Tuesday , 22 June 2021
ব্রেকিং নিউজ
Home » জাতীয় » জিয়ার ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
জিয়ার ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
--ফাইল ছবি

জিয়ার ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

অনলাইন ডেস্ক:

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিল হচ্ছে। সংবিধান লঙ্ঘন, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের দেশত্যাগে সহায়তা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের কারণে জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি শরিফুল হক ডালিম, এ বি এম এইচ নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন ওরফে মোসলেম উদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধের খেতাব বাতিলেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডিত চার পলাতক খুনির খেতাব স্থগিতের জন্য হাইকোর্ট একটি আদেশ দিয়েছিলেন গত বছরের শেষ দিকে। গত মঙ্গলবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বিএনপি। অন্য অনেকে বিষয়টিকে যৌক্তিকও বলছেন। 

জামুকার মহাপরিচালক মো. জহুরুল ইসলাম রোহেল জানিয়েছেন, বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর পাঁচজনের খেতাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন এটা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যাবে, মন্ত্রণালয় গেজেট বাতিলসহ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। খেতাব বাতিল হলে তাঁরা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য আর কোনো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাবেন না।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গতকাল সরকারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরে বলেন, খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক নয়। পৃথিবীতে এ রকম বহু নজির রয়েছে যে এ রকম কর্মকাণ্ডের জন্য সম্মানসূচক খেতাব বাতিল করা হয়েছে। গতকাল বুধবার কালিয়াকৈরে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী জানান, একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে, আগামী মিটিংয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যায় কার কী ভূমিকা ছিল, কী দালিলিক প্রমাণ আছে সেগুলো পেশ করার জন্য। বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত আরো যাঁদের সম্মানসূচক পদবি রয়েছে সেগুলো বাতিল করা হবে।

এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, জিয়াউর রহমানের বীর-উত্তম খেতাব বাতিলের ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা বোধ হয় নেই। তিনি গতকাল দুপুরে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে করোনা ভ্যাকসিন নেওয়ার পর বলেন, ‘কেউ মুক্তিযোদ্ধা হলে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা খেতাব থাকা স্বাভাবিক। তবে যদি এমন হয় যে মুক্তিযোদ্ধা নাম ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নষ্ট করেছেন, তাহলে তাঁর কি খেতাব থাকার কোনো অধিকার আছে?’

জিয়াউর রহমানের ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত  ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কলঙ্ক’। ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল খেতাবটি বাতিলের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটাকে আমি মনে করি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক। স্বাধীনতার পরে শেখ মুজিবুর রহমানের যে সরকার, সেই সরকারই এই খেতাব তাঁকে দিয়েছিল’, টেলিফোনে সাংবাদিকদের এই প্রতিক্রিয়া জানান ফখরুল। তিনি বর্তমানে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে আছেন।

জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিল মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার শামিল বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। স্বাধীনতার পরে জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বোচ্চ খেতাব ‘বীর-উত্তম’ পেয়েছেন। এখন ৫০ বছর পরে যদি সরকার সেটা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়, তা হবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর চরম অবমাননা। খন্দকার মোশাররফ বলেন, ‘আমরা এখনো বিষয়টি জানি না। তবে সরকার যদি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে সেটা হবে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর চরম অবমাননা। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণ মেনে নেবে না। তারা যতই খেতাব মুছে দিতে চেষ্টা করুক, জনগণের মন থেকে কখনো জিয়াকে মুছে দেওয়া সম্ভব হবে না।’

জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাজধানীতে গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপি। মিছিলে নেতৃত্ব দেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি ও দলটির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে নাইটিঙ্গেল মোড় ঘুরে ফের নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। সেখানে রিজভী বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকার দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।

তবে সেক্টর কমান্ডার কে এম শফিউল্লাহ সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমান আমার ব্যাচমেট ছিলেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তাঁর বড় কোনো অবদান আমার চোখে পড়েনি। বরং আমি যখন একাত্তরের ১৩ মার্চ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করি, সেদিন জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র খালাস করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে যাচ্ছিলেন। যুদ্ধের সময়েও তাঁর ভূমিকা আমার ভালো লাগেনি। তাঁর খেতাব পাওয়ার বিষয়টিই যথার্থ ছিল না। তা ছাড়া পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের পর তাঁর ভূমিকাও ছিল ন্যক্কারজনক। তিনি খন্দকার মোশতাকের সহযোগী ছিলেন।’

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক আফসান চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিলের বিষয়টি সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। মুক্তিযুদ্ধের কোনো কারণে তো এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে বলার কিছু নেই। দেশে ইতিহাসচর্চার চেয়ে রাজনীতিচর্চাই হচ্ছে বেশি।’

এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের খেতাব বাতিল করা হলে মুক্তিযোদ্ধারা তা গ্রহণ করবে না। বরং আগামীতে সরকার পরিবর্তন হলে জিয়াউর রহমানকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হবে।’ সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আগুনে হাত ঢুকাবেন না। লাঠিসোঁটা নিয়ে দেশ স্বাধীন হয়নি। সুতরাং তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের অবদান ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’

জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, “যারা দেশমাতৃকার জন্য মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে মুক্তিযুদ্ধে অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন এবং  স্বাধীনতা অর্জনে বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব অর্জন করেছেন, তাঁদের খেতাব বা পদক বাতিল করা মুক্তিযুদ্ধকে গৌরবান্বিত করে না। প্রতিহিংসামূলক কোনো সিদ্ধান্ত ‘ঐতিহাসিক ন্যায্যতা’কে বিলুপ্ত করে দিতে পারে না। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল কৃতিত্বকে বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করা কোনোভাবেই সুবিচার নিশ্চিত করে না এবং নৈতিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়।”

জিয়াউর রহমানের ‘বীর-উত্তম’ খেতাব বাতিলের সিদ্ধান্তকে ‘সময়োপযোগী’ বলে মনে করেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক আলোচনাসভায় এ বিষয়ে খালিদ মাহমুদ বলেন, ‘আমি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানাই। যারা মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, অপরাধীদের যারা পুনর্বাসিত করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের এই পদক্ষেপ সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। অবশ্যই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ১৬ কোটি মানুষ এটাকে সমর্থন করবে।’

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*