Tuesday , 22 September 2020
Home » দৈনিক সকালবেলা » পাচঁফোড়ন » রায়হান কবিরকে দেশে ফেরত পাঠাবে মালয়েশিয়া
রায়হান কবিরকে দেশে ফেরত পাঠাবে মালয়েশিয়া

রায়হান কবিরকে দেশে ফেরত পাঠাবে মালয়েশিয়া

অনলাইন ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার জেরে গ্রেপ্তার প্রবাসী বাংলাদেশি রায়হান কবিরকে আইনগত প্রক্রিয়া শেষে দেশে ফেরত পাঠাবে মালয়েশিয়া সরকার। কাতারভিত্তিক ওই সংবাদমাধ্যমে ‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়া’স লকডাউন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মালয়েশিয়া সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) খবরে এ তথ্য জানা গেছে। এপির খবর অনুযায়ী গতকাল শনিবার মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রায়হানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে এবং তাঁর মালয়েশিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। গত শুক্রবার রাতে দেশটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের এক টুইট বার্তায় রায়হানকে গ্রেপ্তারের খবর জানানো হয়। এদিকে রায়হানকে গ্রেপ্তারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁর মুক্তি ও নিরাপত্তা চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে ২১টি সংগঠন।
জানা গেছে, আলজাজিরায় প্রচারিত ‘১০১ ইস্ট’ অনুষ্ঠানে ২৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের ওই প্রতিবেদনে করোনাভাইরাস মহামারিতে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারের আচরণ নিয়ে কথা বলেন রায়হান কবির। ওই প্রতিবেদনে মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি লকডাউন চলাকালে দেশটির সরকারের নিপীড়নমূলক আচরণ উঠে আসে। সংবাদমাধ্যমটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে এর সমালোচনা শুরু করে মালয়েশিয়া। দেশটির সরকার ওই প্রতিবেদনে তোলা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। প্রতিবেদনটি প্রচারের পর থেকে সাক্ষাৎকারদাতা বাংলাদেশি রায়হান কবিরের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তাঁর বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিবৃতিও দেওয়া হয়। পরে রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করে তাঁকে গ্রেপ্তার করে মালয়েশিয়ান পুলিশ।
এদিকে গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কুয়ালালামপুর থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, রায়হান এখন মালয়েশিয়ার পুলিশ হেফাজতে আছেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ১৪ দিন পুলিশ তাঁকে তাদের হেফাজতে রাখতে পারবে। তবে রায়হানের বিরুদ্ধে কী কী অভিযোগ আনা হয়েছে, সেটা জানা যাবে আগামীকাল সোমবার।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচি প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘রায়হান কবিরের আইনজীবী হিসেবে কাজ করবেন মালয়েশিয়ার সুমিতা সানথিনি ও সেলভারাজা চিন্নিয়া। সুমিতার সঙ্গে গতকাল শনিবার বিকেলে আমার কথা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষকে ই-মেইলের মাধ্যমে তাঁরা বিষয়টি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা রায়হান কবিরের সঙ্গে দেখা করার জন্য অগামীকাল সোমবার দুপুর ২টায় সময় চেয়েছেন।’
এদিকে আলজাজিরা টিভি নেটওয়ার্ক এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, মত প্রকাশ করার দায়ে রায়হানকে গ্রেপ্তার করার খবর বিরক্তিকর। মৌলিক অধিকার হিসেবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার পক্ষে আলজাজিরা তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করছে।
জীবিত ফিরতে না পারলে ধরে নেবেন এক কোটি প্রবাসীর জন্য আমার জীবনটা ত্যাগ করা : সারা পৃথিবীর প্রবাসী ভাইয়েরা, আপনাদের জানিয়ে রাখছি, কোন আইন, কোন অপরাধে আমাকে মোস্ট ওয়ান্টেড ঘোষণা করেছে মালয়েশিয়ার সরকার, আমি জানি না। আমি কোনো অন্যায় করিনি, অপরাধ করিনি। যা দেখেছি শুধু তা-ই বলেছি, যা হয়েছে শুধু তা-ই তুলে ধরেছি। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে আবেদন, আমাকে আমার দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আমি জানি না আমার সঙ্গে কী হতে যাচ্ছে? কতটুকু খারাপ হবে আমি জানি না। যদি আমার কিছু হয়েই যায়। যদি জীবিত ফিরতে না পারি। আপনারা জেনে রাখুন এক কোটি প্রবাসীর জন্যই এই জীবনটা ত্যাগ করা। করোনাভাইরাসের সময় আমার ভাইয়ের হাতে বিনা কারণে শিকল পরানো, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এই অমানবিক কাজের প্রতিবাদ করেছি। আমি সত্য বলেছি, আমার ভাইদের জন্য কথা বলেছি। আমি চাই আমার পাশে থাকুক আমার দেশ, আমার মাটি।
বাংলাদেশে রায়হানের মা-বাবার আর্তি : ‘আমার বুকের ধনকে সুস্থভাবে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি। ও সত্য কথা বলছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের প্রতি যে অবিচার করা হয়, সেই সত্যটা তুলে ধরেছে আমার ছেলে।’ মালয়েশিয়ায় রায়হান কবিরের গ্রেপ্তারের বিষয়ে এভাবেই বলছিলেন তাঁর মা রাশিদা বেগম।  তিনি আরো বলেন, ‘আমার ছেলে ছোটবেলা থেকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখেছে। এলাকায় তার কোনো বদনাম নেই। বিপদে মানুষের পাশে ছুটে গেছে। আজ কত দিন হলো মানিকের (রায়হান কবির) সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ, আমার বুকের মানিককে সুস্থভাবে আমার বুকে ফিরিয়ে এনে দিন।’
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার শাহী মসজিদ এলাকার শাহ আলমের একমাত্র ছেলে রায়হান কবির ২০১৪ সালে মালয়েশিয়ায় যান। সেখানে তিনি বিএ পাস করেন। পড়ালেখার পাশাপাশি পার্টটাইম কাজ করেন। ২০১৩ সালে সরকারি তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং বন্দরের বিএম ইউনিয়ন স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন রায়হান। রায়হানের বাবা শাহ আলম ফতুল্লার বিসিক শিল্পাঞ্চলে একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘চার দিন ধরে যখন ওর কোনো খোঁজ পাচ্ছিলাম না তখন মালয়েশিয়াপ্রবাসী আমার এক ভাগিনার মাধ্যমে জানতে পারি রায়হানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের হাইকমিশনার যদি একটু তৎপর হন, তাহলে সুস্থভাবে আমার ছেলেকে ফিরে পাব।’
রায়হান কবিরের মুক্তির দাবিতে ২১ সংগঠনের যৌথ বিবৃতি : রায়হান কবিরের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়ে গতকাল বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের ২১টি সংগঠন। রায়হানের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত তাঁর মুক্তি দাবি করেছে সংগঠনগুলো। এ ব্যাপারে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন, ঢাকার পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় হওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যৌথ বিবৃতি প্রদানকারী সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে—রামরু, ওয়ারবি, ব্র্যাক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ), ওকাপ, বিএনএসকে, আইআইডি, আসক, বমসা, বাসুগ, ইনাফি, কর্মজীবী নারী, বিএনপিএস, ডেভকম, ইমা, আওয়াজ ফাউন্ডেশন, রাইটস যশোর, বিলস, বাস্তব ও ফিল্মস ফর পিস ফাউন্ডেশন।
 

About Sakal Bela

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*