রংপুর ব্যুরো
বাংলাদেশ একটি প্রধান তামাক উৎপাদনকারী দেশ। তবে এ উৎপাদন যখন জনবহুল এলাকায়—স্কুল, বাজার, রাস্তা কিংবা বাসাবাড়ির পাশ ঘেঁষে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তখন তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হয়ে দাঁড়ায় নীরব ঘাতক। রংপুর শহরের উপকণ্ঠ এবং সদর, হারাগাছ ও গংগাচড়া থানার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে অসংখ্য তামাক ক্রাসিং মিল। এসব মিল মেইন রাস্তা, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরেই কার্যক্রম চালাচ্ছে, যেন আইন ও নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই।
অবৈধ মিল গড়ে উঠছে কিভাবে? প্রশ্ন উঠেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া জনবহুল এলাকায় কীভাবে এসব তামাক প্রক্রিয়াজাত মিল গড়ে উঠছে? বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, সংবেদনশীল এলাকা যেমন স্কুল, হাসপাতাল বা জনবসতিপূর্ণ স্থানে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প স্থাপন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব মিল চালু করতে হলে পরিবেশ ছাড়পত্র ও ঊওঅ (ঊহারৎড়হসবহঃধষ ওসঢ়ধপঃ অংংবংংসবহঃ) বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অধিকাংশ মিলই চলছে এই সব আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা: তামাক কেটে গুঁড়া করার প্রক্রিয়ায় বাতাসে ছড়ায় অদৃশ্য ধূলিকণা।
এ ধূলিকণায় থাকে বিষাক্ত রাসায়নিক, যা শিশুদের ফুসফুস ও শ্বাসনালীতে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক শিশু চিকিৎসক বলেন, “তামাকের ধুলা চোখ ও ফুসফুসে প্রদাহ তৈরি করে, যা শিশুদের জন্য মারাত্মক। ৫ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে।” শিক্ষকরা জানিয়েছেন, অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। তারা মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ অনুভব করে। এক অভিভাবক বলেন, “আমার ছেলের গলা সবসময় খুসখুস করে, আগে এমন ছিল না।” প্রশাসনের নীরবতা ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া : স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, অধিকাংশ মিল মালিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের নেতা কিংবা তাদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় প্রশাসনের কেউ তেমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। ফলে এসব অবৈধ তামাক মিল বন্ধে জনগণের চাওয়া উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
কৃষিজমির ক্ষতি ও পরিবেশদূষণ: তামাক গুঁড়ো করার এই প্রক্রিয়ায় কেবল মানুষের স্বাস্থ্যই নয়, আশপাশের কৃষিজমিও বিপদের মুখে পড়ছে। বায়ু দূষণের পাশাপাশি মাটির উর্বরতাও নষ্ট হচ্ছে।
সমাধানের পথ কী? বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ আন্দোলনকারীরা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কিছু সুপারিশ দিয়েছেন: ১. জনবসতি, স্কুল, হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে তামাক মিল নিষিদ্ধ করা। ২. সব তামাক মিলের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করা এবং বছরে অন্তত দুবার পরিদর্শনের নিয়ম চালু করা। ৩. তামাকচাষ নিরুৎসাহিত করে বিকল্প ফসলের জন্য ভর্তুকি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। ৪. শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা। তামাক শুধু ধূমপানের জন্য নয়, এর উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণও হতে পারে ঘাতক। রাস্তাঘাট, স্কুল ও বাসাবাড়ির পাশেই যদি এই ধরণের তামাক মিল গড়ে ওঠে, তাহলে তা কোনো একক ত্রুটি নয়—বরং এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা ও প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি। শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মানুষের জীবন যেন কিছু মিল মালিকের মুনাফার বলি না হয়—এটা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
