Tuesday , 26 January 2021
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
Home » দৈনিক সকালবেলা » আইন ও আদালত » বোয়ালমারীর মহাপ্রতারক ওবায়দুর ঢাকায় গ্রেপ্তার
বোয়ালমারীর মহাপ্রতারক ওবায়দুর ঢাকায় গ্রেপ্তার

বোয়ালমারীর মহাপ্রতারক ওবায়দুর ঢাকায় গ্রেপ্তার

বোয়ালমারী (ফরিদপুর) প্রতিনিধি :

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ওবায়দুর রহমান নামে এক প্রতারক বিভিন্ন পরিচয়ে ব্যবসায়িদের ফাঁদে ফেলে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আলিশান বাড়ি বানাচ্ছে নিজগ্রাম উপজেলার ময়না ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইচাখালী গ্রামে। সে ওই গ্রামের মৃত হারেজ শেখের ছেলে।

পুলিশ সুপার পরিচয়ে প্রতারণাকারী এই ওবায়দুর এখন গ্রেফতার হয়ে পুলিশের রিমান্ডে আছে। অধিকাংশ অভিযোগের কথা সে স্বীকারও করেছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। নিজের নামে ফেসবুক আইডি না থাকলেও নিজের ছবি দিয়ে ফেসবুকে এমডি রহমান নামে আইডি চালাতো।

ওবায়দুর রহমান ‘পুলিশ সুপার’ সেজে চট্টগ্রামের একজন বড় ব্যবসায়িকে গ্রেপ্তারে হুমকি দিয়ে তার কাছ থেকে বাগিয়ে নিয়েছে দামি গাড়ি ও নগদ আট লাখ টাকা। তার প্রতারণার জাল ঢাকাসহ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকার গার্মেন্ট এক্সেসরিজ প্রস্তুতকারক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের ছোট ভাই পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়িক অংশীদারদের কাছ থেকে পাওনা লাখ লাখ টাকাও তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই প্রতারকের বিরুদ্ধে। সেখানেও নিজেকে পরিচয় দিয়েছে পুলিশ সুপার (এসপি) হিসেবে। কিন্তু ধরা পড়ার পর জানা গেল, ওবায়দুর একজন বহুরূপী প্রতারক। সে পুলিশের কেউ না। হাতিরঝিল থানা পুলিশ গত সোমবার রাতে রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। এই প্রতারক নিজেকে কখনও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিশেষ পুলিশ সুপার, আবার কখনও বিভিন্ন থানার ওসি হিসেবেও পরিচয় দিয়ে থাকে। ওয়ারেন্ট থাকার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয় বিভিন্নজনের কাছ থেকে। তার গাড়িতেও থাকত এসপি এবং ওসি লেখা স্টিকার। কখনও নিজেকে বহুজাতিক কোম্পানির পরিচালক, এনজিও’র মালিক, আবার কখনও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে আসছিল ওবায়দুর। প্রতারণার টাকায় গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরের বোয়ালমারীর ইছাখালী গ্রামে গড়ে তুলছে আলিশান বাড়ি। এছাড়া তার রয়েছে সাতৈর বাজারে ব্যবসায়ি দুটি ঘরসহ লীজ নেওয়া কয়েকটি পুকুর। সেখানে মাছ চাষ করা হয়। আবার গ্রামের এলাকায় কিনেছে ৮-১০ পাখি জমা-জমি।

প্রতারণার শিকার পলিব্যাগ ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাহিদুর রহমান জানান, চলতি বছরের মার্চে মগবাজারের মধুবাগ এলাকার সড়কে তার প্রাইভেটকার দুর্ঘটনায় পড়ে। ওই সময় ঘটনাস্থলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার পরিচয় দিয়ে ওবায়দুর রহমান তার পাশে দাঁড়ায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিজেদের মধ্যে মোবাইল ফোন নম্বর আদান-প্রদান হয়। আলাপ হয় বিভিন্ন সময়ে। এক পর্যায়ে এসপি পরিচয় দেওয়া ওবায়দুর রহমান তাকে বলেন, যে কোনো সমস্যায় তিনি তার পাশে থাকবেন। এতে আশ্বস্ত হয়ে মোস্তাহিদুর তাকে জানান, বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে তার কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। তখন ওই টাকা তুলে দেওয়ার কথা বলে সবার কাগজপত্র নেয় প্রতারক ওবায়দুর। এরপর ওই ব্যবসায়ি জানতে পারেন, তার ছোট ভাই এবং পুলিশ সুপার পরিচয় দিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে ওবায়দুর টাকা তুলে নিয়েছে।

পুলিশের ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ওবায়দুর বহুরুপী প্রতারক। ওই প্রতারককে জিজ্ঞাসাবাদ করে তার প্রতারণার আরো তথ্য উদ্ঘাটন করা হচ্ছে। তার কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তির অনেক দলিল, ভুয়া সিমকার্ড, ওয়্যারলেস সেটসহ প্রতারণার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা করেছেন।  

পুলিশ জানায়, প্রতারক ওবায়দুর নানা পরিচয়ে চট্টগ্রামের ওশান অ্যাপারেল থেকে ২১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, এরশাদ নিটের মালিকের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা, ইউনিয়ন গার্মেন্টের মালিকের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা এবং ফ্যাশন ক্রাফটের মালিকের কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা আত্মসাৎ করে।

পুলিশের তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার হাফিজ আল ফারুক সাংবাদিকদের জানান, ওবায়দুরের প্রতারণার শিকার একজন ব্যবসায়ী মামলা করেছেন। ওই মামলায় তাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রতারক ওবায়দুর ব্যবসায়ীদের কাছে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসপি পরিচয় দিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করে তথ্য দিয়েছে। এ ছাড়া সে হাতিরঝিল থানার ওসি পরিচয় দিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তার কাছ থেকে চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নেওয়া গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রতারক ওবায়দুর রহমানের বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, ওবায়দুর রহমান ৫ ভাই ও দুইবোনের মধ্যে সবার ছোট। সে এসএসসি পাশ করার পর বাড়ি ছেড়ে বোয়ালমারীতে একটি এনজিওতে কাজ করতো। তারপর ফরিদপুর কয়েকবছর কাটে তার। ফরিদপুর থেকে প্রায় ১০ বছর আগে ঢাকায় পাড়ি জমায়। এরপর বিয়ে সাদি করে স্ত্রী ও সন্তানদের বাড়িতে রেখে সে ঢাকায় বসবাস করতো। তবে সে সর্বশেষ কি করত তা বাড়ির কেউ জানে না।

ওবায়দুরের বৃদ্ধা মা মজিরন বেগম (৬৫) বলেন, পনের বছর বয়সে আমার ছেলে আমার কাছ থেকে দূরে থাকে। তিনবছর আগে তিনতলা ফাউন্ডেশন করে একটি ভবনের কাজ শুরু করে। যা বর্তমানে একতলা পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তবে আমার ছেলে এ রকম প্রতারণা করতে পারে এটা আমি বিশ্বাস করি না।

বোয়ালমারী থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ নুরুল আলম বলেন, আমি এ থানায় নতুন যোগ দিয়েছি। এরকম কোন বিষয় আমার জানা নেই। উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্তু আমার কাছে কিছুই জানতে চাননি।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*