Tuesday , 27 July 2021
ব্রেকিং নিউজ
Home » জাতীয় » উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আ.লীগ
উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আ.লীগ

উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আ.লীগ

অনলাইন ডেস্ক:

আওয়ামী লীগের যখন জন্ম হয়, তখন বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের অংশ। শুরু থেকেই দলটির বেশির ভাগ সময় গেছে লড়াই-সংগ্রামে। উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই দলের মহান নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা পেয়েছে বাংলাদেশ। জাতি গঠনের প্রতিটি সোপানে-স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে দলটি। দীর্ঘ উত্থান-পতনের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ এখন টানা ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায়। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় এই উপমহাদেশে আওয়ামী লীগই এখন সবচেয়ে সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল, যা দীর্ঘ সাত দশক পরও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। আজ ৭৩ বছরে যাত্রা শুরু করল দলটি অর্থাৎ আজ দলটির ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে মুক্তির লক্ষ্যে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করে। দল দুটি এই উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল হলেও এখন রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। প্রতিবেশী ভারতে কংগ্রেসকে হটিয়ে ক্ষমতায় বিজেপি। মুসলিম লীগের পরাজয় শুরু পাকিস্তানের শোষণ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মাধ্যমে। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে বিদায় হয়েছে মুসলিম লীগ। পাকিস্তানে এই দল এখন খণ্ড-বিখণ্ড। দেখা গেছে, দেশটির সব সামরিক সরকারের আমলে তারা থেকেছে লেজুড়বৃত্তির ভূমিকায়, যা ব্রিটিশ শাসনামলের মুসলিম লীগের ঠিক বিপরীত চরিত্র।   

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীতে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে যে দলটি আত্মপ্রকাশ করেছিল সেই দলটিই আজকের ‘আওয়ামী লীগ’। আত্মপ্রকাশের ছয় বছরের মাথায় দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল, দলে সব ধর্মের মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা বা অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ। দীর্ঘ সাত দশক পরে এসেও আওয়ামী লীগ তার লক্ষ্য অসাম্প্রদায়িকতার চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়নি। এমনটাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সব স্তরের নেতাকর্মীরা মনে করেন।

ব্রিটিশদের কবল থেকে ভারতের মানুষের মুক্তির জন্য যে কংগ্রেস স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল, তারা দুই মেয়াদে ক্ষমতার বাইরে। পাকিস্তান সৃষ্টিতে যে মুসলিম লীগ উপমহাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করেছিল, সেই দল এখন খণ্ড-বিখণ্ড। অন্যদিকে পাকিস্তানের শোষণ আর বঞ্চনা থেকে মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দিয়েছে যে আওয়ামী লীগ, তারা আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পরে এসেও আরো সুসংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে। নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টিতে নেতৃত্ব দেওয়া উপমহাদেশের পুরনো এই তিনটি রাজনৈতিক দলের বিষয়ে বিশ্লেষকরা বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। ৭২ বছর পূর্ণ করা ঐতিহ্যবাহী আওয়ামী লীগ নিয়ে তাঁদের একটিই বক্তব্য, দলটি জনগণের সঙ্গে আছে। টিকে থাকার সমীকরণটিও দলটির জানা।  

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক গত সোমবার কালের কণ্ঠকে বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের পথচলা শুরু হয়েছিল, তা থেকে একচুলও বিচ্যুত হয়নি। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য দলের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছেন। তাইতো আজও মানুষের হৃদয় জয় করে আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ গতকাল বলেন, ৫০ ও ৬০-এর দশকে যে রাজনীতি আওয়ামী লীগের ছিল সেখান থেকে তারা অনেকটা সরে এসেছে। তিনি মনে করেন, একসময় ‘ভাইয়েরা আমার’ বললে মানুষ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ত, তা এখন নেই। এখন রাষ্ট্রের ক্ষমতার নিয়ামক হিসেবে অনেক বিষয় যুক্ত হয়েছে। আর এই অবস্থায় ক্ষমতার নিয়ামক শক্তির সঙ্গে আওয়ামী লীগের রসায়ন তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে অন্যরা (অন্য রাজনৈতিক দলগুলো) পিছিয়ে আছে।   

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুভাষ সিংহ রায় বিষয়টির ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি গতকাল বলেন, আওয়ামী লীগ শব্দের অর্থ জনগণ। এটা জনগণের দল। এই দলকে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে করে গেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মানুষ যখন উপলব্ধি করল জনগণের নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, তখন জাগরণ তৈরি হলো। গত চার দশকে শেখ হাসিনা জনগণের চেতনা ধারণ করে সময়ের বাস্তবতায় আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্মাণের জন্য অবিরাম সংগ্রাম করে আসছেন। এ জন্য আওয়ামী লীগ এত সুসংগঠিত ও রাষ্ট্রক্ষমতায়।        

১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে যে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়, মুক্তিকামী মানুষ সেটাকেই মনে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম একটি পদক্ষেপ। এরপর ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ভূমিকা দলটিকে এই অঞ্চলের একক বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিণত হন দলের অবিসংবাদিত নেতায়। এর সঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যুক্ত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা পান। সেই জনপ্রিয়তাই ৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বিপুল বিজয় এনে দেয়। ফলে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় এবং বিজয় ছিনিয়ে আনে। তাইতো ‘বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ’—এই তিনটি নাম ইতিহাসে একই সূত্রে গাঁথা।

দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে চলছিল, ঠিক তখনই আঘাত হানে ঘাতকরা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগে যে ছন্দঃপতন হয়, তা দূর করেন দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। ক্রমেই সুসংগঠিত হয় পুরনো এই রাজনৈতিক দল। এরপর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন এবং সব শেষে সামরিক মদদপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের প্রতিকূলতা কাটিয়ে নেতৃত্ব সুসংহত করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা, যার ফলে আওয়ামী লীগ টানা ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে এখন ক্ষমতায় রয়েছে, যা দীর্ঘ শাসনের একটি দৃষ্টান্ত।  

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সংগঠনের অগণিত নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীসহ দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য জাতীয় নেতাদের।

কর্মসূচি : করোনা মহামারির কারণে দিবসটি পালনের জন্য আওয়ামী লীগ সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে উপযোগী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে—আজ সূর্যোদয়ের সময় কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন, সকাল ৯টায় ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে সীমিত পরিসরে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ, বিকেল ৪টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে রয়েছে আলোচনাসভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে তিনি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হবেন।

এদিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় আজ সকাল সাড়ে ১০টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের প্রতিনিধিদল শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করবে। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ফারুক খান ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ও মির্জা আজম এই কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকবেন।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*