Saturday , 19 June 2021
ব্রেকিং নিউজ
Home » জীবনযাপন » কৌশলে যৌতুক,বিয়ের পর আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন মেয়েপক্ষ
কৌশলে যৌতুক,বিয়ের পর আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন মেয়েপক্ষ
মেয়ের বাবাকে নির্যাতন

কৌশলে যৌতুক,বিয়ের পর আর্থিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন মেয়েপক্ষ

সৈয়দ মুহিবুর রহমান মিছলু :
ফার্ণিচার, থালা-বাসন, ইফতারি, আমকাঠলী, নাইওরী এসবের নামে মেয়ের বাবার প্রতি এই অবিচার কেন?
ছেলেকে বিয়ে দিয়ে মেয়ের বাবার বাড়ি থেকে ফার্ণিচার, থালা-বাসন, ইফতারি, ঈদে উপহার, আম কাঠালী নাইওরী এসবের নামে মেয়ের বাবার বুকে সভ্যতার যুগে অসভ্যতার তীর ছুড়ে মারা হয়। আমরা আধুনিক আর সভ্যতার স্লোগান দিচ্ছি, তবে মেয়ের বাবার প্রতি এই অবিচার কেন?
সামাজিকতার নামে একটা মেয়ের বাবার উপর এক নীরব অবিচার যুগ যুগ ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত হয়ে আসছে শ্বশুর বাড়ীর ইফতারি নামক এক সামাজিক নীরব অবিচার। শুধুমাত্র অবিচারই নয় একটা প্রচলিত কুসংস্কারও বটে। তারই ধারাবাহিকতায় যুগ যুগ ধরে এই নীরব অবিচারের বলি হয়ে আসছে একটা মেয়ের বাবা ও তার পরিবারবর্গ।
শুধু তাই নয়, এইতো গেল (৭ মে) শুক্রবার সিলেটের ওসমানীনগরে মেয়ের বাবার বাড়ি হতে দেরীতে ইফতারি আসা ও ঈদের নতুন জামা কাপড় না দেয়ায় পারিবারিক ঝগড়া হয়েছে । খবর পেয়ে মেয়ের বাবা নবীগঞ্জ উপজেলার পুটিয়া গ্রামের শাকিম উল্যা পরদিন শনিবারে মেয়ের বাড়িতে ঈদের নতুন জামা কাপড় নিয়ে আসার প্রাক্কালে জানতে পারেন, স্বামী ও শাশুড়ীর নির্যাতনে তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে এবং ৭ মাসের অন্তস্বত্তা শরিফা বেগম (২০) এর মৃত্যুর ঘটনায় ঐ রাতে থানা পুলিশ নিহতের স্বামী আরশ আলী ও শাশুড়ী মিনারা বেগমকে কে গ্রেফতারও করেছে।
একমাত্র ভুক্তভোগী পরিবার জানে এই কুসংস্কারের বলি হয়ে তারা কতটা জর্জরিত। জন্মের পর থেকে একটা মেয়ে পরিপূর্ণভাবে তার পরিবারের উপর নির্ভরশীল। বিয়ের আগ পর্যন্ত তার যাবতীয় খরচ তার পরিবারই বহন করে থাকে। ১৮-২০ টা বছর ভরণ পোষণ করে কোনরূপ প্রতিদান না নিয়েই একজন বাবা তার মেয়েকে পাত্রস্থ করেন।
সেই বিয়েতে মেয়ের বাবাকে/অভিভাবককে জামাই বাড়ির কত রকম আবদার নীরবে সহ্য করে মিটাতে হয়। আর শুধুই কি এখানে শেষ একটা মেয়ের বিবাহ সম্পন্নের পর আরো কত যুগ যে কতরকমের আবদার মেটাতে হয়, তার কোন সীমারেখা নেই।
বিয়ের সময় ছেলে পক্ষ কে ধুমধাম করে খাওয়াতে হবে তা জেনো বাধ্যতামূলক। সাথে ভালো ফার্নিচার ও দিতে হবে। ফার্নিচার বলতে রান্নাঘরের থালাবাসন থেকে শুরু করে সোফা, ফ্রিজ, আলমারি, পালং, চেয়ার-টেবিল, ড্রেসিং টেবিল, বেড আরও অনেক কিছু। এক কথায়, একটা ঘর সাজানোর জন্য যা যা লাগে সেই সব কিছু যেন ছেলের বিয়েতেই শশুর বাড়ি থেকে উসুল করতে চায়। আর এটা আমরা বিন্দু মাত্র লজ্জিত হয়ে চাইনা, বরং মনে করি এটা আমাদের অধিকারের মধ্যে পড়ে।
আর তাই বিয়ে করে শশুরের কাঁধে চড়ে সভ্যতার যাত্রা শুরু করতে চায়। সাধ্য অনুযায়ী বরপক্ষের এসব আবদার মিটিয়ে দিয়েই বিয়ে হয়ে যায়। তাহলে কি বিয়ে হয়ে গেলেই মেয়েপক্ষ স্বস্তির নিঃস্বাস নিতে পারছে? মোটেই নাহ!
বরং বিয়ের প্রাথমিক ধাপ শেষ করে স্বজ্ঞানে বাকি জীবন সিজন ভিত্তিক অবিচার মেয়ে পক্ষকে সহ্য করে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। আর সেই বন্দোবস্ত অনুযায়ী আপনাকে চলতেই হবে। আপনার বিভিন্ন উপঢৌকন নির্ভর করবে আপনার মেয়ে কতটা সুখে থাকছে। মেয়ের সুখের জন্য মেয়ের অভিভাবকরা দিনের পর দিন শশুর বাড়ির এইসব জুলুম নীরবে সহ্য করেই যায় আর যাচ্ছে এখনকার আধুনিক সমাজেও।

ইফতারি, নাইওরী, আম কাঠালী বাবার/পরিবারের বুকে সভ্য সমাজে অসভ্যতার তীর ছুড়ে মারা হয়। আমরা আধুনিক আর সভ্যতার স্লোগান দিচ্ছি, তবে মেয়ের বাবার প্রতি এই অবিচার কেন? রমজান মাস আর সিজন ভিত্তিক নাইওরীর সময় হলে বাবার বা পরিবারের চিন্তা বাড়তেই থাকে। মেয়েকে/বোন কে কিভাবে ইফতারি দেবে, কিভাবে আম কাঠালী দেবে? ভালো করে ইফতারি /আম কাঠালী না দিলে মেয়েকে শশুরবাড়ি আর আশপাশের কটুকথা আর কতপ্রকার অসামাজিক অত্যাচার নীরবে সহ্য করতে হবে। এক রমজান মাসেই ৩ বার ইফতারি আসা চাই। তাও আবার যেমন তেমন ইফতারি না।
আশপাশ যেভাবে জানে সেইভাবে আনতে হবে। গর্ব করে যাতে আশপাশে বলতে পারা যায় এমন করে আনতে হবে। একটু কম হলেই মেয়ের কপালে কটু কথা আর কালবৈশাখির ঝড় রীতিমতো অনিবার্য। এমন কি উদাহরণ দিয়ে বলতে থাকে, ‘অমুকের ছেলের বউয়ের ঘর ভর্তি ইফতারি এসেছে। সারাটা গ্রাম বিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি আমার আত্নীয়কেই দিতে পারিনি। লজ্জায় আমি মুখ দেখাতেই পারছিনা’। এরকম নানা কথা কোন কোন পরিবারে ছেলের বউকে শোনতে হয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু কেন এই অসভ্যতা আর অবিচার? প্রশ্ন সচেতন মহলের। প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলেও তার প্রতিকার হচ্ছেনা এটাই সত্য।

এইসব ইফতারি কয়টা পরিবার সানন্দে তার মেয়ের বাড়ি দিয়ে থাকে। হাতেগুনা কয়েকটা পরিবার পারে শুধুমাত্র মেয়ের/বোনের মুখ রক্ষার্থে। সামাজিক এই কুপ্রথার ভার অনেক গুলা পরিবার অনায়াসে বয়ে যাচ্ছে। কোনরূপ আনন্দ ছাড়াই মেয়ে পক্ষ বলিদান হয়ে যাচ্ছে। সবচাইতে বেশী নির্মমতার স্বীকার সমাজের দারিদ্র্য ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলা। দারিদ্র্য পরিবার গুলা মেয়ের সুখের জন্য সুদে/কিস্তিতে টাকা এনে হলেও মেয়ের বাড়ি ইফতারি দিতে বাধ্য।
শশুর বাড়ী যখন ইফতারি খাওয়া আর বিতরণে ব্যস্ত, হয়তো সেই রাতে একটা মেয়ের বাবা চোখের জলে বালিশ ভিজাচ্ছে। কিভাবে সে ঋণের টাকা পরিশোধ করবে। সেই টাকার চিন্তা শেষ হতে না হতেই দেখা যায় আরেকটা আম-কাঠালী দেওয়ার সময় হয়ে গেছে। উফ্, কি নির্মমতা! এতে অনেকেই গৃহহারাও হচ্ছেন বলে দেখা যাচ্ছে সচরাচর। অনেকেই মেয়ের শ্বশুর বাড়ি ইফতারি দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও ইতিহাস সাক্ষি দিচ্ছে৷ ব্যর্থ হয়ে কি আর ঘটনা এখানেই শেষ? মোটেও না! এই ব্যর্থতার প্রতিদান আত্মহত্যার মাধ্যমে দিতে হয়েছে কতশত তরুনীকে তার হিসেব নেই। সেদিন এমনই এক তরুনীর পরিবারের সাথে কথা হলো। আর মধ্যবিত্ত পরিবার তো নিজের সম্মান রক্ষার্থে নিজে এক মাস কষ্ট করে থাকবে।
তবুও মেয়ের বাড়ি ভালো করে ইফতারি দিতে হবে। না হলে কত লোক লজ্জায় তাদের আর তাদের মেয়ের কপালে থাকবে অজানা কতশত ঝড়। শুধু কি ইফতারি দিয়েই মেয়ে পক্ষ রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। সহজ উত্তর হলো-একেবারেই না। রমজান পরেই শুরু হয় সিজন ভিত্তিক বিভিন্ন নাইওরীর পালা। একটার পর একটা নাইওরী চলতেই থাকে। আম, কাঁঠাল, লিচু, নাইওরী। শীতকালীন পিঠা নাইওরী। এমন আরও কত কি সামাজিকতা। বিভিন্ন বিশেষ দিনে আরও কত কিছু ছেলের বাড়ি পাঠাতে হয়। হায় এ কেমন অবিচার? আপনি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছেন নাকি আপনার গোটা পরিবার-পরিজন-আত্বীয়স্বজনের আপ্যায়ন, খাওয়া দাওয়ার দায়িত্ব মেয়ের বাড়ির হাতে সোপর্দ করেছেন? সমাজের কিছু কিছু বিত্তবান মানুষের বিলাসিতায় যত ব্যয় হয় তা দিয়ে হাজারো পরিবার সুখে-স্বাচ্ছন্দে অনায়াসে জীবনযাপন করতে পারে। তাদের এসব বিলাসী কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় যেন অস্বচ্ছল-অসহায়দের সাথে উপহাস করছেন। চরম সত্যটা হলো আমাদেরকে এই কুসংস্কার ভেঙ্গে যে কোনো মূল্যে সংস্কারের আলো প্রজ্জ্বলিত করতে হবে। বর্তমান যুব সমাজকেই প্রথম এই গুরুদায়িত্ব নিতে হবে। অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে তারা যেন পিছপা না হন। ভুলে গেলে চলবে না সেই সব দিন-মজুর আর শ্রমিকদের কথা যাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল আপনাদের এই বৃহৎ প্রাসাদ আর অট্রালিকা যা নিয়ে আপনাদের এত অহংকার। শেষ করতে চাই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটা লাইন দিয়ে-“তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাদেরই গান–তাদেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে, আসে নব উত্থান”।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*