দেশের উন্নতি হয়েছে অবশ্যই। কিন্তু কার উন্নতি? উন্নতি হয়েছে সুবিধাভোগীদের। বাদবাকিদের কী অবস্থা, তার ছবি একাত্তরের লাঞ্ছিত নারীদের কাহিনিতে পাওয়া যাবে। আর পাওয়া যাবে গভীরে, খুব গভীরে আছে যে ব্যাধি, তার ছবিতে।
৬. যুদ্ধের কারণেই জীবনডা, সংসারডা একদম তছনছ হইয়া গেছে। ৭. মুক্তিযুদ্ধ আমারে টোকাই বানাইয়া দিচ্ছে। যুদ্ধ আমার বাপ-মায়ের নাম ভুলাইয়া দিছে। আমি আমার নিজ বাড়ি চিনি না। মাইনষে জিজ্ঞাসা করলে ঠিকানা বলতে পারি না। ৮. সেদিন যদি দেশে যুদ্ধ না লাগত, তাইলে আজকা আমার জীবনডা এমন তছনছ হইত না। ৯. মুক্তিযুদ্ধের কারণে সারা জীবনটাই কষ্ট কইরা গেলাম। ১০. কী অইবো মুক্তিযুদ্ধের কথা কইয়া। এত বছর খালি বক্তৃতা দিয়া যায়। ১১. যুদ্ধের পর আমার মাথা আর উঁচু হয়নি। সেই দুঃখ সারা জীবন ধইরা আমারে এই কথাটা কইছে। আমার কি দোষ আছে? ১২. সব সময় মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খায় যে কেনই বা বাংলাদেশ স্বাধীন হইল, আমরাই বা কেন যুদ্ধ করলাম? আর কেনই বা আমরা মান-সম্মান, ইজ্জত সব হারায়ে ফেললাম।’
‘দুঃখিতের দুঃখ যায় না, সুখীর সুখ যায় না। একেবারে নির্ভুল কথা। দুঃখ বদলায় না, সুখও বদলায় না, কারণ ব্যবস্থা বদলায় না। ব্যবস্থা বদলায়নি। দেশে কান্না আছে, ধিক্কারও আছে; শোনার লোকেরই যা অভাব।’
রাষ্ট্র মূল্যায়ন করে না, সমাজ সম্মান দেয় না। একজন বলছেন, ‘আমি সম্মান দিয়া কী করুম? নিজে কামাই কইরা খাই। নিজে কামাই করতে খাটলে খাও, না খাটতে পারলে নাই।’ সমাজকে এঁরা ‘ডরান’। সাংবাদিক ও গবেষকরা যে খোঁজাখুঁজি করেন, সে বিষয়ে অন্য একজনের মতে, ‘এ রকম কইরা কথা কইলে ওহানের সমাজের মানুষ তো আমারে কিছুদিন পর ভালা পাইতো না।’ যুদ্ধের পরে নির্যাতিতা যে মেয়েটি হারিয়ে যাননি, বাড়িতে ফিরে এসেছেন, তাঁর অভিজ্ঞতা : ‘কাঁদতে কাঁদতে মা বলেছেন, আহা রে! তোরে আল্লায় বাঁচাইয়া রাখল ক্যা? তুই মইরা যা।’ অন্য একজন ভাবছেন : ‘মরি নাই। মরণ আমার কপালে ছিল না।’ আরেকজন বলছেন, ‘অপবাদের প্রতিবাদ করি নাই। খালি কানছি। প্রতিবাদ আর কী করুম? মানুষ আমারে ঘিন্না করছে।’
হানাদাররা গুলি করে স্বামীকে মেরেছে। তরুণী স্ত্রী দুঃখ করবেন, এমন সুযোগ নেই। পালাতে হচ্ছে। বলছেন, ‘কোনো বাঁশ-কাপড় ছাড়াই লাশ মাটিতে চাপা দিয়ে শুইয়ে দিলাম।’ একজনের স্বামী গেছেন হালচাষ করতে। খেতের মধ্যেই পাঞ্জাবিরা তাকে মেরে ফেলেছে। লাশ সেখানেই পড়েছিল। পরে আত্মীয়দের দু-একজন মিলে লাশ নিয়ে এসেছে, রেখেছে উঠানে। স্ত্রী স্মরণ করছেন : ‘পাঞ্জাবির ভয়ে আমি তো আর লাশের কাছে একলা একলা বসে থাকতে পারি না। আবার ওই মুহূর্তে খবর আইলো পাঞ্জাবিরা আইয়া পড়তাছে। তখন ওই মরা মানুষ থুইয়া দৌড় দিয়া পশ্চিম বাড়ি চলে গেলাম। আমার শাশুড়ি ওই লাশের পাশে বইসা থাকছে। কোরআন পড়ছে।’
আরেকজনের স্বামীকে মেরে ফেলেছে ঘরের ভেতরেই। চুয়ান্ন বছর আগের সেই ঘটনা স্মরণ করে স্ত্রী বলছেন : ‘এহন আমি কী করি? লাশ মাটি দিই কেমনে? আমি ঘরের দুয়ারে বইয়া কানতাছি। পরে ওই লাশ গলি ঘরে (গোয়ালঘরে) নিয়া থুইছি। আমার মেয়ের জন্য নতুন পায়জামা বানাইছিল, হেই পায়জামা দিয়া, লগে ৫টা খেতা (কাঁথা) দিয়া মুইড়া রাখছি, যাতে কুত্তায় না নেয়। আমার ননদের জামাইডারেও মারছে। হেরেসহ তিন-চারজনের একসাথে মাটি দিছি।’
বাপের বাড়িতে গিয়ে লুকিয়েছিলেন ওই স্ত্রী। তিন দিন পরে ফিরে আসেন। এসে দেখেন ভিটা শূন্য। ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে হানাদাররা। লুট হয়ে গেছে সব কিছু। আর স্বামীকে যেখানে মাটি দিয়েছিলেন, সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে হাড়গোড়, মাথার খুলি। শিয়াল-কুকুরে খেয়ে নিয়েছে মাংস।
নির্যাতিতা মেয়েরা বলছেন : ‘আমরা দেশের জন্য কিছু করি নাই? মান দিলাম, সম্মান দিলাম, ইজ্জত দিলাম, যুদ্ধে গেলাম। সমাজ, সরকার তার কতটুকু সম্মান, মর্যাদা, মূল্য দিল?’
বন্দি অবস্থা থেকে মুক্তিযোদ্ধারা নির্যাতিতদের একজনকে উদ্ধার করেছিলেন। মেয়েটির জন্য সেই দুঃসাহসিক মুক্তির ঘটনাও কোনো সান্ত্বনা নয়। ‘আমি এগুলো মনে রাখতেও চাই না। কেন চাই না; কারণ যে দেশের জন্য সবই হারাইলাম, তারপর বাঁচতে না পাইরা বাপ-মারে ছেইড়া ঢাকা আইসা মাইনসের বাড়ি কাম করছি। সে কথা মনে কইরা কি হইব?’
এঁরা নিজেদের ভাষায় কথা বলেছেন। এ ভাষা সাহিত্যের নয়, জীবনের। এঁদের ভিতর দুজন ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সবার ভাষা একই রকমের, তাদের পরিচয়ের মতোই। তাদের ভাষা কাজের ভাষা। দরিদ্র, নিম্নমধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের এই মানুষেরা অনার্জিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল নন, তাদের কাজ করে খেতে হয়। তাদের কাজ নানা ধরনের। তাদের জীবনে বিয়েও একটা কাজ বৈকি। ‘কাজকাম’ বলতে আসলে অনেক কিছুই বোঝায়, বিবাহসহ। একাত্তরে এঁরা প্রায় সবাই বিবাহিত ছিলেন। অল্প বয়সে বিয়ে এদের বিধিলিপি বৈকি। কিন্তু একাত্তরের পরে এঁরা নিজেদের বাড়িতে কাজকর্ম পাননি; উৎপাটিত হয়েছেন, উৎপাটনের পর জীবন আর স্বাভাবিক থাকেনি। এঁরা কাজকে ভয় পান না, ভয় পান কাজের অভাবকে। মূল্যায়ন চান না, স্রেফ বাঁচতে চান, মানুষের মতো।
একাত্তরে শুধু যুদ্ধ হয়নি, গণহত্যাও ঘটেছে। নারী নির্যাতন ছিল এই গণহত্যারই অংশ। হানাদাররা যুদ্ধ করতে হবে ভাবেনি, ভেবেছিল নির্ভয়ে হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ চালাবে। শেষ পর্যন্ত যখন দেখল যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে, তখন নৃশংস ও বেপরোয়া হয়ে উঠল। সে সময় দেশের এক বৃদ্ধার প্রলাপ শুনতে পাই। হানাদারদের উদ্দেশ করে তিনি বলেছেন, ‘তোরা কি শুধু এ দেশের মা-বোনের ইজ্জত মারবার আইছস?’ তারা ইজ্জত মেরেছে। যুদ্ধে তাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে।
আমরা জয়ী হয়েছি। কিন্তু সে জয় পরিপূর্ণ নয়। প্রমাণ? সামগ্রিক বিজয়ের অপূর্ণতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো সমাজ না-বদলানো। সমাজ তো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের মানচিত্র বৈ অন্য কিছু নয়। সে সম্পর্ক আগে যে মানবিক ছিল তা নয়, একাত্তরের পরেও মানবিক হয়নি, বরঞ্চ অনেক ক্ষেত্রে খারাপ হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশের মেয়েরা আজও ধর্ষিত হচ্ছে। দেশে হচ্ছে, বিদেশে হচ্ছে।
মেয়েদের একজন বলেছেন, ‘দুঃখিতের দুঃখ যায় না, সুখীর সুখ যায় না।’ একেবারে নির্ভুল কথা। দুঃখ বদলায় না, সুখও বদলায় না, কারণ ব্যবস্থা বদলায় না। ব্যবস্থা বদলায়নি। দেশে কান্না আছে, ধিক্কারও আছে; শোনার লোকেরই যা অভাব।
লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
