বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সাংবাদিকতার মূলভিত্তি হচ্ছে সততা। একজন ভালো সাংবাদিক কখনও মিথ্যে বা পক্ষপাতদুষ্ট খবর প্রচার করেন না। সত্য তথ্য যাচাই করে, নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে খবর পরিবেশন করা তার মূল কাজ। শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সভায় তিনি এসব বলেন।
কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বাচ্চুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক শামীম উল হাসান অপুর সঞ্চালনায় আলোচনায় অংশ নেন বিএফইউজের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ওবায়েদুর রহমান শাহীন, দপ্তর সম্পাদক আবু বকর, নুরুন্নবী বাবু,এম এ জিহাদ, আল মামুন সাগর মো. বকুল আলী, ইব্রাহীম খলিল, খালিদ হাসান সিপাই, আব্দুম মুনিব, মোস্তাফিজুর রহমান মঞ্জু, মীর আল আরেফীন বাবু, হায়দার আলী, মুজিবুর শেখমাহফুজ উর রহমান,সিহাব উদ্দিন, তারেকুল ইসলাম তারেক প্রমুখ।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সম্পদ বিশ্বাসযোগ্যতা। যে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা যত বেশি, দর্শক- শ্রোতা এবং পাঠকের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা তত বেশি। তাই জনস্বার্থে, সংবাদমাধ্যমের স্বার্থে এমনকি নিজ স্বার্থেই সাংবাদিককে তাদের প্রাত্যহিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে নৈতিকতার চর্চা করতে হয়।
অসীম ত্যাগ ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে সাংবাদিকরা সত্য তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরেন। তাই সাংবাদিকরা জাতির বিবেক হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। সাংবাদিকরা হলেন মানবতার অতন্দ্র প্রহরী। সাংবাদিকদের সমাজ ও রাষ্ট্রের ‘ওয়াচডগ’ বলা হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে, ন্যায় ভিত্তিক সমাজ তৈরিতে, অন্যায়, দুর্নীতি আর ভ্রষ্টাচারের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করতে, মানুষের সত্যিকারের কন্ঠস্বর হয়ে সাংবাদিকরা পারেন সমাজে আলোর প্রদীপ জ্বালাতে। এটিই আমাদের করতেই হবে। না হয় সাংবাদিকদের যে সম্মানসূচক উপাধি দেওয়া হয়েছে এসব কলঙ্কিত হবে। স্যামুয়েল ল্যাংহোর্ন ক্লেমেন্স যার কলম নাম মার্ক টোয়েন হিসেবে জগদ্বিখ্যাত একজন আমেরিকান লেখক, উদ্যোক্তা, প্রকাশক এবং প্রভাষক ছিলেন। তিনি সংবাদপত্রকে দ্বিতীয় সূর্যের সাথে তুলনা করেছিলেন। তার মতে পৃথিবীতে প্রতিদিন দুটি করে সূর্য উঠে। প্রথমটি পৃথিবীর প্রভাত সূর্য যা প্রকৃতির দান। আর দ্বিতীয়টি সংবাদপত্রের সূর্য। পৃথিবী আলোকে উদ্ভাসিত হয় প্রভাত সূর্যের চিরন্তন আলোয়। আমাদের সকলের জীবন তথা সমাজ আলোকিত এবং সমৃদ্ধ হয় সংবাদপত্রের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের সূর্যের দ্বীপ্ত কিরনে। অন্যদিকে হেনরী ওয়ার্ড এর মতে “সংবাদপত্র মানুষের কাছে অগনিত সোনার চেয়েও বড়ো সম্পদ।” আমাদের ভুল বা স্বার্থপরতার কারণে যেন গণমাধ্যম তার মর্যাদা না হারায়।
সাংবাদিকদের এই নেতা বলেন, পশ্চিমা দুনিয়ায় গণমাধ্যম মালিকানার সামন্ত প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারলেও বাংলাদেশে কনটেন্টের মালিক আসলে মালিকরাই। একটা সময় অল্প অল্প করে মালিকরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে গণমাধ্যমকে কিছু কিছু করে ব্যবহার করলেও এখন সেটাই কোনও কোনও গণমাধ্যমের মূল কাজ। এর সাথে নতুন করে বড় আকার যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক স্বার্থ। ফলে অনেকেই বলে থাকেন, ‘সম্পাদকরা আসলে কর্পোরেট এডিটোরিয়াল ম্যানেজার’। সাংবাদিকরা হলেন কর্পোরেট এডিটোরিয়াল এক্সিকিউটিভ। কর্পোরেট পলিসি ও সম্পাদকীয় নীতিতে কোনও পার্থক্য নেই। সাংবাদিকরা সেই নীতির বাস্তবায়ন করেন সাংবাদিকতার নামে। সত্যি বলতে কি দু’একটি বাদ দিলে গণমাধ্যম হাউজগুলোর কোনও প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। তাই তারা সাংবাদিকদের নিরপেক্ষ অবস্থানকে সমর্থন করতে পারে না ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সুরক্ষাও দিতে পারে না।
দলদাস সাংবাদিকদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিগত সরকারের সময় দলদাস সাংবাদিকতা এতই বেড়েছিল যে সাংবাদিক আর রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে ফারাক খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল। যা সাংবাদিকতার মর্যাদাকে ম্লান করে দিয়েছে।তাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট সরকার পতন হলে সাংবাদিকদের অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। কেউ কেউ পালিয়েছেন,আবার কেউ কেউ পালিয়ে যাওয়ার সময় গ্রেফতার হয়েছেন। অনেক সাংবাদিক পদ-পদবি হারিয়েছেন। এগুলো দুঃখজনক ও অস্বাভাবিক বিষয়। তবে যারা পালিয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন কিংবা পদ হারিয়েছেন তাদের লেজুড়বৃত্তি ও দালালি নিশ্চয়ই অযৌক্তিক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। গণমাধ্যমকে তারা গণমানুষের আকাঙ্খার জায়গায় ধরে রাখতে পারেনি। সরকারকে তুষ্ট করতে গিয়ে তারা জন-আকাঙ্খার কথা ভুলেই গিয়েছিল। এখানেই গণমাধ্যমকর্মীদের নৈতিক পরাজয় ঘটেছে। অনেকে মালিকপক্ষের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নিজেদের নৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। অনেকেরই নিজের চাকরি ও পরিবারের ভরণ-পোষণের চিন্তা করতে হয়েছে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু অনেক সাংবাদিক লেজুড়বৃত্তি ও সরকারের নির্লজ্জ দালালি করে অনেক অনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। অনেকে একাধিক গণমাধ্যমের মালিক হয়েছেন। সঙ্গে গাড়ি-বাড়ির মালিক হয়েছেন। তাদের বিষয়টি ভিন্ন লেন্সে দেখার যৌক্তিকতা আছে। তারা গণশত্রুদের মুখোশ উন্মোচন না করে গণশত্রুদের দালালি করেছেন। বিনিময়ে পেয়েছেন অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা। অনেকক্ষেত্রে তাদের অনৈতিক সুবিধার বলি হয়েছে সাধারণ মানুষ।
বিএফইউজে মহাসচিব বলেন,সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা। লেখনীর মাধ্যমে সাংবাদিকরা সত্য উদ্ঘাটন, দুর্নীতি উন্মোচন ও জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে। যার ফলে আমাদের দেশে সাংবাদিকদের কাজের ক্ষেত্রটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। গত দুই দশকে ৬৮ জন সাংবাদিককে জীবন দিতে হয়েছে। আহত হয়েছেন শত শত সাংবাদিক। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন সাংবাদিক নির্যাতনের খবর দেখতে হয় আমাদের। তাই পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকরা অনেক ধরনের হুমকি, হেনস্তা এবং শারীরিক আক্রমণের শিকার হচ্ছে। এতে সাংবাদিকদের কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী এবং কার্যকর আইন প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরো বলেন, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যেমন পুঁতে রাখা হয় স্থলমাইন, তেমনি সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধে নানা ধরনের স্থল মাইন ছড়িয়ে আছে। এই স্থলমাইন হচ্ছে বিভিন্ন নিপীড়নমূলক আইন। সাংবাদিকদের ধরতে অন্তত ২০টি আইন আছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এমন আইন রয়েছে ৩২টি।এমতাবস্থায় সাংবাদিকরা কিছু লিখতে গেলে, বলতে গেলে ৩২ বার ভাবেন। আইনের ফাঁদে পড়ার ভয়ে অনেকে সেলফ সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হন।
ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের এক বছর পরও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিরোধী কালো আইন বাতিল না হওয়ায় কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, সাংবাদিক ও সাংবাদিকতার জন্য মামলা একটি বড় ঝুঁকি আর হয়রানির ক্ষেত্র। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা আরো প্রকট। দেশে বিদ্যমান বিচার ব্যবস্থা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বছরের পর বছর মামলা চলে। এসব ক্ষেত্রে যারা মামলা করেন তারা সাধারণ প্রভাবশালী, বিত্তশালী কিংবা ক্ষমতাধর। তাদের খরচ চালাতে অসুবিধা হয় না। সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশককে দীর্ঘদিন ধরে হাজিরা দিতে হয়। মামলা পরিচালনার খরচ তো আছেই। অনেক পত্রিকা খরচ দেয় না। বিশেষ করে মামলা চলাকালে পত্রিকা চেঞ্জ করলে বিড়ম্বনার পড়তে হয়।
সরকার সাংবাদিকতার অধিকার সুরক্ষা নীতিমালার উদ্যোগ নিয়েছেন। এই নীতিমালায় আইনি সুরক্ষার বিষয়টি আসলেও চাকরি ক্ষেত্রে সুরক্ষার বিষয়টি এখানে সেভাবে আসেনি। অধিকাংশ পত্রিকা সাংবাদিকদের নিয়মিত বেতন দেয়না, পাওনা না দেয়া এবং যখন তখন চাকুরিচ্যুতির সুবিধার্থে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের নিয়োগপত্র দেন না। ৬ মাস পর চাকরি স্থয়ী করার নিয়ম থাকলেও তা মানেন না। ওয়েজবোর্ড অনুযায়ী বেতন দেন না ৯০ ভাগ গণমাধ্যমে। চাকরি চলে গেলে বা চাকরি ছেড়ে দিলে দেনা পাওনা পরিশোধ করে না। এ বিষয়ে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। অধিকাংশ গণমাধ্যম ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের বেতন দেন না। কিছু কিছু পত্রিকা ২ থেকে ৫ হাজার বেতন দেন। আবার কোনো কোনো টিভি জেলা প্রতিনিধিও কাছ থেকে উল্টো টাকা চায়। এভাবে সাংবাদিকদের দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নীতিমালা থাকা অত্যন্ত জরুরি। পেশাগত দায়িত্বপালনকালে বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ এসাইনমেন্টে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যামেরা, ল্যাপটপ, মোটর সাইকেল, গাড়ি মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়। এ ক্ষেত্রে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। শারীরিক ক্ষতির জন্য দুর্ঘটনা বিমা থাকতে হবে। চিকিৎসার ব্যবস্থা মালিকপক্ষকেই নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এসাইনমেন্ট কাভারের জন্য প্রতিষ্ঠানকে অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংবাদপত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে পত্রিকার বিজ্ঞাপন রেট বাড়ানো উচিত। করপোরেট ট্যাক্স ৩৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা, নিউজপ্রিন্ট আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বাদ দেওয়া, বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর উৎসে কর (টিডিএস) ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা এবং উৎসস্থলে কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশের বদলে অগ্রিম কর (এআইটি) শূন্য শতাংশ করা খুবই জরুরি বলে আমি মনে করি।
অনুষ্ঠানে ওবায়দুর রহমান শাহীন বলেন, সাংবাদিকতা হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা ও মানবিক চেতনা বিকাশের কেন্দ্র এবং নীতি-নৈতিকতা, দায়-দায়িত্ব ও বুদ্ধি-বিবেকের আধার। তাই সৃজনশীল গণমাধ্যম ও সম্মানজনক পেশা হিসেবে সংবাদপত্র অগ্রগণ্য। তবে সবচে’ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাহসী, সংবেদনশীল ও নির্মোহ, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ, সত্যনিষ্ঠ ও গণসম্পৃক্ত সার্বক্ষণিক পেশা সাংবাদিকতা। সংবাদপত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হল দল নিরপেক্ষ সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা। সংবাদপত্র যতবেশি নিরপেক্ষ হবে এবং সাংবাদিকরা যত বেশি নির্ভীক ও সৎ হবে দেশ ও জাতির তত বেশি মঙ্গল হবে। আর সেজন্যই তো সাংবাদিকদের সমাজের অতন্দ্র প্রহরী বা ‘গেট কিপারস’ বলা হয়। তবে আভিধানিকভাবে সংবাদপত্রের এসব বৈশিষ্ট্য হলেও, অনেক সংবাদপত্র ও সাংবাদিক নানা স্বার্থে উল্টাপথে হাঁটেন বা অপসাংবাদিকতায় মেতে ওঠেন।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
