চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার বড় দুধপাতিলা ও ডিহিকৃষ্ণপুর গ্রামের গাবতলা পাড়ায় আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ বছরে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনো প্রায় ৪৬৭ জন নারী—পুরুষ এ ক্ষত নিয়ে েঁবচে আছেন। দুই গ্রামে শত শত টিউবওয়েলে পাওয়া যাচ্ছে ভয়ংকর মাত্রার আর্সেনিক। বিষাক্ত পানি পান করে অজান্তেই মৃত্যুর দিকে ঝুঁকছে এই গ্রামের বাসিন্দারা। দর্শনা থানাধীন বড় দুধপাতিলা গ্রামের ২৫৮টি পরিবারের অন্তত ৪০০ জন এবং ডিহিকৃষ্ণপুর গাবতলা পাড়ার ৬০ থেকে ৬৫ পরিবারের প্রায় ১৮৫ জন মানুষ আর্সেনিক আক্রান্ত। এসব এলাকার টিউবওয়েল থেকে প্রতিনিয়ত সংগ্রহ করা পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি মিলেছে।
বড় দুধপাতিলা গ্রামের বাসিন্দারা জানান, এ গ্রামে আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে গত ২৫ বছরে মৃত্যুবরণ করেছেন— আব্দুল মান্নান মেম্বর, তাঁর স্ত্রী মাজেদা খাতুন, মিনারুল ইসলাম, ভাষরুল ইসলাম, আজিজুল ইসলাম, নুর ইসলাম, আফসার আলী, আয়তুল্লাহ, গাজির উদ্দিন মন্ডল, রেনুকা খাতুন ও সাদু খাতুনসহ মোট ১৪ জন। এছাড়াও এ গ্রামে বর্তমানে আর্সেনিক আক্রান্ত স্বাস্থ্য কার্ডধারী রয়েছেন অন্তত ২৫০ জন। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন—রুবেল হোসেন (৩৫), রহিমা খাতুন (৫৫), বাবুল হোসেন (৩৭), সামিরন খাতুন (৪৮), আরসাদ আলীসহ (৪৬) প্রায় ৪০০ জন। এ এলাকায় ২৫৮টি টিউবওয়েলে আর্সেনিক পাওয়া গেছে।
ডিহিকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আর্সেনিক আক্রান্ত হয়ে এ গ্রামে মৃত্যুবরণ করেছেন— আব্দুস সাত্তার, হাফিজুল, হায়দার, ডাবলু, বাবলু, লাবলু, সাহার আলী, নছিরন বেগম, আজিজুল, আমজেদ, আমানত ও জামাল হোসেনসহ ১২ জন। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ ও ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, জেলার দামুড়হুদা উপজেলার ৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২২টি শ্যালোমেশিনের মধ্যে ১ হাজার ৮৬৪টিতে আর্সেনিক ধরা পড়েছে। দর্শনা পৌরসভার ৪ হাজার ৭৭৩টি টিউবওয়েলের মধ্যে ১ হাজার ৬৭টিতে রয়েছে আর্সেনিক।
এদিকে, ২০০২ সালে জাইকার সহায়তায় বড় দুধপাতিলা মসজিদ পাড়ায় আব্দুল মান্নানের বাড়িতে একটি আর্সেনিকমুক্ত ওয়াটার ট্যাংক স্থাপন করা হলেও তা এখন অকেজো। ২০১৪—১৫ অর্থবছরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহযোগিতায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথ ও চুয়াডাঙ্গা রিসো সংস্থা বড় দুধপাতিলায় ১৬৮টি পরিবারের জন্য একটি পাইপলাইন ওয়াটার সাপ্লাই ট্যাংক স্থাপন করে। চুয়াডাঙ্গা রিসো সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জানান, বড় দুধপাতিলা ও হরিরামপুরে এ ধরনের দুটি ট্যাংক স্থাপন করা হয়।
ডিহিকৃষ্ণপুর গাবতলা পাড়ায় আর্সেনিক আক্রান্তদের মধ্যে বাহার মন্ডল বলেন, প্রতিদিন ৩—৪ বার পানি আনতে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে। গ্রামের যুবক সবুজ জানান, ১৯৯৯ সালে প্রথম আর্সেনিক শনাক্ত হয় তাদের পানিতে। এখনো অনেক সময় ভুল করে ট্যাংকের বদলে টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, গ্রামের উত্তর পাড়ায় আরেকটি আর্সেনিকমুক্ত পাম্প স্থাপন জরুরি। আক্রান্তদের শরীরে হাত—পায়ের চামড়া পুরু হয়ে যাওয়া, পিগমেন্টেশন, স্পট, আঙুল বেঁকে যাওয়া, দেহে সাদা—কালো দাগ, ত্বকের ক্যান্সার, হজমে সমস্যা, বুক—পেটে ব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, হৃদযন্ত্রের জটিলতা এমনকি গর্ভকালীন শিশুর বিকাশে বাধা। এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. হাদী জিয়া উদ্দিন বলেন, সর্বপ্রথম সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তা সম্ভব হয়নি।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
