ব্রেকিং নিউজ
Home » ইসলাম » কোরআনে প্রাণী ও প্রকৃতির কথোপকথন
কোরআনে প্রাণী ও প্রকৃতির কথোপকথন

কোরআনে প্রাণী ও প্রকৃতির কথোপকথন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বহু বিষয়ের অর্থ ও মর্ম মানুষের মন-মস্তিষ্কের গভীরে বসিয়ে দিতে কোরআনে তা কথোপকথনরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে একাধিক কথোপকথনে আল্লাহ মানুষ ও বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণীর মতো অন্যান্য প্রাণী ও প্রকৃতিকে সম্বোধন করেছেন। তাফসিরবিদরা বলেন, কোরআনের ছয়টি সুরায়, দুই শ আয়াতে ৩৫ প্রজাতির পশু-পাখির আলোচনা এসেছে। সাধারণ বর্ণনার পাশাপাশি মহান আল্লাহ তাদের কথোপকথনও উল্লেখ করেছেন।

প্রাণী ও প্রকৃতির কথোপকথন সম্পর্কে বিশ্বাস

এসব আয়াতের ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের বিশ্বাস হলো, যেহেতু আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা, তিনি সব সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং এসব প্রাণী ও প্রকৃতির পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের মাধ্যমও তাঁর সৃষ্টি, তাই কোরআনের আয়াতগুলো রূপক অর্থে গ্রহণ করা আবশ্যক নয়। তবে কেউ যদি এগুলোকে ‘রূপক’ ও ‘উপমা’র অর্থে গ্রহণ করে, তবু তা কোরআনের উচ্চতর সাহিত্যমানেরই প্রমাণ বহন করে।

কথোপকথনরূপে উপস্থাপনের রহস্য

সাইয়েদ কুতুব শহীদ (রহ.) এসব কথোপকথন, উপমা, রূপক ও দৃশ্যকল্পের অবতারণার উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, ‘কোনো কোনো সময় চিন্তার জগৎ থেকে বাস্তব জগতের দিকে দৃষ্টি ফেরানোর জন্য এ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছে। অর্থাৎ কল্পিত বিষয়কে ইন্দ্রিয়ানুভূতির বিষয়ে পরিণত করা। তেমনিভাবে মানুষের স্বরূপ এবং প্রকৃতিকেও বোধগম্য চিত্রে পরিণত করা হয়। অনেক সময় অনুভবের বিষয়কে কল্পিত চিত্রে প্রকাশ করা হয়। এরপর সেই চিত্রকে গতিশীল করার জন্য তার মধ্যে জৈবিক তৎপরতা সৃষ্টি করা হয়। ফলে তা চিন্তার জগৎকে আলোড়িত করে তোলে। তখন ইন্দ্রিয়াতীত বস্তু এক জীবন্ত চলমান ছবি হয়ে চোখের সামনে ভেসে ওঠে।’ (আল-কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য, পৃষ্ঠা ৯১)

প্রাণী ও প্রকৃতির কয়েকটি কথোপকথন

কোরআনে বর্ণিত প্রাণী ও প্রকৃতির কয়েকটি কথোপকথন উল্লেখ করা হলো।

ফেরেশতাদের কথোপকথন : কোরআনে ফেরেশতাদের একাধিক কথোপকথনের বিবরণ এসেছে। তার একটি হলো, ‘তিনি আদমকে যাবতীয় নাম শিক্ষা দিলেন, অতঃপর সে সমুদয় ফেরেশতাদের সম্মুখে প্রকাশ করলেন এবং বললেন, এগুলোর নাম আমাকে বলো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। তারা বলল, আপনি মহান, পবিত্র। আপনি আমাদেরকে যা শিক্ষা দিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের তো কোনো জ্ঞান নেই। বস্তুত আপনি জ্ঞানময় ও প্রজ্ঞাময়। তিনি বললেন, হে আদম! তাদেরকে এসবের নাম বলে দাও। সে তাদের এসবের নাম বলে দিলে তিনি বলেন, আমি কি তোমাদের বলিনি যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বস্তু সম্পর্কে আমি নিশ্চিতভাবে অবহিত এবং তোমরা যা ব্যক্ত করো বা গোপন রাখো আমি তা-ও জানি?’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ৩১-৩৩)

শয়তানের কথোপকথন : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি ফেরেশতাদের বলি, তোমরা আদমকে সিজদা করো। ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। সে সিজদাকারীদের অন্তর্ভুক্ত হলো না। তিনি বললেন, আমি যখন তোমাকে আদেশ দিলাম তখন কী তোমাকে নিবৃত্ত করল যে, তুমি সিজদা করলে না? সে বলল, আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বললেন, এখান থেকে নেমে যাও। এখানে থেকে অহংকার করবে তা হতে পারে না। সুতরাং বের হয়ে যাও, তুমি অধমদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ১১-১৩)

অনাগত দিনের কথোপকথন : পবিত্র কোরআনে আল্লাহ অনাগত দিনের কথোপকথনের বর্ণনা দিয়ে অনবদ্য চিত্রকল্প সৃষ্টি করেছেন। এর মধ্যে আছে পরকালে জান্নাতি ও জাহান্নামির মধ্যে, অনুসারী ও অনুসৃতদের মধ্যকার কথোপকথন। যেমন ইরশাদ হয়েছে, ‘জাহান্নামিরা জান্নাতবাসীদের সম্বোধন করে বলবে, আমাদের ওপর কিছু পানি ঢেলে দাও, অথবা আল্লাহ জীবিকাস্বরূপ তোমাদের যা দিয়েছেন তা থেকে কিছু দাও। তারা বলবে, আল্লাহ এই দুটি অবিশ্বাসীদের জন্য হারাম করেছেন।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৫০)

পিপীলিকার কথোপকথন : সুলাইমান (আ.) তাঁর বাহিনী নিয়ে বের হওয়ার পর একটি পিঁপড়ার ঢিবির নিকটবর্তী হলে পিঁপড়াদলের সর্দার নিজ গোত্রকে সতর্ক করে। কোরআনে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যখন তারা পিঁপড়া অধ্যুষিত উপত্যকায় পৌঁছাল, তখন একটি পিঁপড়া বলল, হে পিঁপড়া বাহিনী! তোমরা তোমাদের ঘরে প্রবেশ করো। যেন সুলাইমান ও তার বাহিনী তাদের অজ্ঞাতসারে তোমাদেরকে পদতলে পিষিয়ে না ফেলে।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ১৮)

পাখির কথোপকথন : নবী সুলাইমান (আ.)-এর সঙ্গে একটি পাখির কথোপকথনের বর্ণনা এভাবে এসেছে, ‘সুলাইমান পাখিদলের খবর নিল এবং বলল, ব্যাপার কী, হুদহুদকে দেখছি না যে! সে অনুপস্থিত নাকি? সে উপযুক্ত কারণ না প্রদর্শন করলে আমি অবশ্যই তাকে কঠিন শাস্তি দেব অথবা জবাই করব। অনতিবিলম্বে হুদহুদ এসে পড়ল এবং বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি এবং সাবা থেকে সুনিশ্চিত সংবাদ নিয়ে এসেছি। আমি এক নারীকে দেখলাম, তাদের ওপর রাজত্ব করছে। তাকে দেওয়া হয়েছে সব কিছু এবং তার আছে এক বিরাট সিংহাসন।’ (সুরা : নামল, আয়াত : ২০-২৩)

আগুনকে সম্বোধন : ইবরাহিম (আ.)-এর ঘটনার বিবরণে মহান আল্লাহ আগুনকে এমনভাবে সম্বোধন করেছেন যেভাবে মানুষ পরস্পরকে সম্বোধন করে থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা তাঁর ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করেছিল। কিন্তু আমি তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করলাম সর্বাধিক।’ (সুরা : আম্বিয়া, আয়াত : ৬৯-৭০)

পাহাড়কে সম্বোধন : আল্লাহ তাআলা পাহাড়কে সম্বোধন করে বলেছিলেন, তারাও যেন দাউদ (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি নিশ্চয়ই দাউদের প্রতি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং আদেশ করেছিলাম, হে পর্বতমালা! তোমরা দাউদের সঙ্গে আমার পবিত্রতা ঘোষণা করো এবং পাখিদেরও।’ (সুরা : সাবা, আয়াত : ১০)

নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে সম্বোধন : নুহ (আ.)-এর সময় প্রলয়ংকরী প্লাবনের পর আল্লাহ নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলকে সম্বোধন করে বলেন, ‘এরপর বলা হলো, হে পৃথিবী তুমি তোমার পানি গ্রাস করে নাও এবং হে আকাশ! ক্ষান্ত হও। এরপর বন্যা প্রশমিত হলো এবং কাজ শেষ হলো। নৌকা জুদি পর্বতের ওপর স্থির হলো এবং বলা হলো, অবিচারকারী সম্প্রদায় ধ্বংস হোক।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৪৪)

About Syed Enamul Huq

Leave a Reply

WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com