Friday , 18 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » সাহেদের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত

সাহেদের বিরুদ্ধে দুটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত

অনলাইন ডেস্ক:
রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের নতুন মামলার তথ্য এবং অপকর্মের কাহিনি নিয়ে প্রতিদিনই র‌্যাবের কাছে ভিড় করছেন শত শত ভুক্তভোগী। গতকাল সোমবার পর্যন্ত অন্তত ৬০টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর বেশির ভাগই লেনদেন এবং ঋণের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ আর্থিক জালিয়াতির। গতকাল নতুন দায়ের করা দুটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। বাদী সাইফুল্লাহ মাসুদের জবানবন্দি গ্রহণ করে ঢাকা মহানগর হাকিম মাইনুল ইসলামের আদালত পরোয়ানা জারি করেন। অন্যদিকে গতকাল চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানায় সাইফুদ্দিন নামের এক ব্যবসায়ী ৯১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, বিভিন্ন পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, লেনদেনে হয়রানি, প্রতারণা, মুনাফার নামে টাকা নিয়ে আত্মসাৎ, পাওনা টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটিয়েছেন সাহেদ। ভুক্তভোগীদের অনেকে মামলা করেও প্রতিকার পাননি। উল্টো পুলিশসহ বিভিন্ন মহলের হয়রানির শিকার হয়েছেন।
র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, এসব অভিযোগের পাশাপাশি কমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগী ভাগিয়ে মোটা অঙ্কের বিল করে হয়রানির অভিযোগ আছে সাহেদের বিরুদ্ধে। এই কমিশন হার নির্ধারণ করা কাগজপত্রও জব্দ করেছেন তদন্তকারীরা। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, সাহেদকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, ‘সাহেদকে গ্রেপ্তার করতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরে আমাদের কয়েকটি টিম কাজ করছে। তাঁর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঠিকাদারি কাজের নামে প্রতারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টাকা আত্মসাৎ, চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণা, পাথর সরবরাহকাজের টাকা আত্মসাৎ, রিকশাচালকদের লাইসেন্স দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ হয়রানির অভিযোগ আমরা খতিয়ে দেখছি।’
গতকাল ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে পরোয়ানা জারির দুটি মামলা করেন কারওয়ান বাজারের রড, ইট, সিমেন্টের ব্যবসায়ী মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজের মালিক সাইফুল্লাহ মাসুদ। এহাজারে তিনি অভিযোগ করেন, সাহেদ তাঁর কাছ থেকে ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুই কোটি ৫৮ লাখ ৩০ হাজার ৫৫ টাকার রড, সিমেন্ট, ইট কেনেন। কিছু টাকা পরিশোধ করলেও বাকি টাকা পাওনা থাকে। পরে একইভাবে এক কোটি টাকার রড, ইট, সিমেন্ট নেন সাহেদ। এই এক কোটির জন্য সাহেদ চারটি ব্যাংক চেক দেন। কিন্তু চারটি চেকই ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করে। তারপর সাইফুল্লাহ মাসুদ টাকা চাইলে সাহেদ তাঁকে টাকা না দিয়ে ভয়ভীতি, হত্যার হুমকি দেন। এ ব্যাপারে চলতি বছরের ৮ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় জিডি করেন মাসুদ। এ ছাড়া গত বছরের ৩ মার্চ মাসুদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এর পর থেকে সাহেদ আর কোনো টাকা পরিশোধ করেননি। এ জন্য সাইফুল্লাহ মাসুদ ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেন। পরে বাদী মাসুদের জবানবন্দি নিয়ে আদালত সাহেদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। আগামী ১৩ আগস্ট পরবর্তী মামলার দিন ধার্য করেন আদালত।
তদন্ত সূত্র জানায়, রিজেন্ট হাসপাতালের জন্য এমআরআই মেশিন কিনতে দুই কোটি টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে একটি কিস্তিও পরিশোধ করেননি সাহেদ। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক থেকে এমআরআই মেশিন কিনতে ওই ঋণ নেন সাহেদ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পদ্মা ব্যাংক নামে পরিচিত। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই ঘটনায় মামলা করলে জামিন নিয়ে নেন ধূর্ত সাহেদ।
পদ্মা ব্যাংকের গুলশান করপোরেট শাখার ব্যবস্থাপক সাব্বির মোহাম্মদ সায়েম বলেন, ‘তিনি ব্যাংক থেকে দুই কোটি টাকা ঋণ নেন। এরপর এক টাকাও পরিশোধ করেননি। পরে ২০১৭ সালে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।’
চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার ওসি সদীপ কুমার দাশ জানান, রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের নামে প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়েছে। গাড়ির টায়ার ও যন্ত্রাংশ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স মেগা মোটরসের মালিক জিয়া উদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের পক্ষে মামলাটি করেন সাইফুদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। কম্পানির জন্য জিনিসপত্র নিয়ে টাকা পরিশোধ করেননি সাহেদ।
গত ৬ জুলাই উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার নামে জালিয়াতির ভয়াবহ আলামত মেলে। এরপর তদন্তকালে রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদের বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে ভয়াবহ প্রতারণার তথ্য প্রকাশ পায়। গতকাল পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে ৬০টি মামলা, তিনজন গোপন স্ত্রী, শত কোটি টাকা আত্মসাৎ, পাওনাদারদের নির্যাতন, মিথ্যা মামলায় হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে। করোনায় জালিয়াতির ঘটনায় মামলায় তাঁর সহযোগীসহ ৯ জন গ্রেপ্তার হলেও নাটের গুরু সাহেদ এখনো পলাতক।
পলাতক সাহেদ কি মৌলভীবাজারে?
দেশের আলোচিত করোনা নমুনা পরীক্ষায় কেলেঙ্কারির প্রধান হোতা রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিম ভারতে যাওয়ার জন্য মৌলভীবাজারে অবস্থান করছেন—এমন গোপন সংবাদে কমলগঞ্জে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। চাতলাপুর সীমান্ত দিয়ে তিনি যেন ভারতে যেতে না পারেন, সে জন্য পুলিশ যানবাহনে তল্লাশি শুরু করেছে। গতকাল বিকেল থেকে ভারতের ত্রিপুরাগামী সড়কের মৌলভীবাজার-চাতলাপুর সড়কের শমশেরনগর চৌমুহনী মোড়ে শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা যানবাহনে তল্লাশি শুরু করেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, মৌলভীবাজার জেলা পুলিশ থেকে তাদের জানানো হয়েছে, ঢাকার রিজেন্ট হাসপাতালের করোনা কেলেঙ্কারির পলাতক প্রধান আসামি মো. সাহেদ এ পথে কুলাউড়া উপজেলার শরীফপুর সীমান্তপথে ভারতের ত্রিপুরা যেতে পারেন এমন সংবাদ রয়েছে। তাই সতর্কতা হিসেবে পুলিশ সদস্যদের যানবাহন তল্লাশি করতে হবে। গতকাল বিকেল ৫টায় শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক আনজির হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শমশেরনগর চৌমুহনায় দাঁড়িয়ে যানবাহনগুলো তল্লাশি করেন।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুরে সাহেদের মুঠোফোন ট্র্যাক করে মৌলভীবাজার জেলায় তিনি অবস্থান করছেন এমন তথ্য জানা গেছে। সে জন্য পুলিশ ও আন্যান্য বাহিনী সর্তক হয়ে উঠে। ফলে গতকাল বিকাল থেকে শমশেরনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায় পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়।
শমশেরনগর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক (তদন্ত) অরূপ কুমার চৌধুরী বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা গেছে মো. সাহেদ চাতলাপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা প্রবেশ করতে পারেন। তাই তাঁকে ধরতে পুলিশ শমশেরনগরে তদারকি চালাচ্ছে। কমলগঞ্জ থানার ওসি আরিফুর রহমান বলেন, সাহেদ কমলগঞ্জে আছেন এমন তথ্য জানা যায়নি। তবে পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*