ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন “মণ্ডা” দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে বাঙালির রসনাকে আকৃষ্ট করে আসছে। ১৮২৪ সালে গেঁাপাল পাল নামের এক মিষ্টান্ন কারিগর ছানা ও চিনি দিয়ে তৈরি করেছিলেন এই অনন্য স্বাদের মিষ্টি। প্রথমে এটি মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর বাড়িতে পেঁৗছায়। মহারাজ স্বয়ং এর স্বাদ নিয়ে মুগ্ধ হয়ে যান। এরপর থেকে নিয়মিতই জমিদার বাড়িতে অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত হতে থাকে মণ্ডা। দুই শতক পেরিয়ে আজও সেই ঐতিহ্য বহন করে চলছে গেঁাপাল পালের বংশধরেরা। বর্তমানে মণ্ডা প্রস্তুত ও বিক্রির কাজ পরিচালনা করছেন গেঁাপাল পালের পঞ্চম প্রজন্ম। যদিও দোকানে কর্মচারী রয়েছে, তবে মণ্ডা তৈরির গোপন রেসিপি আজও কেবল পরিবারের সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুক্তাগাছার মণ্ডা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য ‘জিআই পণ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
এই স্বীকৃতির ফলে শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও মণ্ডার পরিচিতি আরও সুদৃঢ় হয়েছে। মুক্তাগাছার জগৎ কিশোর রায় সড়কে অবস্থিত গেঁাপাল পালের ঐতিহ্যবাহী মণ্ডার দোকানে আজও প্রতিদিন ভিড় করেন শত শত মানুষ। কেউ দূর—দূরান্ত থেকে মোটরসাইকেল চালিয়ে আসেন, আবার কেউ আসেন পরিবারসহ। দোকানের ম্যানেজার লিটন মিয়া জানান, “তরুণেরা শুধু মণ্ডা খেতেই আসে না, ইতিহাস জানতে চায়, ছবি তোলে এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে।”
৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা পরিতোষ কর স্মৃতিচারণ করে বলেন, “ষাটের দশকে আট আনা দিয়ে বড় একটি মণ্ডা কিনে খেতাম। এমনও হয়েছে, ৫ টাকায় এক সের মণ্ডা কিনেছি। শিশুরা দোকানের সামনে দাঁড়ালে অনেক সময় পয়সা ছাড়াই মণ্ডা খাওয়ানো হতো।” ইউকিপিডিয়া ও মণ্ডার দোকান সূত্রে জানা যায়, ১৯০৭ সালে গেঁাপাল পাল মারা যাওয়ার পর তার উত্তরসূরি রাঁধানাথ পাল, কৈঁদারনাথ পাল ও দ্বঁারিকানাথ পাল দোকানটি পরিচালনা করেন। বর্তমানে পঞ্চম প্রজন্ম এ ঐতিহ্য রক্ষা করে চলেছেন। পরিবারে যারা উচ্চশিক্ষিত হয়ে দেশের বাইরে থাকেন, তারাও ছুটিতে বাড়ি এলে মণ্ডা তৈরিতে সাহায্য করেন। মণ্ডার সুখ্যাতি কেবল এ অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। উপমহাদেশের কিংবদন্তি সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিরাও মুক্তাগাছার মণ্ডার স্বাদ গ্রহণ করেছেন। জানা যায়, ভাসানী একবার চীনের মাও সে তুংয়ের জন্যও এই মিষ্টান্ন উপহার হিসেবে নিয়ে যান। দুই শতকের বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এ মিষ্টান্ন শুধু একটি খাবার নয়—এটি হয়ে উঠেছে বাঙালির গৌরবময় সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
