আলজাজিরার বিশ্লেষণ
গত বৃহস্পতিবার সকালে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা থেকে ১৫৩ জন ফিলিস্তিনিকে বহনকারী একটি চার্টার্ড বিমান দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের কাছে একটি বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানে থাকা অনেক ফিলিস্তিনির প্রয়োজনীয় ভ্রমণের কাগজপত্র ছিল না।
এ ঘটনা দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তাদের ‘হতভম্ব’ করে দিয়েছিল। প্রায় ১২ ঘণ্টা অপেক্ষার পরে ওই দলটিকে একটি স্থানীয় দাতব্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে নামতে দেওয়া হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকায় কী ঘটেছিল?
দক্ষিণ আফ্রিকার সীমান্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের মতে, গাজা ছেড়ে যাওয়ার সময় কেন তাদের কাছে ‘এক্সিট স্ট্যাম্প বা স্লিপ ছিল না’, তা জানার চেষ্টা করার সময় দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষ উড়োজাহাজটিকে প্রায় ১২ ঘণ্টা ধরে রানওয়েতে বসিয়ে রেখেছিল।
কোন কম্পানি তাদের দক্ষিণ আফ্রিকায় নিয়ে গিয়েছিল?
এই রহস্যময় ফ্লাইটের পেছনে রয়েছে ‘আল-মাজদ ইউরোপ’।
হারেৎজ প্রতিবেদন অনুসারে, লিন্ড ফিলিস্তিনিদের জন্য ফ্লাইটের ব্যবস্থা করার কথা অস্বীকার করেনি, তবে আরো তথ্য দিতেও রাজি হননি। রামাল্লাহর বিরজেইট বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অভিবাসন এবং শরণার্থী অধ্যয়নের সহযোগী অধ্যাপক ওরুব এল-আবেদ বলেছেন, ‘এটি মোটেও কোনো এলোমেলো ঘটনা নয়। এটি একটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক রীতির অংশ, ইহুদিবাদী ইসরায়েলিদের দ্বারা আদিবাসী ফিলিস্তিনিদের ওপর অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে দখলদারি। তারা বহুমুখী পদ্ধতি ব্যবহার করে আদিবাসীদের কাছ থেকে জমি ছিনিয়ে নিতে চায়।’
আল-মাজদ ইউরোপ ওয়েবসাইটটি বলছে, এটি ২০১০ সালে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু সাইটটির নিজস্ব কোনো ঠিকানা বা ফোন নম্বর নেই। এটি কেবল অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জারাহে একটি অবস্থান দেখাচ্ছে। তবে আলজাজিরা সেখানে কোনো অফিস খুঁজে পায়নি।
আলমাজদইউরোপ ডট ওআরজি (almajdeurope.org) নামের ওয়েবসাইটটির ডোমেইন মাত্র এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিবন্ধন করা হয়েছে। সাইটের বেশ কিছু লিঙ্ক কাজ করে না। সাইটে দেওয়া ই-মেইল ঠিকানা (info@almajdeurope.org) থেকেও স্বয়ংক্রিয় বার্তা আসছে, ঠিকানাটি অস্তিত্বহীন। ডোমেইনটি নিবন্ধনকারী নেমচিপ, কম খরচে এবং সহজ সাইন-আপ প্রক্রিয়ার কারণে অনলাইন জালিয়াতির বিষয়ে বেশ কয়েকটি সাইবার নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নেমচিপ নামের যে প্রতিষ্ঠান ডোমেইনটি নিবন্ধন করেছে, সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রতিবেদনে অনলাইন জালিয়াতির ঘটনায় তাদের নাম এসেছে। কারণ, তাদের সাইন-আপ প্রক্রিয়া সহজ ও খরচ কম।
আল-মাজদ ইউরোপ কি সত্যিই যা বলে তাই করে?
যেসব লিঙ্ক কাজ করছে, তার মধ্যে একটি পেজে চারটি ‘ইমপ্যাক্ট স্টোরি’ দেখা যাচ্ছে। একটি পোস্টে ‘মোনা’ নামে আলেপ্পোর ২৯ বছর বয়সী এক নারীকে নিয়ে বলা হয়েছে, যার তারিখ দেওয়া হয়েছে ২২ মার্চ, ২০২৩, যদিও ওয়েবসাইটটি মাত্র ১০ মাস আগে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। মোনার কণ্ঠে লেখা কাহিনিটি আল-মাজদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে, যে তাদের (মোনা ও তার মা) লেবাননে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করেছে। সেখানে তারা ২০১৩ সালে আশ্রয় নিয়েছিল।
কিভাবে মানুষ সেই ফ্লাইটে উঠেছিল?
একজন গর্ভবতী নারীসহ ফিলিস্তিনি পরিবার তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল না জেনেই বিমানে উঠেছিল। তারা আল-মাজদকে ১ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ডলার করে দিয়েছিল। শিশুদের জন্যও প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই দাম। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বিমানে থাকা লোয় আবু সাইফ শুক্রবার আল জাজিরাকে বলেন, তিনি একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আল-মাজদ সম্পর্কে শুনেছেন।
সাইফ বলেন, তিনি একদিন আগ পর্যন্ত জানতেন না যে, তারা কখন গাজা ছেড়ে যাবে। তখন তাকে বলা হয়েছিল যে, যাত্রীরা কেবল একটি ছোট ব্যাগ, একটি মোবাইল ফোন এবং কিছু নগদ টাকা নিতে পারবেন। দক্ষিণ গাজার রাফাহ থেকে বাসে করে তাদের কারেম আবু সালেম ক্রসিংয়ে (ইসরায়েলে কেরেম শালোম নামে পরিচিত) নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে তাদের পরীক্ষা করা হয়েছিল, তারপর ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তাদের ভ্রমণের কাগজপত্রে সিল না লাগিয়ে ইসরায়েলের রামন বিমানবন্দরে স্থানান্তর করেছিল।
আলজাজিরার সাক্ষাৎকারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেকজন ব্যক্তি বলেন, ‘আবেদনকারীর অবশ্যই (একটি ছোট)পরিবার থাকতে হবে। তারপর নামগুলো নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। একবার এটি সম্পন্ন হলে এবং যদি পরিবার অনুমোদন পায়, তাহলে তাদের অর্থ প্রদান করতে বলা হয়।’
তিনি বলেন, ‘রাফায় প্রবেশের জন্য বাসগুলোর জন্য ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে পূর্ব থেকে সমন্বয় করা হয়েছিল। প্রক্রিয়াটি কেবল রুটিন চেকআপ ছিল।’ দলটি রোমানিয়ান বিমানে রওনা হয় এবং জোহানেসবার্গে অবতরণের আগে কেনিয়ার নাইরোবি হয়ে ট্রানজিট করেছিল।
এর আগে কি একই রকম ফ্লাইট হয়েছে?
ইসরায়েলি দৈনিক হারেৎজ জানিয়েছে, গত ২৭ মে একই রকম একটি ফ্লাইট হয়েছিল। এতে বলা হয়েছে, গাজা থেকে প্রায় ৫৭ জন ফিলিস্তিনি বাসে উঠেছিলেন এবং কারেম আবু সালেম ক্রসিং হয়ে রামন বিমানবন্দরে পৌঁছেছিলেন। হারেৎজের মতে, দলটি এরপর ফ্লাই লিলি পরিচালিত একটি রোমানিয়ান চার্টার্ড বিমানে উঠেছিল। বিমানটি বুদাপেস্টে গিয়েছিল এবং সেখান থেকে তারা ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় চলে গিয়েছিল।
আল-মাজদের ওয়েবসাইটে আরো দাবি করা হয়েছে, ‘গাজা উপত্যকার হাসপাতালে কর্মরত একদল ডাক্তার তাদের ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন। যারা আরো পড়াশোনা এবং উন্নত চিকিৎসা প্রশিক্ষণের জন্য ইন্দোনেশিয়ায় গিয়েছিলেন। তবে এই পোস্টটি ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিলের।’ আলজাজিরা স্বাধীনভাবে এই পোস্টের সত্যতা এবং এতে থাকা দলের একটি ছবি যাচাই করতে পারেনি।
গিফট অব দ্য গিভার্সের প্রতিষ্ঠাতা ইমতিয়াজ সুলিমান। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, আল-মাজদ ইসরায়েলের অন্যতম অগ্রণী সংগঠন। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সংবাদ সংস্থাকে বলেছেন, এটি দক্ষিণ আফ্রিকায় পৌঁছানো দ্বিতীয় বিমান। এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ১৭০ জনের বেশি ফিলিস্তিনিকে নিয়ে আরেকটি উড়োজাহাজ এসেছিল, তবে কর্তৃপক্ষ সেবার তা ঘোষণা করেনি বলে জানান সুলিমান।
ফিলিস্তিন কী বলেছে?
দক্ষিণ আফ্রিকার ফিলিস্তিনি দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘একটি অনিবন্ধিত এবং বিভ্রান্তিকর সংস্থা এই বিমানের ব্যবস্থা করেছে। তারা গাজায় আমাদের জনগণের করুণ মানবিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছে। পরিবারগুলোর সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে এবং অনিয়মিত ও দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে তাদের ভ্রমণের সুযোগ করে দিয়েছে।’
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফিলিস্তিনিদের বিশেষ করে গাজা উপত্যকার বাসিন্দাদের এমন নেটওয়ার্ক সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে, যারা ইসরায়েলের স্বার্থ অনুযায়ী তাঁদেরকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়।
দৈনিক সকালবেলা National Daily Newspaper
