জেকেজির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর করোনার সনদ জালিয়াতির কারণে বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জেকেজির দুর্নীতির সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে আসা ডা. সাবরিনাকে গতকাল রবিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে টানা আড়াই ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। এ জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে বলে  জানায় পুলিশ। আজ সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করে অন্তত চার দিনের রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গত ২৪ জুন জেকেজির গুলশান কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী ও ডা. সাবরিনার স্বামী আরিফ চৌধুরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পর থেকেই সরকারি চিকিত্সক হয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান পদে থাকা সাবরিনার নাম এবং জালিয়াতির তথ্য নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তবে গতকাল পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ পর্যন্ত জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান নন, পরামর্শক ছিলেন বলেই দাবি করেছেন সাবরিনা। তাঁদের প্রতিষ্ঠানের একটি ল্যাপটপ থেকেই ১৫ হাজার ভুয়া রিপোর্টের আলামত পায় পুলিশ। স্বামী আরিফের অপকর্মে সাবরিনা প্রভাব খাটিয়ে সহায়তা করেছেন বলে তথ্য মিললেও তিনি তা অস্বীকার করে আসছিলেন। দায় এড়াতে বিভিন্ন তত্পরতাও চালিয়েছেন তিনি। গতকাল গ্রেপ্তারের পর স্বামী আরিফকেই অস্বীকার করছেন সাবরিনা! তিনি বলছেন, মারধরের কারণে তিনি এক মাস আগেই আরিফকে ডিভোর্স দিয়েছেন। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, রিমান্ডের অনুমতি পেলে সাবরিনাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে।
ডা. সাবরিনার ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ইতিমধ্যেই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় অন্যান্য ব্যবস্থাও শুরু হয়ে গেছে।’
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের ডিসি হারুন অর রশিদ বলেন, ‘তিনি (সাবরিনা) একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে জেকেজির চেয়ারম্যান থাকতে পারেন না। আবার পুলিশের ওপর হামলাসহ জালিয়াতির সঙ্গে তাঁর নাম এসেছে। এসব ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। তাই তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
পুলিশ সূত্র জানায়, বিভিন্ন মাধ্যমে সাবরিনাকে জেকেজির চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচয় দেওয়া হলেও গ্রেপ্তারের পর তিনি দাবি করেছেন, এর সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি শুধু জেকেজির কভিড-১৯ বিষয়ে পরামর্শক ছিলেন। অথচ তাঁর স্বামীও সাবরিনাকে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে স্বীকার করেছেন। গত ৪ জুন স্বামী আরিফুলের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ তুলে সাবরিনা শেরেবাংলানগর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিজ্ঞাসাবাদে সাবরিনা বলেছেন, ‘জেকেজির সিইও আরিফ চৌধুরী এই মুহূর্তে আমার স্বামী না। আমরা আলাদা থাকছি। ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছি। আরো দুই মাস বাকি আছে (ডিভোর্স কার্যকর হতে)।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জেকেজির স্বাস্থ্যকর্মীদের আমি ট্রেনিং দিতাম। আমি শুধু ট্রেনিং সেন্টার পর্যন্ত যেতাম। আমি জেকেজির চেয়ারম্যান নই।’ সাবরিনার দাবি, ‘জেকেজির প্রতারণার বিষয়ে আমি আগেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে জানিয়েছিলাম।’
ডাসাবরিনা চতুর্থ স্ত্রী                
পুলিশের তথ্য মতে, সাবরিনা পেশায় একজন চিকিত্সক হলেও পরীক্ষার নামে প্রতারণায় আরিফের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। জেকেজি হেলথকেয়ারের চেয়ারম্যান তিনি। ঘটনা প্রকাশের পর থেকে নিজেকে এই অভিযোগ থেকে বাঁচাতে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছিলেন। চিকিত্সকদের একটি প্রভাবশালী সংগঠনের কোনো এক প্রভাবশালী নেতার বান্ধবী হওয়ায় অনেকেই মনে করেছিল সাবরিনা দায় থেকে রেহাই পেয়ে যাবেন। আরিফ-সাবরিনা দম্পতির জীবন অনেকটা রূপকথার গল্পের মতো। আরিফের চতুর্থ স্ত্রী সাবরিনা। আরিফের এক স্ত্রী থাকেন রাশিয়ায়, অন্যজন লন্ডনে। আরেকজনের সঙ্গে তাঁর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তবে ছাড়াছাড়ির পরও সাবেক ওই স্ত্রী উচ্চ মহলে আরিফের জন্য দেনদরবার করে যাচ্ছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূলত সাবরিনার হাত ধরেই করোনার স্যাম্পল কালেকশনের কাজটি বাগিয়ে নেয় অনেকটা অখ্যাত জেকেজি নামের এই প্রতিষ্ঠান। প্রথমে তিতুমীর কলেজ মাঠে স্যাম্পল কালেকশন বুথ স্থাপনের অনুমতি মিললেও পরে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে ঢাকার অন্য এলাকা এবং অনেক জেলা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করছিল তারা।
জেকেজি’র  প্রতারণা
তদন্তকারী সূত্র জানায়, জেকেজি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনার নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা না করেই ১৫ হাজার ৪৬০টি টেস্টের ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে মোট ২৭ হাজার রোগীকে করোনা টেস্টের রিপোর্ট দেওয়া হয়। এর মধ্যে ১১ হাজার ৫৪০ জনের করোনার নমুনার আইইডিসিআরের মাধ্যমে সঠিক পরীক্ষা করানো হয়েছিল। বাকি ১৫ হাজার ৪৬০ রিপোর্ট প্রতিষ্ঠানটির ল্যাপটপে তৈরি করা হয়। কোনো ধরনের পরীক্ষা করা ছাড়াই দেওয়া হয় ‘পজিটিভ’ আর ‘নেগেটিভ’ রিপোর্ট। ভুয়া সনদ বানানোর কাজ করা জব্দ করা ল্যাপটপে এর প্রমাণ মিলেছে।
সূত্র জানায়, জেকেজির মাঠকর্মীরা ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে করোনার উপসর্গ দেখা দেওয়া মানুষের নমুনা সংগ্রহ করতেন। প্রতি রিপোর্টে পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হতো। আর বিদেশিদের কাছ থেকে নিয়েছে ১০০ ডলার করে। সেই হিসাবে করোনা টেস্টের ভুয়া রিপোর্টে প্রায় আট কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জেকেজি।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!