Wednesday , 24 June 2026
E- mail: news@dainiksakalbela.com/ sakalbela1997@gmail.com
ব্রেকিং নিউজ
মব সন্ত্রাসে বেহাল শিক্ষা
--প্রতীকী ছবি

মব সন্ত্রাসে বেহাল শিক্ষা

অনলাইন ডেস্ক:

মব কালচারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। জুলাই আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আমাদের শিক্ষার্থীরা। রক্ত দিয়ে তারা বাংলাদেশকে স্বৈরাচার মুক্ত করে। তাদের এই অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে।

সবাই আশা করেছিল, স্বৈরশাসনের পতনের পর শিক্ষার্থীরা আবার শ্রেণি কক্ষে ফিরে যাবে। লেখাপড়ায় মনোযোগী হবে। কিন্তু বাস্তবে তেমনটা হয়নি। গত ১৬ মাসে শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসেনি।
মব সন্ত্রাস, মারামারি হানাহানিতে শিক্ষার এখন বেহাল দশা। বিভিন্ন দাবিতে, শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আন্দোলন করছে। এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে। পরীক্ষা না দিয়ে অটোপাসের জন্য সচিবালয় ঘেরাও করছে।
মব করে শিক্ষক অপসারণ করছে। সব মিলিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখন শিক্ষার পরিবেশ নেই।গত বছরের ৫ আগস্টের পর শিক্ষকরা সবচেয়ে বেশি মবের শিকার হয়েছেন। শিক্ষকদের অপমান, অপদস্ত করে পদত্যাগে বাধ্য করার ধারা বাংলাদেশে এখনো চলমান। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এহেন তৎপরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখা যায়নি।

শিক্ষকের লাগাতার মর্যাদাহানির প্রভাব দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পড়বে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।মবের সব শেষ ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে মব সহিংসতা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ছয়জন ডিনকে যেভাবে তাদের দায়িত্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে, সেটাকে এককথায় ‘মবের মুল্লুক’ বলা যায়। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচনের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়া ডিনদের মেয়াদ শেষ হয় ১৭ ডিসেম্বর। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডিন নির্বাচন সম্ভব না হওয়ায় ১১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসন ১২টি অনুষদের ডিনদের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ছয়জন ডিনকে ‘আওয়ামীপন্থী শিক্ষক’ আখ্যা দিয়ে তাদের পদত্যাগের জন্য রাকসুর জিএস সময় বেঁধে দেন। শুধু সময় বেঁধে দিয়েই ক্ষান্ত হননি, গত রবিবার (২১ ডিসেম্বর) তিনি নিজে একটি ‘পদত্যাগপত্র’ লিখে এনে রাকসু ভবনের সামনে থেকে ডিনদের ফোন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক একজন উপাচার্য ক্লাস নিচ্ছেন, শুনতে পেরে তাঁর বিভাগেও যান। এরপর একদল শিক্ষার্থী তিনজন ডিনসহ উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসন ভবনের সব দপ্তরের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রবিবার সন্ধ্যায় ডিনদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ হাসান নকীব। সেখানে ডিনরা তাদের রুটিন দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানিয়ে লিখিত আবেদনপত্র দেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনাকে গত ১৬ মাসের মব সহিংসতা থেকে আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই। গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের লাঞ্ছনা, জোরপূর্বক পদত্যাগের মতো অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষকদের সুরক্ষায় শক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হওয়ায় কিছু ব্যক্তি, গোষ্ঠী নিজেদেরকে সব আইনকানুনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে এ কারণেই এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারি হাজি তোবারক আলী উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কান্তি লাল আচার্যকে মব তৈরি করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় গত এপ্রিলে। স্থানীয় এক বিএনপি নেতা ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হতে না পারায় তিনি তার দলবল নিয়ে প্রধান শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন বলে অভিযোগ।

আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব তৈরি করে শিককদের পদত্যাগে বাধ্য করানো শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থেকে শুরু করে কলেজ, স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয় সর্বত্র এমন ঘটনা ঘটেছে। মারধর এবং মামলা থেকেও রেহাই পাননি শিক্ষকরা। প্রথম দিকে ছাত্রদের মাধ্যমে এটা করানো হলেও পরে এর সঙ্গে নানা রাজনৈতিক ও স্বার্থান্বেষীমহলও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়।

কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলে জানা গেছে, এখনো অনেক শিক্ষক আছেন, যারা চাকরিতে বহাল থাকলেও তাদের ক্লাস নিতে দেওয়া হচ্ছে না।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত অন্তত দুই হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষককে এভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৮০০ শিক্ষক চাকরি ফিরে পেতে আদালতে গিয়েছেন। শুধু ঢাকা শহরেই পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন দুই শতাধিক শিক্ষক। এই শিক্ষকরা বেতনও পাচ্ছেন না।

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দাবি করেন, যাদের পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তাদের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো প্রমাণ পাওয়া যাবে না, তাদের সবেতন চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে।

গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার অদূরে সাভারে আশুলিয়ার খাগান এলাকায় বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সিটি ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষ বাধে। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। পুলিশের হিসাবে গত ১৬ মাসে ১ হাজার ৭৮৩টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। এসব ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিরাজ করছে চরম বিশৃঙ্খলা এবং অস্থিরতা।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন।

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply