আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রচারণায় এবার স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যাপক ব্যবহার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও, ছবি ও অডিও ব্যবহার করে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষে প্রচারণা যেমন চালানো হচ্ছে, তেমনি প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতেও এসব কনটেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে আয়োজিত হতে যাওয়া প্রথম নির্বাচনে এআই যে বড় একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা।
বেশিরভাগ ভিডিও জামায়াতের সমর্থনে
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে সাহায্য পাঠাতে জনসাধারণের কাছে বিকাশ নম্বর চাইতে দেখা যায়—এআই দিয়ে তৈরি এমন একটি ভিডিও কয়েক সপ্তাহ আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি তার মেয়ে জাইমা রহমানের নামে খোলা একটি ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট করা হয়েছিল।
আচরণবিধির বিধান
নির্বাচনী আচরণবিধির ১৬(ছ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করিবার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্র হনন কিংবা সুনাম নষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন করিয়া কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল বা কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় তৈরি প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করিতে পারিবেন না।
এআই কনটেন্টের ধরন
ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন, এআই নির্মিত ভিডিওগুলোর মধ্যে নিখাদ প্রচারণামূলক কনটেন্টের পাশাপাশি বিদ্বেষমূলক, আক্রমণাত্মক এমনকি ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক কনটেন্টও রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘যে যার উদ্দেশ্য থেকে এই কন্টেন্টগুলো তৈরি করছে। কেউ নির্বাচনের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে তৈরি করছে। কেউ দলের পক্ষে তৈরি করছে, কেউ বিপক্ষে তৈরি করছে।’
তার মতে, কোনো ধরনের স্বচ্ছতা ছাড়াই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এটা প্রযুক্তির কারণে সহজ হয়েছে এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে ব্যাপক হয়েছে।’
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
ডিসমিসল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াতের সমর্থনে ছড়িয়ে দেওয়া ভিডিওগুলোতে বিএনপিকে চাঁদাবাজ ও প্রতারক হিসেবে দেখানো হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপির সমর্থনে ছড়ানো এআই ভিডিওগুলোতে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হচ্ছে।
এআই কনটেন্ট নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং একে অপরকে দায়ী করছে। তবে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তারা অস্বীকার করছে।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এটি সার্বজনীন অভিযোগ যে তারা বিভিন্ন ধরনের চরিত্র হননে লিপ্ত রয়েছেন।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘অন্যায়-অসৎভাবে কিছু করলে তার পরিণামটা ভালো হয় না। দিনশেষে জনগণের কাছে আমাদের যেতে হবে এবং এধরনের মিথ্যাচার বা অপপ্রচার জনগণের কাছে একসময় স্পষ্ট হয়ে যাবে।’
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশনের আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলের মুখ্য সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘ইউএনডিপির সঙ্গে আমরা একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছি, আচরণবিধির সাথে কাস্টমাইজ করে এটার সঙ্গে এআইয়ের মাধ্যমে স্ক্যানিং ব্যবস্থা করা আছে।’
তবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে তিনি জানান, গুরুতর প্রকৃতির যেসব কনটেন্ট আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ করতে বা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারে, কেবল সেগুলোর ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাই করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে জানানো হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণের সীমা
বিশ্লেষকদের মতে, কম খরচে দ্রুত এআই কনটেন্ট তৈরির সুযোগ অনেক প্রার্থীর জন্য প্রচারণাকে সহজ করেছে এবং এক ধরনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করছে। তবে এআই-নির্মিত কনটেন্টে স্পষ্ট লেবেলিং নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত না হন।
একই সঙ্গে এআই কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সীমা নির্ধারণে সতর্ক থাকার কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মিরাজ আহমেদ চৌধুরীর মতে, ক্ষতিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি হলেও দক্ষতা ছাড়া তা করতে গেলে সাধারণ সমালোচনাও দমন হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এই ক্যাপাসিটি ইলেকশন কমিশনের কতটুকু আছে আমার জানা নাই।’
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
