Wednesday , 28 October 2020
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
Home » দৈনিক সকালবেলা » উপজেলার খবর » যশোর – খুলনার মরণ ফাদ ভবদহ অঞ্চল: চরম দুর্ভোগে পানিবন্দী দুই লক্ষাধিক মানুষ
যশোর – খুলনার মরণ ফাদ ভবদহ অঞ্চল: চরম দুর্ভোগে পানিবন্দী দুই লক্ষাধিক মানুষ

যশোর – খুলনার মরণ ফাদ ভবদহ অঞ্চল: চরম দুর্ভোগে পানিবন্দী দুই লক্ষাধিক মানুষ

টাফ রিপোর্টার :  যশোরের ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধ ঘরবাড়ি। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে যশোরের ভবদহের বিস্তীর্ণ এলাকা। গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু করে গত শনিবার সকাল পর্যন্ত মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাতে অভয়নগর ও মনিরামপুর উপজেলার অন্তত ৪০টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। এসব গ্রামের বেশির ভাগ বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। চরম দুর্ভোগে পড়েছেন পানিবন্দী দুই লক্ষাধিক মানুষ।
যশোর আবহাওয়া কার্যালয় সূত্র জানায়, মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ১৮০ মিলিমিটার, জুনে ৩২২ মিলিমিটার, জুলাইয়ে ৩৫৩ মিলিমিটার ও আগস্টে ২৭৫ মিলিমিটার। এ বছর মে মাসে ২৫৮ মিলিমিটার, জুনে ৪১৫ মিলিমিটার, জুলাইয়ে ২৩৭ মিলিমিটার ও আগস্টের ২৩ তারিখ পর্যন্ত ৩৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে ভবদহ অঞ্চল। অভয়নগর উপজেলার ভবানীপুর গ্রামে শ্রী নদীর ওপর নির্মিত ভবদহ স্লুইসগেট দিয়ে মূলত এলাকার ৫৪টি বিলের পানি নিষ্কাশিত হয়। পলি পড়ে এলাকার পানিনিষ্কাশনের একমাত্র মাধ্যম মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্যতা হারিয়েছে। এতে নদী দিয়ে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে না। এ অবস্থায় বৃষ্টির পানিতে এলাকার বিলগুলো তলিয়ে গেছে। বিল উপচে পানি ঢুকেছে বিলসংলগ্ন গ্রামগুলোতে।ভবদহ স্লুইসগেট রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের কার্যসহকারী ফারুক আহমদ মোল্যা আমাদের প্রতিনিধি জেমস আব্দুর রহিম রানাকে জানান, ভবদহ স্লুইসগেটের ২১ কপাটের সব কটি পলিতে তলিয়ে গেছে। সেগুলোর পলি পরিষ্কার করার কাজ চলছে। এখন নদী দিয়ে প্রবল জোয়ার আসছে। ফটক দিয়ে জোয়ারের পানি ঢুকছে। কিন্তু ভাটায় কম পানি বের হচ্ছে।
পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন ভবদহ অঞ্চলের লক্ষাধিক মানুষ। পানিবন্দী মানুষদের কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন উঁচু সড়কে। অনেক পরিবার ঘরের মধ্যে মাচা করে সেখানে থাকছে।
অভয়নগর উপজেলার বলারাবাদ, বেদভিটা, ডুমুরতলা, আন্ধা, বারান্দী, দিঘলিয়া, কোটা, ডহর মশিয়াহাটী, রাজাপুর, সুন্দলী, ভাটবিলা, সড়াডাঙা, হরিশপুর, ফুলেরগাতী, দামুখালী, দত্তগাতী, জিয়াডাঙা এবং মনিরামপুর উপজেলার হাটগাছা, সুজাতপুর, কুলটিয়া, লখাইডাঙ্গা, মহিষদিয়া, আলীপুর, পোড়াডাঙা, পদ্মনাথপুর, পাড়িয়ালী, দহাকুলা, কুচলিয়া, নেবুগাতী, পাঁচকাটিয়া, ভুলবাড়িয়া, কুমারসীমা, কপালিয়া, পাচাকড়িসহ আরও কয়েকটি গ্রামের কোথাও আংশিক আবার কোথাও বেশির ভাগ বাড়িতে পানি উঠেছে।
গত রোববার এলাকার পাঁচটি গ্রাম ঘুরে মানুষের চরম দুর্ভোগের চিত্র দেখা গেছে। গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ইতিমধ্যে গ্রামগুলোর শত শত বাড়িতে পানি উঠেছে। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় এলাকার অনেক জায়গায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও প্রতিদিন এক-দুই ইঞ্চি করে পানি বাড়ছে।মনিরামপুরের হাটগাছা গ্রামের রবিতা রায় ঘর ছেড়ে পাশের উঁচু ইটের সড়কের ওপর আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘উঠোনে মাজাজল, ঘরের মধ্যে হাঁটুজল। ঘরে থাকা যাচ্ছে না। পরিবারের তিনজন সদস্য এবং ১৭টি মুরগি ও চারটি হাঁস নিয়ে রাস্তার ওপর টিনের চালা দিয়ে সেখানে থাকছি। চারটি গরু আছে। গোয়ালে জল। গরুর খাবার নেই। খুব কষ্টে আছি।’দেখা যায়, সুজাতপুর গ্রামের সুকুমার দাস রাস্তা থেকে ঘরে যাতায়াতের জন্য বাঁশের সাঁকো তৈরি করছেন। তিনি বলেন, ‘উঠোনে দেড় হাত আর ঘরের মধ্যে এক বিঘত জল। ঘরের মধ্যে ইট দিয়ে খাট উঁচু করে সেখানেই থাকছি। কিন্তু জল যেভাবে বাড়ছে তাতে বেশি দিন ঘরে থাকা যাবে না।’অভয়নগর উপজেলার ডুমুরতলা গ্রামের কৃষক শিবপদ বিশ্বাস বলেন, ‘গ্রামের এক শর বেশি বাড়িতে জল উঠে গেছে। ঘরের মধ্যে ইট দিয়ে খাট উঁচু করে সেখানেই থাকছি। আর একদিন ভারী বৃষ্টি হলে রাস্তায় উঠতে হবে।’অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বিকাশ রায় বলেন, সুন্দলী ইউনিয়নে ১৪টি গ্রাম। এর মধ্যে ১২টি গ্রামের আংশিক বাড়িঘরে পানি উঠেছে। এলাকার বিলগুলো আগে থেকেই জলাবদ্ধ হয়ে আছে। এসব বিলে এবার কোনো আমন ধান হয়নি।উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান নাদির হোসেন মোল্যা বলেন, ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের অনেক বাড়িতে পানি উঠেছে। এর মধ্যে তিনটি গ্রামের অবস্থা খারাপ।মনিরামপুর উপজেলার হরিদাসকাটি ইউপি চেয়ারম্যান বিপদ ভঞ্জন পাঁড়ে বলেন, তাঁর ইউনিয়নে ২২টি গ্রাম। আটটি গ্রামে পানি ঢুকেছে, এর মধ্যে পাঁচটি গ্রামের অবস্থা বেশ খারাপ।ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী বলেন, ভবদহ এলাকায় জলাবদ্ধতা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে এলাকার ৪০টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। জোয়ারাধার ছাড়া জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে না।পানি উন্নয়ন বোর্ডের যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম বলেন, গত বছর ১০ কিলোমিটার নদীর পাইলট চ্যানেল খনন করা হয়। খননের পর পলিতে নদী সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। এবার শ্রী নদীর ১ হাজার ৩০০ মিটার খনন করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তেশ্বরী নদীর ২ দশমিক ১০ কিলোমিটার এবং ভবদহ স্লুইসগেটের উজান ও ভাটিতে শ্রী নদীতে ২০০ মিটার করে ৪০০ মিটার খননের কাজ চলছে। তিনি জানান, ভবদহের একটি অঞ্চলের পানি আমডাঙ্গা খাল হয়ে ভৈরব নদে যায়। কিন্তু এবার ভৈরব নদে অনেক উচ্চতায় জোয়ার আসছে। এতে পানিনিষ্কাশনের পরিবর্তে ভৈরব নদ থেকে আমডাঙ্গা খাল দিয়ে উল্টো পানি ঢুকছে। এ জন্য আমডাঙ্গা খালের ওপর অবস্থিত ছয় কপাটের স্লুইসগেট বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ওই অঞ্চলে পানি জমে গেছে। জোয়ারের চাপ কমে গেলে দুই-এক দিনের মধ্যে আমডাঙ্গা খাল দিয়ে পানি নেমে যাবে।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*