অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া ও সমঝোতা মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলা একাডেমির ব্যর্থতা এবং এর ফলে সৃষ্ট চরম সময়স্বল্পতার কারণে এ বছরের অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে দেশের সৃজনশীল প্রকাশকদের একটি অংশ ‘প্রকাশক ঐক্য’।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন সৃজনশীল প্রকাশকদের অস্থায়ী এ প্ল্যাটফরমের সদস্যরা।
বিবৃতিতে বলা হয়, বাধ্য হয়েই, বাস্তবতার নিরিখে ‘প্রকাশক ঐক্য’ এবারের বইমেলায় অংশগ্রহণ থেকে নিজেদের বিরত রাখছে। ‘প্রকাশক ঐক্য’-এর শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকরা মেলায় অংশ নিতে পারছেন না বলে সর্বস্তরের সাধারণ প্রকাশকরাও মেলায় অংশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন।
বইমেলায় অংশ না নেওয়ার কারণ জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, দেশের অধিকাংশ সৃজনশীল প্রকাশকের সমন্বয়ে ক্রান্তিকালে গঠিত প্ল্যাটফরম প্রকাশক ঐক্য মর্মাহত হৃদয়ে জানাচ্ছে যে, মেলার মাঠে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের অস্বচ্ছতা নিরসন না হওয়া, সমঝোতা মোতাবেক পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলা একাডেমির ব্যর্থতা, এবং এই দুইয়ের ফলশ্রুতিতে চরম সময়স্বল্পতার কারণে আসন্ন অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ আমাদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। বিবৃতিতে বলা হয়, পুরো সময়জুড়েই আমরা কর্তৃপক্ষ ও নতুন সরকারকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করতে চেয়েছি।
এই দাবির পেছনের ‘চরম সময়স্বল্পতার’ যুক্তি দেখিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, একটি প্যাভিলিয়ন নির্মাণ করতে কমপক্ষে ১০ দিন সময় লাগে। মেলা শুরু হতে মাত্র ৪ দিন বাকি। মূলধারার ও শীর্ষস্থানীয় প্রকাশকদের প্রায় ৯০ ভাগই প্রকাশক ঐক্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পূর্ববর্তী বয়কটের কারণে তারা মেলার প্রস্তুতি থেকে বিরত ছিলেন।
অন্যায্য সুবিধা ও বৈষম্যের অভিযোগ তুলে বিবৃতিতে বলা হয়, যেসব প্রকাশক বৃহত্তর ঐক্যের বাইরে গিয়ে প্যাভিলিয়ন নিয়েছিলেন, তারা সরকারের ভর্তুকি ছাড়াই ফি দিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ প্রকাশক ঐক্যের আন্দোলনের ফলেই সরকার শতভাগ স্টলভাড়া মওকুফ করেছে এবং সেই সুবিধা এখন প্যাভিলিয়নধারীরাও ভোগ করবেন। অথচ মেলার সামগ্রিক প্রস্তুতিতে তারা পূর্ব থেকেই অন্যায্য সুবিধা পেয়ে আসছেন। তাদের একটা বড় অংশের মেলায় অংশগ্রহণেরও যোগ্যতা নেই। প্রস্তুতিহীনতার চরম ঝুঁকি নিয়ে মেলায় এসে আমরা এমন বৈষম্যের শিকার হবো, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এবারের মেলার এই অস্বাভাবিক ও বিশেষ পরিস্থিতির বিবেচনায় নিয়ে সব প্যাভিলিয়ন সাময়িকভাবে বাতিল করার যৌক্তিক দাবি তোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রকাশক ঐক্য। বিবৃতিতে বলা হয়, (১৮ ফেব্রুয়ারির সভায়) দুই মন্ত্রীর সামনেই বাংলা একাডেমির ডিজি এই দাবিটিকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে আমাদের আশ্বস্ত করেন। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম, মিটিং-পরবর্তী বাংলা একাডেমির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবির কথা আদৌ উল্লেখ করা হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, এরপর বাংলা একাডেমির ডিজি ও সচিবকে এ বিষয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দিলে তারা আমাদের প্রতিনিয়ত আশ্বস্ত করেন যে, এই দাবি বাস্তবায়ন করা হবে। এমনকি গত ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়ও ডিজি আমাদের দাবি খুবই ন্যায্য বলে স্বীকার করেন।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না দেখে, এই অস্বচ্ছতা নিরসনে প্যাভিলিয়ন বাতিলের জন্য আমরা গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাত ১০টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করে বাংলা একাডেমি মহাপরিচালককে চূড়ান্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। তারপরও তাদেরই অনুরোধে ২১ ফেব্রুয়ারি সারাদিন আমরা কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক পদক্ষেপের অপেক্ষায় ছিলাম।
কিন্তু সন্ধ্যার দিকে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ফোনে আমাদের জানান, প্যাভিলিয়ন বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না এবং তিনি এবারের মতো প্যাভিলিয়ন রেখেই আমাদের মেলায় আসার অনুরোধ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা হলো, প্যাভিলিয়ন বাতিল করতে না পারার কারণে বাংলা একাডেমি আজ পর্যন্ত স্টল নম্বর বরাদ্দের লটারিও করতে পারেনি। মেলা শুরু হবে ২৫ তারিখে। লটারি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত কেউ স্টলের জায়গাই বুঝে পাননি। এমন একটি চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে, উদ্বোধনের মাত্র ৩-৪ দিন আগে কাঠামো নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ, রং শুকানো, স্টলের সাজসজ্জা এবং বই গুছিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করা কারিগরি ও বাস্তবিকভাবে কোনো প্রকাশকের পক্ষেই আর সম্ভব নয়।
শুধু স্টলভাড়া মওকুফ বা কাগজে-কলমে অন্যসকল দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসই মেলার প্রস্তুতির জন্য যথেষ্ট নয় জানিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, মেলায় অংশ নেওয়ার জন্য স্টল নির্মাণ ও বই গোছানোর ন্যূনতম সময় এবং মেলার মাঠে একটি বৈষম্যহীন পরিবেশ অপরিহার্য, যা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। স্টলের জায়গাই যেখানে আজ পর্যন্ত নির্দিষ্ট হয়নি, সেখানে শুধু ভাড়া মওকুফের সুবিধা নিয়ে খোলা মাঠে বইমেলা করা যায় না।
বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা কোনোভাবেই মেলার বা সরকারের প্রতিপক্ষ নই। আমরা চাই একুশের বইমেলা তার আপন মহিমায় উদযাপিত হোক। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো এই বইমেলার উদ্বোধন করবেন, আমরা তাঁকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই এবং এবারের বইমেলার সার্বিক সাফল্য কামনা করছি।
প্রকাশক ঐক্য বলছে, ‘আমরা আশাবাদী, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার খুব দ্রুতই বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পকে রক্ষা করার স্বার্থে প্রকাশকদের দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবেন এবং গ্রন্থখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের দিক থেকে করণীয় সকল ভূমিকা পালন করবেন। বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচিত সরকারকে এই সকল কাজে দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য আমাদের তরফ থেকে সবরকম সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
