Wednesday , 20 January 2021
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
Home » দৈনিক সকালবেলা » বিভাগীয় সংবাদ » খুলনা বিভাগ » লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়া চিনিকল,উপজাত-দ্রব্য দিয়ে লাভে দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি
লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়া চিনিকল,উপজাত-দ্রব্য দিয়ে লাভে দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি

লোকসানে বন্ধ কুষ্টিয়া চিনিকল,উপজাত-দ্রব্য দিয়ে লাভে দর্শনা কেরু এ্যান্ড কোম্পানি

 কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :

টানা লোকসানের বোঝা, অর্থ সংকট আর দেনার দায়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কুষ্টিয়া চিনিকল। প্রতি মৌসুমে কোটি কোটি টাকা লোকসানের বোঝা ও নানা সংকটে চিনিকলটি পরিণত হয় রুগ্ন শিল্পে। শুধুমাত্র ২০০১-০২ থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত দেশের বৃহত্তম এই চিনিকলটিতে লোকসান হয়েছে ৪১৫ কোটি টাকা। অব্যাহত লোকসানের কারণে মিলটি ছিল ধ্বংসের পথে। অবশেষে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই চিনিকলটি।আগামী ২৫ ডিসেম্বর ২০২০-২০২১ মৌসুমের আখমাড়াই কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বেশ কিছুদিন ধরেই এ মিল বন্ধের কথা শোনা যাচ্ছিল। অবশেষে চলতি মৌসুমের আখমাড়াই বন্ধের ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন। এদিকে বকেয়া বেতন-মজুরি ও পুনরায় চিনিকল চালুর দাবিতে রাজপথে নেমেছে শ্রমিকরা। তারা বলছেন, মিলকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করে আধুনিকায়নের মাধ্যমে পুনরায় চালু করলে মিলটি লাভের মুখ দেখবে।তথ্য সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়া জেলা শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে জগতি নামক স্থানে ১৯৬১ সালে ২২১.৪৬ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় কুষ্টিয়া চিনিকল। ১৯৬৫-৬৬ মৌসুম থেকে এটি চিনি উৎপাদন শুরু করে। স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করে। লাভজনক এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০১ সাল থেকে লোকসানের মুখে পড়ে। এরপর প্রতি বছরই লোকসানের পরিমাণ বাড়তে থাকে।মিলের অর্থ বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি মৌসুমে চিনি উৎপাদন অব্যাহত থাকলেও এ মিলে লাভের চেয়ে লোকসানই হয় বেশি। তবে ১৯৯৪-৯৫ অর্থ বছরে ২ কোটি ৬১ লাখ ও ৯৫-৯৬ অর্থ বছরে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা মিলে লাভ হয়। এছাড়া বিগত ২০০১-২০০২ থেকে ২০১৯-২০২০ অর্থ বছর পর্যন্ত,গেলো ১৯ বছরে ৪৬১ কোটি টাকা লোকসান গুনছে মিলটি। আর গেল মৌসুমে ৬১ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। এভাবেই নানা সংকটে কুষ্টিয়া চিনিকল বন্ধের কথা চলছিল। এর প্রতিবাদে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল শ্রমিকরা।এদিকে লোকসানের কবলে পড়া কুষ্টিয়া চিনিকলের শ্রমিক-কর্মচারীরা গত সাত মাস ধরে বেতনভাতা পাচ্ছেন না। শুধুমাত্র চিনিকলে আখ দেওয়া কৃষকদের পাওনা টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এই অবস্থার মধ্যে চাষিরা আবার আখ রোপণ করেছে। কিন্তু চলতি বছর মিলে আখ মাড়াই না হলে বা মিল বন্ধ হয়ে গেলে, এই বিপুল পরিমাণ আখের কী হবে তা নিয়ে উৎকণ্ঠা-উদ্বেগে আছে চাষিরা। তবে মিলে অবিক্রিত রয়েছে ২১ কোটি টাকার চিনি আর পাঁচ কোটি টাকার চিটাগুড়।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলটির প্রতিদিনের চিনি উৎপাদন ক্ষমতা ১৫’শ মেট্রিক টন এবং বার্ষিক মাড়াই ক্ষমতা ১৫ হাজার মেট্রিক টন। মিল জোনের আওতায় আখ চাষ হচ্ছে ৪০ একর জমিতে।বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় চাষি পর্যায়ে আখ চাষ হয়েছে ৭ হাজার ৯শ’ ৯৩ একর জমিতে। প্রতিমন ১৪০ টাকা দরে চাষিরা মিলে চাষ সরবরাহ করেন। কিন্তু বিক্রিত আখের দাম পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতাসহ হয়রানি ও নানা জটিলতায় চাষি মিলে আখ সরবরাহে আগ্রহ হারায়। প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত মিলটি আধুনিকীকরণ (বিএমআরই) করা হয়নি। ফলে বহু পুরাতন যন্ত্রাংশে সজ্জিত কারখানা প্রতি মৌসুমেই যান্ত্রিক ত্রুটিসহ ব্রেক ডাউনে চিনি উৎপাদন ব্যাহত হয়।কুষ্টিয়া সুগার মিলের মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) মুন্সী মোহাম্মদ খলিল বললেন, ইতিমধ্যে আখ চাষিদের তিন কোটি বিশ লাখ টাকার দেনা পরিশোধ করা হয়েছে। পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ২১ কোটি টাকার চিনি আর পাঁচ কোটি টাকার চিটাগুড় অবিক্রিত রয়েছে। এগুলো বিক্রি হলে আরো দেনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।চিনিকল সূত্রে জানা যায়, সরকারের সবকটি চিনিকলেই বর্তমান বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে উৎপাদিত হচ্ছে চিনি। কুষ্টিয়া চিনিকলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে গত মৌসুমে খরচ হয়েছে ২৭৩ টাকা। সেই চিনি বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬০ টাকা কেজি দরে। শুধু বিদায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরেই লোকসান ছিল ৬১ কোটি টাকা। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও গ্র্যাচুইটি বিল বাবদ বকেয়া পড়েছে ১৬ কোটি টাকা।সুগারের মিলের কর্মকর্তারা জানান, আমদানিকৃত চিনির বাজার মূল্য কম হওয়ায় ডিলার ও ভোক্তারা দেশি চিনির পরিবর্তে কেমিক্যাল মিশ্রিত রিফাইন চিনির দিকেই বেশী ঝুঁকছেন। এই চিনি স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতিকর। অথচ দাম কম হওয়ায় ওই চিনি বেশী বিক্রি হয়। এতে করে দেশীও চিনি বিক্রি একবারই কমে যায়। ফলে প্রতি মৌসুমে মিলে উৎপাদিত হাজার হাজার টন চিনি থাকে অবিক্রীত। ১৯৬১ সালে স্থাপিত এই মিলটি নিয়মিত চিনি, চিটাগুড়, মন্ড ও জৈবসার উৎপাদন করে আসছিলো। প্রথম কয়েক বছর মিলটি লাভে থাকলেও একসময় মুখথুবড়ে পরে। ধারাবাহিক ভাবে লোকসানে চলে যায় মিলটি।এদিকে পাশ্বর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় রয়েছে প্রায় ৮০ বছরের পুরানো চিনিকল কেরু এন্ড কোং। ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৩০০ বিঘার উপর অবস্থিত এই চিনি কলটি দেশের বৃহত্তম। চিনি ছাড়াও এখানে উপজাত-দ্রব্য হতে উৎপাদন করা হয় দেশি ও বিলেতি মদ। এছাড়া কেরুর অধীনে একটি ডিস্টিলারি এবং ফার্মাসিউটিকাল ইউনিট রয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিষ্ঠানটিকে রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলাদেশের ১৫টি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র কেরু এ্যান্ড কোম্পানিকে লোকসান গুনতে হয় না। এর লাভের প্রায় সম্পুর্নটাই আসে এখানকার ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে।কুষ্টিয়া চিনিকলের ব্যবস্থাপক (অর্থ) খোরশেদ আলম খন্দকার বলেন, আখ চাষীদের বকেয়া তিন কোটি বিশ লক্ষ টাকা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের বকেয়া রয়েছে প্রায় ষোল কোটি টাকা। ইতিমধ্যে কৃষকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে। অবিক্রিত রয়েছে ২১ কোটি টাকার চিনি আর পাঁচ কোটি টাকার চিটাগুড়। সেই সাথে কর্পোরেশন থেকে সহযোগিতার দেয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। এইসব অর্থদিয়ে বাকি পাওনা পরিশোধের চেষ্টা চলছে।কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্য চিনিকলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি বলেন, এই ধরনের নির্দেশনা এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি।“দর্শনা চিনিকলের আদলে উপজাত-দ্রব্য হতে অন্যান্য পণ্যে উৎপাদন করে লোকসানে পড়া চিনিকলকে বাঁচানোর কোন সিদ্ধান্ত কর্পোরেশনের আছে কিনা”এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন দেশের সব চিনিকলেই কমবেশি লোকসান রয়েছে। কেরু এ্যান্ড কোম্পানি চিনির লোকসান কমাতে অন্যান্য ইউনিট বাড়িয়েছে। এখন লোকসানে থাকা চিনিকলে উৎপাদন ইউনিট বাড়ানো কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত। এমন কোন নির্দেশনা আমাদের কখনো আসেনি।জানা গেছে, চালুর প্রথমদিকে মিলটি লাভজনক হলেও পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি,অনিয়ম-দুর্নীতি ও মাথাভারী প্রশাসনসহ নানা কারণে ক্রমাগত লোকসানের ঊর্ধ্বগতি বাড়তে থাকে। গেলো সাত মাস ধরে বেতন পান না এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীরা। আখচাষিরাও পায় না তাদের দীর্ঘদিনের পাওনা টাকা। এরপর মাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করায় চরম হতাশ ৩০ কর্মকর্তাসহ ৮৯০ জন শ্রমিক-কর্মচারী ও আখ চাষিরা।কুষ্টিয়া চিনিকলে কর্মরত নুরুল ইসলাম সুরুজ জানান, আমাদের ৭ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। কিভাবে আমরা এই বকেয়া পাবো সে বিষয়ে কর্র্তৃপক্ষ আমাদের সাথে কোন কথায় বলছে না। তিনি বলেন,মিলটি বন্ধ না করে সঠিক তদারকি, টাক্সফোর্স গঠন ও দুর্নীতি বন্ধ করে মিলটি আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে কর্পোরেশনের সমন্বয়,আখের উন্নত জাত উদ্ভাবন,আধুনিক মেশিন সরবরাহ করলে লোকসান কমতে পারে।শ্রমিক নেতারা বলেন, কুষ্টিয়া চিনি কলটি আমাদের রুটি রুজি। কুষ্টিয়ার এই ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। সরকার চাইলেই লোকসান ঠেকাতে সক্ষম। আমরা আমাদের বকেয়া পাওনা আদায় ও পুনরায় চিনিকল চালুর দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছি। মিলকে শতভাগ দুর্নীতিমুক্ত করে আধুনিকায়ন করে পুনরায় চালু করলে মিলটি লাভের মুখ দেখবে।কুষ্টিয়া চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুর রহমান খান জানান, কুষ্টিয়াসহ দেশের আরো ছয়টা মিলের আখমাড়াই কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। কুষ্টিয়ার যে আখগুলো রয়েছে তা দর্শনা, মোবারকগঞ্জ ও ফরিদপুর চিনিকলে দেওয়া হবে।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*