Wednesday , 4 August 2021
ব্রেকিং নিউজ
Home » প্রচ্ছদ » বগুড়ার অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন দীলিপ কুমার
বগুড়ার অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন দীলিপ কুমার
--ফাইল ছবি

বগুড়ার অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন দীলিপ কুমার

বিনোদন ডেস্ক:

শুনেই খটকা লাগল তো? কিন্তু এটাই সত্য। দীলিপ কুমার জোয়ার ভাটা চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চিত্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হন। এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন বগুড়ার এক সন্তান অমিয় চক্রবর্তী। এই অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরেই উপমহাদেশের কিংবদন্তি অভিনেতা দীলিপ কুমার চলচ্চিত্রে আসেন। 

দীলিপ কুমারকে নিয়ে গবেষণা করেছেন চলচ্চিত্র সমালোচক ও লেখক অনুপম হায়াত। তাকে নিয়ে গবেষণার এক পর্যায়ে খুঁজে পান এই অভিনেতার নেপথ্যে বেশ কয়েকজন বাঙালি যারা আবার বাংলাদেশের মানুষ। স্ট্যাম্ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড স্ট্যাডিজের পাঠ্য করেছিলেন দীলিপ কুমার অভিনীত মুঘল ই আজম চলচ্চিত্রটি। 

থিয়েটারের মানুষ হিমাংশু রায় ও দেবিকা বিলেত থেকে ফিরে সিনেমা বানানোর ঝোঁক চেপে বসে। বানালেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘বোম্বে টকিজ।’ দিলীপ কুমারকে নিয়ে বানালেন প্রথম চলচ্চিত্র ‘জোয়ার ভাটা।’ দীলিপ কুমার চলচ্চিত্রে অভিষিক্ত হলেন। হিমাংশু রায়ের বাড়ি মানিক গঞ্জে।

অনুপম হায়াত বলেন, ‘বোম্বে টকিজ’ থেকে সিনেমা বানানো হবে। নায়ক খোঁজা হচ্ছে। সেটা ১৯৪২ সালের ঘটনা। ব্রিটিশ সৈন্যদের জন্য পরিচালিত একটি ক্যান্টিনে কাজ নেন, একজন ক্যান্টিন মালিক এবং একজন শুষ্ক ফল সরবরাহকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন ইউসুফ। সেই ক্যান্টিনেই ইউসুফকে দেখে পছন্দ হলো অমিয় চক্রবর্তীর। প্রস্তাব দিলেন সিনেমায় অভিনয় করার। নানা কথার পর রাজি হলেন ইউসুফ। নিয়ে যাওয়া হলো দেবিকা রানির কাছে। দেবিকা রানি সে সময় দারুণ সুদর্শনা। সুন্দর পুরুষদের প্রতিও ছিল বিশেষ টান। ইউসুফকে পছন্দ করে ফেললেন। 

কিন্তু ইউসুফ নাম দিয়ে তো নায়ক হিসেবে চালানো যাবে না। বোম্বে টকিজের কর্মকর্তা ভগবতী বাবুকে দায়িত্ব দেওয়া হলো নাম খুঁজে বের করতে। ভগবতী বাবু ইউসুফের নায়ক হিসেবে নাম প্রস্তাব করেন উদয় কুমার। দেবিকা রানি নাকচ করে দেন। এরপরে দেওয়া হয় রাজ কুমার। সেটা নাকচ হয়ে গেল। এরপরে দীলিপ কুমার। দেবিকা রানি পছন্দ করলেন। ইউসুফ থেকে দীলিপ কুমার নাম ধারণ করে যাত্রা শুরু করলেন একজন সুদর্শন যুবক। 

এরপরে ‘প্রতিমা’সহ কয়েকটি ছবি করলেন দীলিপ কুমার। সুপার ডুপার ফ্লপ। সাফল্য পেলেন ‘মিলন’ সিনেমায়। এই সিনেমার কাহিনি রবীন্দ্রনাথের। নৌকাডুবি’র হিন্দি সংস্করণ মিলন। মজার ব্যাপার হলো দীলিপ কুমারকে তারকা বানিয়ে দেওয়া মিলন ছবির পরিচালকও বাঙালি। নীতিন বসু। এই নির্মাতার আদি নিবাস বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহের জয়সিদ্ধিতে। নীতিন বসু জগদীশ চন্দ্র বসুর আত্মীয়। নীতিন বসুর  মা মৃণালিনী বসু ছিলেন ময়মনসিংহের মসুয়ার বিখ্যাত রায়চৌধুরী পরিবারের কন্যা, শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোটবোন ও সুকুমার রায়ের পিসি।

নীতিন বসুর পরিচালনাতেই গঙ্গা যমুনাতে অভিনয় করেন দীলিপ কুমার। এটি বিখ্যাত একটি চলচ্চিত্র। দীলিপ কুমারের ‘বাংলা’ প্রেম শুরু থেকেই, যেটা আজীবন ছিল।  

সেই অমিয় চক্রবর্তীর হাত ধরেই প্রথম ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার পেলেন। ছবিটিতে শঙ্কর নামক যেই চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছিলেন সেটি দর্শকদের মনে ছুঁয়ে গিয়েছিল। একই সাথে এই ‘দাগ’ সিনেমাতে অভিনয় করেই প্রথমবারের মত ফিল্মফেয়ারে সেরা অভিনেতা অ্যাওয়ার্ড জিতেছিলেন দিলীপ কুমার।

বাঙালিদের প্রতি দিলীপ কুমার বরাবরই দুর্বল ছিলেন। হয়তো কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই। এই ছবির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘বোম্বে টকিজ’ কিংবা পরিচালক অমিয় বা পুরো সেটেই বাংলাদের বিচরণ। আবার দেবদাসের অভিনয় দিলীপ কুমারকে কী দিয়েছে, তা সবাই জানেন। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, দিলীপ কুমারের অনুরাগ ছিল বাংলার প্রতি। যদিও তাঁর একমাত্র অভিনীত বাংলা ছবি ‘সাগিনা মাহাতো’ ফ্লপ হয়।

অনুপম হায়াত বলেন, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের উদ্যোগে দিলীপ কুমার ঢাকায় আসেন ১৯৯৫ সালের জানুয়ারিতে। উপমহাদেশের এই কিংবদন্তি অভিনেতার আগমনে স্যুভেনির কমিটি করা হলো। সেখানে আমাকে সহসম্পাদক করা হলো। রাখা হলো সংবর্ধনা কমিটিতে। স্যুভেনিরে দুটি লেখা লিখতে হলো, এর মধ্যে একটি লেখা হলো ইংরেজিতে। ‘সিনেমা অব বাংলাদেশ’ নামের এই লেখাটি মূলত দিলীপ কুমারকে আমাদের দেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে একটি ধারণা দেওয়ার জন্য লিখতে হয়েছিল।

তিনি বলেন, ২৬ জানুয়ারি দিলীপ কুমারকে নিয়ে আসা হলো এফডিসিতে। চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির পেছনে মঞ্চ বানানো হয়েছে। শিল্পী, পরিচালক, প্রযোজকে পূর্ণ এফডিসি। আমি বসেছি দ্বিতীয় সারিতে। চাষী নজরুল ইসলাম উপস্থাপনা করছেন। মঞ্চে এলেন দিলীপ কুমার। সেই প্রথম দেখলাম দিলীপ কুমারকে। আমার স্বপ্নের নায়ককে। তিনি পর্দায় যতটা সুন্দর, বাস্তবে এর চেয়েও বেশি সুন্দর। আমার পাশে বসেছিলেন সংগীতশিল্পী আনজুমান আরা বেগম। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন না। তখন আমার সিটটি ছেড়ে দিলাম। উনি সেখানে দাঁড়িয়ে দেখলেন দিলীপ কুমারকে।

এই গবেষক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘খুব অল্প সময়ে বাংলাদেশিদের মন জয় করে নিয়েছিলেন তিনি। আধো আধো বাংলায় কথা বলেছিলেন। সে সময় বাংলাদেশিরা বুঝেছিল দিলীপ কুমার শুধু হিন্দি ভাষার নয়, তাদেরও অভিনেতা। ওই একবারই দিলীপ কুমার ঢাকায় এসে বেশ কয়েক দিন ছিলেন। ছিলেন ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলে। পরদিন ২৭ জানুয়ারি ওসমানী মিলনায়তনে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিলেন। ওই অনুষ্ঠানে কিংবদন্তি অভিনেতার একটি সিনেমার গানে দুর্দান্ত নেচেছিল শাবনাজ-নাঈম জুটি। দিলীপ কুমার এতটাই অভিভূত হয়েছিলেন যে কাছে ডেকে দুজনকে জড়িয়ে ধরেছিলেন।’

চিত্রনায়ক আলমগীর দীলিপ কুমারকে মেথড অ্যাক্টিং এর জনক আখ্যা দিয়ে বলেন, তাঁর অভিনয় দক্ষতা যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।

অভিনয়ের একটি কৌশল হলো মেথড অ্যাক্টিং, যেখানে অভিনয়শিল্পী বাস্তব জীবনে তাঁর চরিত্রের মতো জীবন-যাপন করেন এবং ঠিক সেই ধরনের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হন- যেন তিনি তাঁর চরিত্রে অভিনয়ের সময় জীবনধর্মী অভিনয় ফুটিয়ে তোলেন। একে বলা হয় পুরোটা চরিত্র হয়ে যাওয়া, কারণ তখন তাঁরা আর নিজেরা অভিনয় করেন না, বরং তাঁরা নিজেরাই ওই চরিত্রটি হয়ে যান এবং চরিত্রের মতোই কর্মকাণ্ড করতে থাকেন।  আলমগীরের ভাষ্য, হলিউডে এই অ্যাক্টিংয়ের সূত্রপাত হয় ১৯৫০ সালের পরে, কিন্তু এই অ্যাক্টিংয়ের জনক কিন্তু দীলিপ কুমার। অনেকেই জানে না।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*