Wednesday , 30 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক’
‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক’

‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক’

অনলাইন ডেস্ক:
বাংলাদেশের রেলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে আগামীকাল সোমবার ভারত থেকে ১০টি ব্রড গেজ ইঞ্জিন আসছে। ভারত এই ইঞ্জিনগুলো দিচ্ছে অনুদান হিসেবে। বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কে এটি সহযোগিতার আরেকটি অধ্যায়। আগামী ৩১ জুলাই ছিটমহল দিবস। ২০১৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের মধ্যে ছিটমহলগুলো বিনিময় করেছিল। এতে দুই দেশের মধ্যে প্রায় ৭৪ বছরের পুরনো সমস্যার সমাধান হয়েছে। জমি কে কম পেল আর কে বেশি পেল তা নিয়ে আটকে থাকেনি কোনো দেশই। কারণ দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের লক্ষ্য ছিল জনগণের মঙ্গলের জন্য সমস্যার সমাধান করা।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যত ধরনের সমস্যা আছে এর সবই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমরা ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, ছিটমহল বিনিময়, সীমান্তের ৭৪ বছরের পুরনো সমস্যা ও সমুদ্রসীমা সমস্যার সমাধান করেছি। দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের বিচক্ষণতা ও পরিপক্বতা দিয়ে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় ও মাত্রায় উন্নীত করেছেন।’
মন্ত্রী আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আমরা পরস্পরের ভালো-মন্দের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা খুব ভালো বন্ধু।’
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভারতীয়রাও রক্ত দিয়েছে। সেই সম্পর্কের তুলনা অন্য কারো সঙ্গে হতে পারে না।
বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, তাঁরা এ সম্পর্ককে বিশ্বে প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্কের ‘মডেল’ হিসেবে তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বে পুরো ভারত যেভাবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে তা বিশ্বে বিরল। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশ থেকে ভারত দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের সেনাদের সরিয়ে নিয়ে গেছে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বেশ কয়েক বছর আশ্রয়ও দিয়েছিল ভারত। মাঝে কিছু বছর দুই দেশের মধ্যে কিছুটা টানাপড়েন থাকলেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বরাবরই জোরালো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সম্পর্ক আরো জোরালো করেছেন। সেই সঙ্গে সহযোগিতার নতুন নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে সম্পর্ক তাতে অন্য কোনো দেশের প্রভাব পড়ার কোনো সম্ভাবনা তাঁরা দেখছেন না।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় বলেন, চীন অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হয়েছে, এ জন্য এ অঞ্চলে ‘দাদাগিরি’ করার চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ফোনালাপ অস্বাভাবিক কিছু নয়। আরো অস্বাভাবিক নয় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে কাশ্মীর প্রসঙ্গ তোলা।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। টাকা-পয়সা বা কোনো কিছু দিয়ে তো আর সেই সম্পর্ক ভোলানো যাবে না। দুই দেশের মধ্যে যে বোঝাপড়া তাতে এই সম্পর্কে অন্য কোনো দেশের প্রভাব নিয়ে আমি চিন্তার কিছু দেখি না।’
নয়াদিল্লিতে শীর্ষস্থানীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো ড. জয়িতা ভট্টাচার্য গতকাল বিকেলে বলেন, ‘ভারত-বাংলাদেশ একটি বিশেষ সম্পর্কের অংশীদার। এই সম্পর্কের মূলে আছে স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ ও অভিন্ন সংস্কৃতি।’ তিনি বলেন, ‘এটি স্বতন্ত্র একটি সম্পর্ক এবং এটি মনে রেখেই এ সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ও ভারতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এটি প্রতিযোগিতার সময় নয়। বরং দুই দেশের উচিত সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে এ সম্পর্কের আরো পরিচর্যা করা।’
ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য হিন্দুর ন্যাশনাল এডিটর ও ডিপ্লোমেটিক এডিটর সুহাসিনী হায়দার গতকাল সন্ধ্যায়  বলেন, গত দেড় দশক ধরেই বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড়। উভয় পক্ষই স্থলসীমান্ত, সমুদ্রসীমা সমস্যার সমাধান এবং দুই দেশের মধ্যে বর্ধিত কানেক্টিভিটি ও বাণিজ্যে লাভবান হয়েছে। তবে উভয় দেশের অভ্যন্তরীণ কিছু নীতির কারণে সম্পর্কে প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও বিভিন্ন সময় করা হয়। বিশেষ করে, ভারতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের পর বাংলাদেশে জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যোগদান সম্পর্ককে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেই সফর স্থগিত আছে।
গত মার্চে ঢাকা সফরকালে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ভারতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন ও আসাম রাজ্যে নাগরিক তালিকা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেবে না ভারত।
ভারতের সাবেক উপসেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আর কে সাহনি বলেছেন, দুই দেশের জন্যই পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। কারণ পাকিস্তানের কোনো বন্ধু নেই। উপসাগরীয় দেশগুলোও পাকিস্তানকে ফিরিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু যদি এখনো কেউ থেকে থাকে সেটি হলো সৌদি আরব।’ তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইমরান খানের ভালোই জানা আছে। আর ওই ফোনালাপের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বাংলাদেশের অবস্থানের প্রশংসা করে বক্তব্য দিয়েছে।
চীনের প্রভাবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার আশঙ্কা নাকচ করে রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘কোনো দেশের সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থে করা হয়। ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রক্তে বাঁধা। সাত হাজার ভারতীয় সেনা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আর্থিক লেনদেনের। তারা অবকাঠামো গড়তে সহযোগিতা করছে। আমরা কৃতজ্ঞ যে চীন আমাদের পদ্মা সেতু নির্মাণে সহায়তা করেছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে ভূ-রাজনৈতিক, স্ট্র্যাটেজিক মাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল জড়িত।’
ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মধ্যে সম্পর্ক আরো এগিয়ে নেওয়ার জোরালো আগ্রহ আছে। ভারতের সবচেয়ে বড় স্থলসীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে। ভারতের শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্যও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, সমস্যাগুলো শান্তিপূর্ণভাবে সব পক্ষকে নিয়ে সমাধান করতে চায়।

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

error: Content is protected !!