Wednesday , 24 June 2026
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
যুদ্ধ অবসানের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরাজয়ের ঘোষণা’: ইরান
--মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধ অবসানের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পরাজয়ের ঘোষণা’: ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে সম্পাদিত চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয়ের ঘোষণা বলে অভিহিত করেছে ইরান। বুধবার (২৪ জুন) তেহরানের পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়, ঠিক এমন এক সময়ে যখন মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক তেহরানের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত উপসাগরীয় দেশগুলোতে এক সফর শুরু করেছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তার সমাপ্তি ঘটলো এমন এক চুক্তির মাধ্যমে, যাকে ইরানের নেতারা নিজেদের বিজয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। এই সংঘাত পুরো অঞ্চলে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল, যার জবাবে তেহরান জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ অবরোধ করে এবং উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে একটি স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন এলেও শাসনব্যবস্থা আগের মতোই সুদৃঢ় রয়েছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তি প্রসঙ্গে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বুধবার বলেন, ইসলামাবাদের এই সমঝোতা কোনো চাপ বা জবরদস্তির ফল নয়, বরং এটি বীর ইরানি জাতির প্রতিরোধ ও কর্তৃত্বের ফসল। আর এই কারণেই ইসলামাবাদের এই সমঝোতা স্মারকটি আমেরিকার পরাজয়ের ঘোষণায় পরিণত হয়েছে। সেই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে। সেখানে মিত্রদের আশ্বস্ত করতে বুধবার সফর শুরু করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

মঙ্গলবার (২৩ জুন) সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছানো রুবিও দেশটির নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করার পাশাপাশি কুয়েত ও বাহরাইনে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) বৈঠকে যোগ দেবেন।

রুবিও জানান, তিনি উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা করতে চান, যেখানে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং প্রক্সি বা আঞ্চলিক মিত্রদের বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই—যা উপসাগরীয় দেশ ও ইসরাইলের জন্য দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয়।

জলপথের বিষয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, ওমান ও ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য খরচ আদায়ের কথা বিবেচনা করলেও কোনো দেশকে আন্তর্জাতিক এই জলপথে টোল আরোপ করতে দেওয়া হবে না। আবুধাবিতে পৌঁছে যুদ্ধের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এটি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশই এখানে টোল বা ফি আদায় করতে পারে না।

যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থানের বিপরীতে ইরান বেশ চ্যালেঞ্জিং মনোভাব দেখাচ্ছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছে যে পশ্চিমের চেয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে হাত মেলানোই উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য মঙ্গলজনক হবে।

গালিবাফ বলেন, তারা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ সংঘাতে নয়, বরং পারস্পরিক যোগাযোগে এবং বর্জনে নয়, বরং সহাবস্থানে দেখছেন। ইরানের প্রধান আলোচক আরও পুনর্ব্যক্ত করেন যে লেবাননের শান্তি পুনরুদ্ধার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর একটি অন্যতম প্রধান শর্ত।

ইরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা চালানোর পর লেবাননও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। গালিবাফ স্পষ্ট করে বলেন, তাদের কাছে লেবাননের যুদ্ধবিরতি ইরানের যুদ্ধবিরতির মতোই গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে যুদ্ধ শেষ হওয়াটাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ।

লেবাননে যেখানে ইরান একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে বৃহত্তর চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে ধরে নিয়েছে, সেখানে ইসরাইলি বোমাবর্ষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ এখন রাস্তাঘাট থেকে ধ্বংসস্তূপ সরানোর লড়াইয়ে ব্যস্ত।

সমুদ্রতীরবর্তী টায়ার শহরের এক বাসিন্দা হুসেইন হাসান জানান, যুদ্ধের সময় পরিবার নিয়ে লেবাননের উত্তরাঞ্চলে পালিয়ে গেলেও নিজের সেলুনটি আবার খোলার জন্য তিনি চলতি সপ্তাহে ফিরে এসেছেন। একটি দেয়াল ফেটে যাওয়া এবং সামনের কাচ উড়ে যাওয়া দোকানের ভেতর গ্রাহকদের স্বাগত জানিয়ে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেন, এখানকার মানুষ জীবন ও কাজকে ভালোবাসে। তারা ধুলো ঝেড়ে ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে ওঠে। এক ডজন যুদ্ধ হলেও তারা ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে বের হয়ে আবার কাজে ফিরবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিকে জয় হিসেবে দেখানোর পেছনে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও জড়িত, কারণ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা নিয়ে কিছুটা বিভেদ ও বিরোধিতা রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিভেদ আলোচনার প্রক্রিয়াকে লাইনচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট নয়। ইয়েল ইউনিভার্সিটির লেকচারার আরশ আজিজি বলেন, আলোচনা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার তীব্র বিরোধী কিছু গোষ্ঠী অবশ্যই আছে, তবে আলোচনা বন্ধ করার বা এর ফলাফলের ওপর বড় প্রভাব ফেলার মতো প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বর্তমানে তাদের নেই।

এদিকে পাকিস্তান বুধবার জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহে টেকনিক্যাল পর্যায়ের আলোচনা আবার শুরু হবে। ইসলামাবাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি সাংবাদিকদের জানান, আগামী মঙ্গল, সোম বা বুধবারের মধ্যে এই আলোচনা শুরু হতে পারে। এই আলোচনার অন্যতম প্রধান জটিল বিষয় হলো ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, যা দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে বিরোধের উৎস।

পশ্চিমা দেশগুলোর সন্দেহ তেহরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে, যদিও ইরান বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ইরান জাতিসংঘ পরিদর্শকদের দেশে ফেরার অনুমতি দিতে সম্পূর্ণরূপে সম্মত হয়েছে, তবে ইরান তা অস্বীকার করেছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি বুধবার দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ইরানি পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে পরিদর্শন অবশ্যই ঘটবে—তা আজ, পরশু, এক সপ্তাহ বা ১০ দিন পরেই হোক না কেন।

 

সূত্র: আল-জাজিরা।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply