Saturday , 17 April 2021
Home » দৈনিক সকালবেলা » অপরাধ ও দূর্নীতি » মাদরাসা থেকে দুজন বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করে
মাদরাসা থেকে দুজন বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করে
--সিসিটিভি ফুটেজ

মাদরাসা থেকে দুজন বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করে

অনলাইন ডেস্ক:

মাথায় টুপি, পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির ওপর কালো রঙের জ্যাকেট পরা দুজন। তাঁরা হেঁটে এসে থামলেন কুষ্টিয়া শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে। সেখানে তাঁরা মই বেয়ে উঠলেন বঙ্গবন্ধুর নির্মাণাধীন ভাস্কর্যের পাটাতনে। ব্যাগ থেকে হাতুড়ি বের করে সজোরে আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত করলেন ভাস্কর্যটি। এরপর মই বেয়ে নেমে ধীরলয়ে হেঁটে চলে গেলেন তাঁরা।

ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এই দৃশ্য দেখা গেছে। যে দুজনকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভাঙচুর করতে দেখা গেছে, তাঁরা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার জুগিয়া পশ্চিমপাড়া ইবনে মাস্উদ (রা.) মাদরাসার ছাত্র আবু বকর ওরফে মিঠুন (১৯) ও সবুজ ইসলাম ওরফে নাহিদ (২০)। এরই মধ্যে এই দুজনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন ওই মাদরাসার দুই শিক্ষক আল আমীন (২৭) ও ইউসুফ আলী (২৮)।

গতকাল রবিবার বিকেলে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া দুই ছাত্রের বরাত দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘মাওলানা মামুনুল হক ও ফয়জুল করিমের বক্তব্য শুনে তাঁরা এ কাজে উদ্বুদ্ধ হয়েছেন।’

গ্রেপ্তার হওয়া আবু বকর ওরফে মিঠুন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার শিংপুর মৃধাপাড়া এলাকার সমশের মৃধার ছেলে ও সবুজ ইসলাম ওরফে নাহিদ দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর গোলাবাড়িয়া এলাকার সামছুল আলমের ছেলে। আর মাদরাসার শিক্ষক আল আমীন মিরপুর উপজেলার ধুবাইল এলাকার আব্দুর রহমানের ছেলে ও ইউসুফ আলী পাবনা জেলার আমিনপুর দিয়াড় বামন্দী এলাকার আজিজুল মণ্ডলের ছেলে।

ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের বিরুদ্ধে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করেছে।

ডিআইজি জানান, শুক্রবার রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন আবু বকর ও নাহিদ গোপনে মাদরাসা থেকে বের হয়ে হেঁটে মজমপুর হয়ে পাঁচ রাস্তার মোড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের কাছে আসেন। সেখানে বাঁশের মই বেয়ে ওপরে উঠে নাহিদের ব্যাগ থেকে হাতুড়ি বের করে তাঁরা ভাস্কর্যটির বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে ক্ষতবিক্ষত করেন। এরপর আবারও তাঁরা হেঁটে মাদরাসায় গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এই দুজনকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের ইন্ধন দেওয়ায় ওই মাদরাসার দুই শিক্ষককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত জানান, শুক্রবার গভীর রাতে শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে জুগিয়া এলাকায় পুলিশের একটি দল প্রাত্যহিক টহলে ছিল। এ সময় জুব্বা, টুপি ও পাগড়ি পরা দুজনকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে দেখে তারা। তখন ওই পুলিশ সদস্যরা বিষয়টি নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। শনিবার সকালে ভাস্কর্য ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ের কয়েকটি সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করে। ওই ফুটেজ দেখে পুলিশ ভাস্কর্য ভাঙচুরে জড়িত দুজনকে দেখতে পায়। তবে এই ফুটেজে তাঁদের চেহারা অনেকটা অস্পষ্ট ছিল। পরে পুলিশ জুগিয়া এলাকা থেকে পুলিশের গাড়ি দেখে পালিয়ে যাওয়া দুজনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। এই ফুটেজে দুজনের মুখ স্পষ্ট দেখা যায়। পরে পুলিশ দুই জায়গার ফুটেজ মিলিয়ে দেখে ওই দুই মাদরাসাছাত্রকে শনাক্ত করে। শনিবার রাতে এই দুই ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যে ওই দুই শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে ভাস্কর্য ভাঙচুরের প্রতিবাদে জেলা সম্মিলিত নাগরিক সমাজের উদ্যোগে গতকাল বিকেলে পৌরসভার বিজয় উল্লাস চত্বরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবউল আলম হানিফ, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি ড. শাহিনুর রহমান, সাবেক ট্রেজারার ড. সেলিম তোহা, জেলা জাসদের সভাপতি গোলাম মহসিন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট অনুপ কুমার নন্দী, সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা বক্তব্য দেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, কুষ্টিয়ার এই পুণ্য ভূমিতে কখনো মৌলবাদীদের মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে নিজেদের অস্তিত্ব প্রকাশ করার প্রয়াস চালিয়েছে, ভবিষ্যতে আর কোনো দিন তারা এ জেলায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের পর বিক্ষিপ্ত ঘটনায় জেলা বিএনপির অফিস ভাঙচুর এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের ভাইয়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার সময় হামলাকারীরা দুজন সাংবাদিককে আহত করে। এই ঘটনায় আহত সাংবাদিক দেবেশ চন্দ্র কুষ্টিয়া সদর মডেল থানায় জেলা ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদ আহমেদের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এর আগে শনিবার মধ্যরাতে সাদ আহমেদকে গ্রেপ্তারের দাবিতে সাংবাদিকরা থানা ঘেরাও করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

উল্লেখ্য, কুষ্টিয়া পৌরসভা কর্তৃপক্ষ ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে শাপলার ভাস্কর্য ভেঙে তিনটি প্রধান সড়কের সামনে বঙ্গবন্ধুর তিনটি ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করে গত নভেম্বরে। শহরের মজমপুরের অংশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ দেওয়ার একটি ভাস্কর্য তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। গত শুক্রবার রাতে সেটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে দেওয়া হয়। ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে হেফাজতে ইসলামসহ বেশ কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের বিরোধিতার জবাবে প্রগতিশীল বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবাদের মধ্যেই কুষ্টিয়ায় এই ঘটনা ঘটে।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*